২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে কী আছে, গুরুত্ব কোথায়?

সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদের কার্যপ্রণালী সংসদ প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে কী আছে, গুরুত্ব কোথায়?
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ওয়াকআউট করেন জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচিত সদস্যরা। ছবি: পিএমও

জেসমিন মলি জেসমিন মলি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Mar 2026, 02:46 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:09 PM

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই কার্যপ্রণালী বিধির গুরুত্ব সামনে আনেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

অধিবেশনে সদস্যদের আচরণ ও সংসদীয় রীতিনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, “কার্যপ্রণালী বিধি প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য বাইবেলের মতো। এটি অনুগ্রহ করে আপনারা মনোযোগ দিয়ে পড়বেন, বিশেষ করে যারা নবীন সদস্য।”

একই সময় তিনি সদস্যদের আরও মনে করিয়ে দেন, “স্পিকার যখন কোনো সদস্যের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন, সেই সদস্য তখন নিজের সিটে বসে পড়বেন। এটি ভবিষ্যতে আপনারা পালন করবেন। এটাই সংসদীয় রীতিনীতি।” 

বক্তব্যের সময়সীমা নিয়ে টানাপড়েন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে হট্টগোল এবং বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও স্পিকার সেদিন অধিবেশন  চালিয়ে যান। আর এটি তিনি করেন কার্যপ্রণালী বিধির উপর দাঁড়িয়েই।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিই সংসদ পরিচালনার মূল লিখিত নিয়মকানুন। সংসদে কে কখন কথা বলবেন, প্রশ্নোত্তর কীভাবে হবে, কোন প্রস্তাব উঠবে, শৃঙ্খলা ভাঙলে সভাপতির করণীয় কী, কমিটি কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, এমনকি সদস্যদের বিশেষ অধিকার কোথায় প্রযোজ্য হবে, তার কাঠামোও নির্ধারণ করে দেয় এই বিধি। 

সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদের কার্যপ্রণালী সংসদ প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে। 

কার্যপ্রণালী-বিধির ভূমিকাতেও বলা আছে, রাষ্ট্রপতি ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল এ বিধি প্রণয়ন করেন। পরে প্রথম জাতীয় সংসদ ১৯৭৪ সালের ২২ জুলাই তা গ্রহণ করে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এতে ১০ বার সংশোধন আনা হয় এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। 

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: পিএমও

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

দুই দশকের বেশি সময় জাতীয় সংসদ বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে হারুন আল রশীদের।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সংসদ কীভাবে চলবে, তা নির্ধারিত থাকে কার্যপ্রণালী বিধিতে। বিধির বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। 

“সংসদের বৈঠক কখন বসবে, কখন মূলতবি হবে, কখন কে কথা বলবেন, কোন প্রশ্ন গ্রহণ করা হবে, কোন প্রশ্ন বাতিল হবে, কী ধরনের বক্তব্য দিলে স্পিকার বক্তাকে থামিয়ে দিতে পারবেন, কোন কমিটির বৈঠক কখন কীভাবে হবে, এর সবকিছুই কার্যপ্রণালী বিধিতে নির্ধারিত থাকে।”

বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এ সভাপতি বলেন, “এসব কারণে নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য কার্যপ্রণালী বিধির গুরুত্ব অনেক বেশি। 

“বিধির আওতায় থেকে সংসদে সদস্যদের অনেক কিছু বলার ও করার আছে। তবে দলীয় বিধিনিষেধের কারণে সদস্যরা অনেক কিছু বলা ও করা থেকে বিরত থাকেন। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের সৎ ও সাহসী হতে হবে। আর সংসদ নেতাকে উদার হতে হবে। তবেই সংসদ হবে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক।”

সংসদ অধিবেশনের প্রাণবন্ত একটা অংশ হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। বিধির ৪১ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, স্পিকার অন্য নির্দেশ না দিলে প্রতিটি বৈঠকের প্রথম এক ঘণ্টা প্রশ্নোত্তরের জন্য নির্ধারিত থাকবে। 

একই নিয়মে আরও বলা আছে, বুধবার অধিবেশনের শুরুতে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের জন্য নির্ধারিত থাকবে; তবে বাজেট পেশের দিনে প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকবে না। 

প্রশ্ন করার ক্ষেত্রেও আলাদা কাঠামো আছে। একজন সদস্যকে সাধারণত অন্তত ১৫ দিনের নোটিস দিতে হয়। এক দিনে ১০টির বেশি প্রশ্নের নোটিস দেওয়া যায় না। তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন মৌখিক উত্তরের জন্য, আর তারকাচিহ্নবিহীন প্রশ্ন লিখিত উত্তরের জন্য বিবেচনা করা হয়।

একই সদস্যের একদিনের প্রশ্নতালিকায় একটির বেশি তারকাচিহ্নিত এবং তিনটির বেশি তারকাচিহ্নবিহীন প্রশ্ন রাখা যায় না। ছাপা উত্তর স্পিকার আসন গ্রহণের অন্তত আধা ঘণ্টা আগে টেবিলে রাখতে হয়। 

