Published : 08 Aug 2026, 10:30 PM
ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কমপ্লেক্সের ভেতরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পাওয়া জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল-জেআইসি শনিবার পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানসহ বিচারকরা।
তবে ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালায় ‘গুম ও নির্যাতনের’ ঘটনাগুলোতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের জেআইসি পরিদর্শনের সময় নিয়ে আপত্তি তুলেছে আসামিপক্ষ। তাদের দাবি, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে এই পরিদর্শন আসামিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য আইনে কোনো নির্দিষ্ট পর্যায় বা সময় নির্ধারণ করা নেই।
শনিবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী জেআইসি পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ডিজিএফআই প্রধান ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি দাবি করেন, “১/১১-এর সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জেআইসির কোনো একটি কামরায় আনা হয়েছিল এবং তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল।” সাক্ষীদের বর্ণনা থেকে পাওয়া এসব তথ্য পর্যায়ক্রমে বিচারে প্রতিফলিত হবে বলেও তথ্য দেন তিনি।
তবে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের জেআইসি পরিদর্শন নিয়ে আপত্তি তোলেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনিও এই পরিদর্শন দলে ছিলেন।
আজিজুর রহমান দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারকরা সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এবং যুক্তিতর্কের আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন গিয়েছিলেন।
“সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া চলাকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে বিচারকদের সামনে নতুন কোনো তথ্য বা প্রমাণ আসার সুযোগ তৈরি হলে, তা আসামিপক্ষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
জেআইসি পরিদর্শনের আবেদনের বিষয়ে আসামিপক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে দুলু বলেন, “নিয়ম হল, এক পক্ষ কোনো আবেদন করলে অপর পক্ষকে অবহিত করে শুনানির সুযোগ দেওয়া। এক্ষেত্রে আমরা সে সুযোগ পাইনি।”
যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আগে এমন পরিদর্শনকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে আইনি প্রতিকার চাইতে বিষয়টি আপিল বিভাগে তুলবেন বলেও তিনি জানান।
এদিকে আসামিপক্ষের আপত্তির জবাবে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইনে কি বলেছে যে, এরকম আর্গুমেন্টের আগে যাওয়া যাবে না; আর্গুমেন্টের পরে যাইতে হবে? আইনে কোথাও এমন আছে? বরঞ্চ আইনে আছে, বিচারক যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেন।”
শুনানির সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, “উন্মুক্ত আদালতেই আবেদন করে শুনানি করা হয়েছে এবং আসামিপক্ষকে কপি দেওয়া হয়েছে। তারা যদি না আসে বা শুনানি না করে এবং এই আদেশ মেনেই তো তারা আজ আমাদের সঙ্গেও গেল!”
শনিবার জেআইসি পরিদর্শনের মাধ্যমে মামলার নতুন কোনো প্রমাণ নেওয়া হয়নি বলেও তথ্য দেন আমিনুল ইসলাম।
পরিদর্শনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার ভাষ্য, “বিচারকরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনবোধে একটি স্মারকলিপি তৈরি করতে পারেন।”
পরিদর্শনের কারণে প্রমাণ মূল্যায়নে প্রভাব পড়ার অভিযোগকে ‘যুক্তিহীন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “সাক্ষী প্রভাবিত হবেন কেন? সাক্ষী যা বলবে জজ সাহেব তো তাই রেকর্ড করে। জজ সাহেব কি বলে দেবে যে, আপনি ওইটা বলেন?”
‘প্রমাণ মূল্যায়নে’ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নজির
ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের জেআইসি পরিদর্শনের সময় নিয়ে আসামিপক্ষ আপত্তি তুললেও অনুসন্ধানে অন্যান্য দেশে এ ধরনের বেশ কয়েকটি নজির পাওয়া গেছে।
১৯৯৫ সালের বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিওয়াই) প্রসিকিউটর বনাম ব্লাগোয়েভিচ ও জোকিচ মামলায় এমন একটি পরিদর্শন হয়েছিল। আইসিটিওয়াইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর ট্রায়াল চেম্বার এবং মামলার পক্ষগুলো বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা, ব্রাতুনাৎস ও জভর্নিক এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। মামলায় ইতোমধ্যে গ্রহণ করা সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নে ট্রায়াল চেম্বারকে সহায়তা করাই ছিল ওই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য।
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত মামলার সমাপনী যুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ সাইট ভিজিটের পরেই মামলার পক্ষগুলো তাদের সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পায়।
একই ধরনের আরেকটি নজির রয়েছে রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) ‘মিলিটারি টু’ মামলায়।
আইসিটিআরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ওই মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পর্ব শেষ হয় ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল ট্রায়াল চেম্বার রুয়ান্ডায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের প্রায় দুই মাস পর ২৪ থেকে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় মামলার সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন। অর্থাৎ মামলায় প্রমাণ উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর, কিন্তু সমাপনী যুক্তিতর্ক শুরুর আগে, ট্রায়াল চেম্বার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল।
আইসিটিওয়াই-এর স্টানিসিচ অ্যান্ড জুপ্লিয়ানিন মামলার একটি শুনানিতেও সাইট ভিজিটের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
সেখানে বিচারক প্যাট্রিক রবিনসন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের উদ্দেশ্য হিসেবে আগে আদালতে শোনা প্রমাণকে আরো পরিষ্কারভাবে বোঝার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
বিচারক প্যাট্রিক রবিনসনের এই পর্যবেক্ষণের উদ্ধৃতি দিয়ে আইনজীবী দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন যদি আদালতে আগে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণকে আরো ভালোভাবে বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি এক ধরনের বিষয়। কিন্তু পরিদর্শনের সময় বিচারকদের সামনে নতুন কোনো তথ্য, সাক্ষ্য বা আলামত এলে তখন প্রশ্নটি ভিন্ন হয়ে যায়। তবে আইসিটিওয়াইয়ের নিয়মে সাইট ভিজিট কেবল সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পরই করা যাবে, এমন সরাসরি কোনো শর্ত নেই।
“ট্রাইব্যুনালের রুল ফোরে বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং প্রেসিডেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো চেম্বার ট্রাইব্যুনালের আসনের বাইরে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।”
এর আগে গত ২৮ জুলাই ঢাকা সেনানিবাসের জেআইসি পরিদর্শনের জন্য আবেদন করেন প্রধান কৌঁসুলি। আবেদনে বলা হয়, “গুমের পর জেআইসিতে বেআইনিভাবে আটকে রাখার সময় ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন সম্পর্কে ধারণা পেতে বিচারকদের সরেজমিনে স্থানটি পরিদর্শন প্রয়োজন। এটি আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হবে।”
সেখানে রুয়ান্ডা ও যুগোস্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুরূপ স্থান পরিদর্শনের নজির তুলে ধরা হয়। আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল ৮ অগাস্ট সকাল ১১টায় পরিদর্শনের দিন ধার্য করেন।
আদেশে বিচারকদের সঙ্গে প্রধান কৌঁসুলি, সর্বোচ্চ তিনজন প্রসিকিউটর, সর্বোচ্চ তিনজন আসামিপক্ষের আইনজীবী, ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, সর্বোচ্চ পাঁচজন গণমাধ্যমকর্মী এবং নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
পরিদর্শনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাপ্রধান, ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারকে আদেশের অনুলিপি পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
আর পড়ুন-
এক-এগারোর সরকারের সময়ে জেআইসিতে তারেক রহমানকে নির্যাতনের তথ্য মিল