০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

আসিফকে ‘টার্গেট’ করে অনুসন্ধান শুরু হয়নি: দুদক সচিব

“যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আমরা সেগুলো আইনিভাবে দেখছি এবং আইনিভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিচ্ছি,” বলেন সাইদুর রহমান খান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Sep 2026, 07:06 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘টার্গেট’ করে শুরু হয়নি বলে দাবি করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব সাইদুর রহমান খান।

সোমবার দুদকের এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আসিফের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এসেছে এবং কোন ভিত্তিতে তা অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়েছে, সেসব জানতে চাইলে দুদক সচিব বিস্তারিত বলতে চাননি।

তিনি বলেন, “আমরা আজকের বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি। এ বিষয়ে আমরা কথা না বলি।”

পরে তিনি বলেন, পাঁচ মাসের বেশি সময় কমিশন না থাকায় অনেক বিষয় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। সেগুলো এখন পর্যায়ক্রমে দেখা হচ্ছে।

“আপনারা দেখবেন, সময়মতো সবগুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপিত হবে।”

আসিফকে কেন অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়েছে এবং অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাদের বিষয়ে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নও আসে ব্রিফিংয়ে।

জবাবে সচিব বলেন, “আমরা এরকম কোনো টার্গেট করে করছি না। যেহেতু পেন্ডিং ছিল, পেন্ডিং লিস্ট অনুযায়ী আমরা এগুলো উপস্থাপন করছি। সামনে আপনারা লক্ষ্য করবেন যে আমরা কোনো পক্ষপাতিত্ব হয়, এরকম কাজ পরিচালনা করছি না।”

অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেগুলোও আইন অনুযায়ী দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

দুদক সচিব বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আমরা সেগুলো আইনানুগভাবে দেখছি এবং আইনানুগভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করছি।”

কোনো নির্দিষ্ট সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না, সে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি তিনি। তার ভাষ্য, অভিযোগ এসে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও আইনের আওতায় আসবেন।

দুদকের কার্যক্রমে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব থাকার অভিযোগও নাকচ করেন সচিব।

তিনি বলেন, “না, এটি সঠিক না। আমরা একটা স্বায়ত্তশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আমরা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বা কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো মামলা পরিচালনা করছি না। আমরা ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে আইনানুগভাবে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছি।”

আসিফের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

রোববার আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, নিয়োগ-পদায়নে অর্থ লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়াসহ নতুন কিছু অভিযোগ পাওয়ার কথা জানায় দুদক। নতুন এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে।

সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক বা ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্যে আসিফের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ‘হাজার হাজার কোটি টাকা’ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এনসিপির এই নেতার বিরুদ্ধে।

আসিফের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরে প্রকল্পের বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগে।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ‘কোটি কোটি টাকা’ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে ৬০ কোটি টাকাসহ এই চার নিয়োগে অভিযোগের মোট অঙ্ক ১৮৭ কোটি টাকা।

হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আসিফের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যেতেন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন।

দুদকের নথিতে দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার অভিযোগ করা হয়েছে।

পাশাপাশি দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

চার দেশের এসব অঙ্ক যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফের দুই বোন জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।

পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

আগে যে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

অন্য তিনজন হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি দল ওই অনুসন্ধান করছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফের দায়িত্বকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে দুদক।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ

আগের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন আসিফ। তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

পদোন্নতি নিয়ে একটি অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৩৫ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে। তখন তিনি আর সরকারের দায়িত্বে ছিলেন না।

৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়ন করতে ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।

দুদকের উপপরিচালক আক্তারুল ইসলামের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে পরে তাকে আইনি নোটিসও পাঠান আসিফ।

আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান।

২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়ে দলটির মুখপাত্র হন।