কোন প্রশ্ন গ্রহণযোগ্য হবে, তাতেও বেশ কিছু শর্ত আছে। বিধির ৫৪ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, মন্ত্রীর উদ্দেশে করা প্রশ্ন অবশ্যই তার সরকারি দায়িত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। একই অধ্যায়ে আদালতে বিচারাধীন বিষয়, মানহানিকর বা বিদ্রূপাত্মক ভাষা, অথবা এমন প্রশ্ন করা যাবে না, যা সংসদের কার্যপ্রণালী ব্যাহত করতে পারে। 

শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতাও স্পিকারকে দিয়েছে এই বিধি। ১৫ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্যের আচরণ স্পিকারের দৃষ্টিতে গুরুতর বিশৃঙ্খল হলে তাকে অবিলম্বে কক্ষ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া যায়। 

১৬ নম্বর নিয়মে আছে, কেউ সভাপতির কর্তৃত্ব অমান্য করলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদের কাজ ব্যাহত করলে স্পিকার তার নামোল্লেখ করতে পারেন; এরপর প্রস্তাব পাস হলে অধিবেশনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা যেতে পারে। 

বৃহস্পতিবার প্রথম দিনের অধিবেশনে স্পিকারের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এ বিধির প্রয়োগ সামনে আসে। সেদিন সদস্যদের শান্ত থাকতে বলা, বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে বলা এবং সভাপতির নির্দেশ মানার কথা স্মরণ করিয়ে দেন স্পিকার। 

কার্যপ্রণালী বিধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংসদীয় কমিটি। সেখানে কমিটিকে সাক্ষী তলব, দলিলপত্র চাওয়া, ব্যক্তি ও রেকর্ড হাজির করতে বলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমনকি শপথ নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থাও আছে। 

২০২ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, কমিটি সাক্ষী তলব করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র চাইতে পারে। ২০৩ নম্বর নিয়মে কমিটিকে ব্যক্তি, কাগজপত্র ও রেকর্ড তলবের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যদিও কোনো নথি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্বার্থের পরিপন্থি হলে সরকার তা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। 

২০৪ নম্বর নিয়মে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে শপথ নেওয়ার বিধান আছে। আর ২০৫ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, সাক্ষী ডাকার আগে কমিটি প্রশ্নের ধরন ও পদ্ধতি ঠিক করবে। সভাপতি আগে প্রশ্ন করতে পারবেন, পরে অন্য সদস্যরাও প্রশ্ন করবেন। সাক্ষ্যগ্রহণ হলে কার্যবিবরণীর হুবহু রেকর্ডও রাখতে হবে। 

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের শপথকক্ষে শপথ নেন। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের শপথকক্ষে শপথ নেন

কমিটির কার্যক্রম গোপন রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ২০২ নম্বর নিয়মে কমিটির কাছে দেওয়া সাক্ষ্য গোপন বা একান্ত বিবেচনায় রাখার সুযোগ আছে। 

আর ২১২ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে সাধারণভাবে কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায় না। সংসদ অধিবেশন না থাকলে স্পিকার বিশেষ অনুরোধে তার মুদ্রণ, প্রকাশ বা প্রচারের অনুমতি দিতে পারেন। 

সদস্যদের বিশেষ অধিকার নিয়েও রয়েছে পৃথক বিধান। ১৭৪ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, স্পিকারের অনুমতি ছাড়া সংসদের সীমার মধ্যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। 

১৭৫ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়াও স্পিকারের অনুমতি ছাড়া জারি করা যাবে না। 

১৭৬ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য গ্রেপ্তার, আটক, দণ্ডিত বা মুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা স্পিকারকে জানাতে হবে। 

বিধিতে বেসরকারি সদস্যদের জন্যও আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। ২৫ নম্বর নিয়মে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের কাজ অগ্রাধিকার পাবে। তবে প্রয়োজনে স্পিকার অন্য দিনও এ ধরনের কাজের জন্য নির্ধারণ করতে পারেন। অর্থাৎ সংসদ কেবল সরকারের আইন ও প্রস্তাবের জায়গা নয়, বেসরকারি সদস্যদের উদ্যোগেরও একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। 

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণ, কোরাম, কার্যতালিকা, সংশোধনী, ভোটাভুটি, অনাস্থা প্রস্তাব, বিশেষ অধিকার প্রশ্ন, সদস্যদের অনুপস্থিতি ও ছুটি, এমনকি কমিটির গঠন ও রিপোর্ট পেশের নিয়মও এই নথিতে আলাদা অধ্যায়ে সাজানো আছে। ফলে সংসদীয় কাজের প্রায় প্রতিটি ধাপই কোনো না কোনোভাবে কার্যপ্রণালী-বিধির আওতায় পড়ে। 

আরও পড়ুন

যাত্রা শুরু ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের

যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত সাতজনের জন্যও শোক জানাল ত্রয়োদশ সংসদ