Published : 08 Aug 2026, 06:04 PM
ভারি বর্ষণ ও বন্যার মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার পর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা বাদ রেখেই শেষ হল এইচএসসি ও সমমানের তত্ত্বীয় পরীক্ষা।
শনিবার সকালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসির ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমা দ্বিতীয় পত্র, শিশু বিকাশ দ্বিতীয় পত্র এবং বিকালে সমাজবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, সমাজকর্ম দ্বিতীয় পত্র এবং ক্রীড়া দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা হয়েছে।
এদিন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিমের উচ্চতর গণিত দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ভোকেশনাল ও বিএমটির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয়েছে আগেই।
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে ফরম পূরণ করেছে। এবার সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা হয়েছে।
তবে বন্যার কারণে স্থগিত থাকায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষা আগামী ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হবে।
এ বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজার জেলার পরীক্ষা ৮ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত ছিল।
ফল নভেম্বরে
আগামী নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে ফল প্রকশের যে রেওয়াজ আছে, তা মেনেই ফল প্রকাশ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
পরীক্ষা স্থগিতসহ তিন দাবিতে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। ফাইল ছবি
শনিবার দুপুরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রাম বোর্ডের তত্ত্বীয় পরীক্ষা আগামী ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হবে। যেহেতু সারাদেশের ফল একসঙ্গে প্রকাশিত হবে তাই ওই দিন থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে ফল প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করব। সে হিসাবে নভেম্বরের প্রথমার্ধে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে ভুল, রসায়নের প্রশ্নে অসংগতি, কয়েকটি কেন্দ্রে ভুল পাঠ্যসুচির প্রশ্ন বিতরণের ঘটনা এবং নিয়ম না মেনে খাতা মূল্যায়ন, সব মিলিয়ে এবারের পরীক্ষা ঘিরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর বাইরে অতিবৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনও সমালোচিত হয়েছে ব্যাপকভাবে।
বিতর্কের শুরু পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে
ভারি বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই গেল ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ছাড়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিন বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও কোমর পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
এমন পরিস্থিতিতে সারাদেশের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিতের জোরালো দাবি তোলেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
তবে শুধু চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানায় আন্তঃশিক্ষা বোর্ডে সমন্বয় কমিটি। তবে ১৫ জুলাই শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামে পরীক্ষার্থীদের এক দল।
১৩ জুলাই পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্রের ছবি ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগ ওঠে, সৃজনশীল প্রশ্নের ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর এই দুইটি প্রশ্ন ভুল ছিল।
পরে শিক্ষা বোর্ডগুলো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্ন নিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।
সেখানে বলা হয়, বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। পর্যালোচনায় যদি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রশ্নে ত্রুটি বা অসঙ্গতি প্রমাণিত হয় তবে প্রচলিত পরীক্ষা মূল্যায়ন নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং তারা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে লক্ষ্যে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
এ ঘটনার পর সিলেট শিক্ষা বোর্ড প্রশ্নপ্রণেতা, মডারেটরসহ চারজন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়।
বোর্ড জানায়, কারো অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রসায়নের প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি
২০ জুলাই অনুষ্ঠিত রসায়ন প্রথম পত্র পরীক্ষা নিয়েও সৃষ্টি হয় বিতর্ক। এদিন বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের প্রশ্ন এক ছিল না বলে অভিযোগ তোলেন পরীক্ষার্থীদের একাংশ।
ইংরেজি সংস্করণের ওই পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের পরীক্ষার প্রশ্নে ৩(ঘ) প্রশ্নটি এক ছিল না। তারা ওই প্রশ্নের চার নম্বর দাবি করেন।
জীববিজ্ঞান প্রশ্নে অসঙ্গতি
রসায়নের পর গত ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নে ‘অসঙ্গতি’ ছিল বলে অভিযোগ তোলেন ইংরেজি সংস্করণের পরীক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, ইংরেজি সংস্করণের জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের তিনটি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন ভুল ছিল, ‘গ’ সেট অনুযায়ী সেগুলো ১৫, ১৮ ও ২৫ নম্বর।
প্রশাসনিক ভুলেও বিপাকে পরীক্ষার্থীরা
প্রশ্নের ভুলের পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনায়ও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। বিভিন্ন কেন্দ্রে দেওয়া হয়েছে আগের বছরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। গত ১ অগাস্ট মনোবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কারণে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালেরটা দিয়ে পরীক্ষা নেন শিক্ষকরা।
পরে পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা বাড়ি গিয়ে প্রশ্ন মিলিয়ে দেখতে পান ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা স্ব স্ব কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপরে বিষয়টি ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বোর্ড থেকে সমাধান করার আশ্বাস দেয়।
এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের কেন্দ্রসচিব মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন খানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় উপজেলা প্রশাসন। পরে কেন্দ্রসচিব পরীক্ষায় দায়িত্বে থাকা তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন।
এর আগে গত ৩০ জুলাই মনোবিজ্ঞান প্রথমপত্র পরীক্ষাতেও ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা আয়োজনের অভিযোগ ওঠে রাজধানীর মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কলেজ কেন্দ্রে।
ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০৬ জন শিক্ষার্থী। ওই কেন্দ্রে এমসিকিউ অংশে ভুল সেটের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।
এর আগে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ভূগোল প্রথম পত্র পরীক্ষার দিনও ভুলবশত সাতক্ষীরা সিটি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর বিষয়টি ধরা পড়লে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ওই প্রশ্নপত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে প্রথম পত্রের সঠিক প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
গেল ৪ জুলাই বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় সরকারি আহম্মদ মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রের ৪২০২ নম্বর কক্ষে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে ভুলবশত আগের বছরের পাঠ্যসূচিভিত্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। পরে তদন্তে প্রশাসনিক অবহেলার প্রমাণ মেলে।
খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছরের এইচএসসি বিএমটি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগে পটুয়াখালী রাঙ্গাবালী উপজেলার এক প্রভাষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ওই শিক্ষক হলেন উপজেলার ছোটবাইশদিয়া বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মো. রিপন হোসেন।
গেল ২ অগাস্ট দুপুরে রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজের একাদশ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি শ্রেণিকক্ষে বসে এইচএসসি পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তরপত্র ভরাট করছে। তাদের বলতে শোনা যায়, কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মো. রিপন হোসেন তাদের উত্তরপত্রের খালি ঘর ভরাট করতে বলেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্র শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। নির্দেশনার পর, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবহেলার অভিযোগে ৩ অগাস্ট তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।