০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাবির ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগের বৈধতা নিয়ে হাই কোর্টের রুল

রুলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিভাগের চেয়ারম্যান পদে আবু আবেদীন মো. কাওসার হাসানের নিয়োগ কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Nov 2026, 09:04 PM

Updated : 06 Nov 2026, 09:04 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান পদে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অধ্যাপক আবু আবেদীন মো. কাওসার হাসানকে নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।

রুলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিভাগের চেয়ারম্যান পদে আবু আবেদীনের নিয়োগ কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক অধ্যাপক লালা রুখ সেলিমকে কেন ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রুল জারি করেন।

রুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (উপাচার্যের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বকৃত), উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আবেদীনকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিট আবেদনকারীবপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে গত মাসে রিট আবেদনটি করেছিলেন ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম। আবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের অন্তর্ভুক্ত প্রথম সংবিধির (ফার্স্ট স্ট্যাটিউটস) ৪৩(১) ধারায় বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ওই ধারা অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বা তার ওপরের পদমর্যাদার শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য তিন বছরের জন্য চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন।

অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম ১৯৯৫ সালে এ বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ ৩১ বছর তিনি বিভাগে কর্মরত। অন্যদিকে, অধ্যাপক আবু আবেদীন চাকরিতে তার চেয়ে কনিষ্ঠ।

চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন তুলে ধরে লালা রুখ সেলিম দাবি করেন, বিদায়ী চেয়ারম্যান নাসিমুল খবিরের তিন বছরের মেয়াদ গত ২৯ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাকে পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই দিনই বিদায়ী চেয়ারম্যান রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি পাঠিয়ে এ অনুরোধ জানান।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংবিধির ওই বিধান উপেক্ষা করে গত ২১ সেপ্টেম্বর একটি অফিস আদেশ জারি করে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মেদের সই করা ওই আদেশে উপাচার্যের নির্দেশক্রমে অধ্যাপক আবু আবেদীনকে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।

নিয়োগ আদেশের বিষয়টি জানতে পেরে ওই দিনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত আপত্তি জানান অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম। রেজিস্ট্রারের কাছে দেওয়া চিঠিতে তিনি বলেন, তাকে বাদ দিয়ে কনিষ্ঠ একজনকে দায়িত্ব দেওয়া তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার শামিল এবং বিভাগের জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক হিসেবে এটি তার জন্য অবমাননাকর।

এর আগে অধ্যাপক আবু আবেদীন ও অধ্যাপক লালা রুখ দুজনই একবার করে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এদিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির আরেক জরুরি সভায় উপস্থিত ছয় সদস্যের মধ্যে চারজনই নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে বেআইনি বলে মত দেন বলে জানান লালা রুখ সেলিম। ওই সভায় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ দুজন এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

এ বিষয়ে রিটকারী অধ্যাপক লালা রুখ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ৩১ বছরের কর্মজীবনে বিভাগে এ ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা এটিই প্রথম। নিয়ম অনুযায়ী আমার কাছেই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আসার কথা ছিল। আমি যেখানে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ, নিয়মিত বিভাগে যাচ্ছি এবং সব কাজ ঠিকমত করছি, সেখানে আমাকে বাদ দিয়ে আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া অবশ্যই আমার জন্য অবমাননাকর।”

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে লালা রুখ সেলিম এগিয়ে রয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আবেদীন। তবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমি শুধু এইটুকুই বলব যে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সম্মান রেখে দায়িত্বটা পালন করছি।”

জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের মধ্যে এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যদি তার (লালা রুখ সেলিমের) বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চয়ই সেটা ফেস করবে।”

রিটে নিজেকে বিবাদী করা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে আবু আবেদীন বলেন, “আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় যদি দায়িত্ব দেয়, তা আমি কি অগ্রাহ্য করব? আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি যে কেন আমাকে বিবাদী করবে! আমার দায়টা কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে যে দায়িত্ব দেবে, আমি অবশ্যই সেটা পালন করব।”

এদিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও ভাস্কর্য বিভাগের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তাদের ভাষ্য, নিয়মিত ক্লাস, বার্ষিক প্রদর্শনী ও শিল্পী আব্দুর রাজ্জাকের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের মত কার্যক্রম চলছে।