ভোটের ঘোষণা এল, ইসি এখন কী করবে
“এখন আমাদের একটাই বার্তা— আমাদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে, সমস্ত কাজ আমাদের করতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বিষয়টাকে আমরা দেখব,” বলেন আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের হিসাব মাথায় রেখে ভোটের ‘৫০-৬০ দিন আগে’ তফসিল দেওয়ার কথা বলছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আর ভোটের আগে দেওয়া হবে একটা কর্মপরিকল্পনা, যেখানে তারা কী কী করবে এবং কখন করবে, তা লেখা থাকবে।
আগামী ফেব্র্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য যে সময়ের কথা দুমাস আগে অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল, সেই মাসের কথা মঙ্গলবার নিজের মুখে বলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এদিন জাতির উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজ এ মহান দিবসে আপনাদের সামনে এ বক্তব্য রাখার পর থেকেই আমরা আমাদের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করব। আমরা এবার একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করব।
“অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠাব, যেন নির্বাচন কমিশন আগামী রমজানের আগে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।”
সরকারপ্রধানের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। প্রধান উপদেষ্টা সম্ভাব্য সময় জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা ভোটের জন্য চলমান কাজগুলোর একটা ‘অ্যাকশনপ্লান’ শিগগির ঘোষণা করব। আর ভোটের ৫০-৬০ দিন আগে সময়সূচি ঘোষণা করব।”
নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, অনেকের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ, এক ধরনের অবিশ্বাস, এক ধরনের গুজব ছিল যে নির্বাচন আদৌ ফেব্রুয়ারিতে হবে কিনা, দুই বছরে হবে কিনা, তিন বছর হবে কিনা, এরকম একটা গুজব ছিল।
“প্রধান উপদেষ্টার আজকের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই গুজবের যবনিকা ঘটল। এখন আর কোনো সন্দেহ নেই, এখন আর কোনো এমন অবিশ্বাস নেই যে, নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হবে না। এখন পরিষ্কার হয়ে গেল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ বিশ্লেষক বলেন, প্রধান উপদেষ্টা একটা সম্ভাব্য সময়সূচি বলেছেন। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বলেননি।
“কারণ এটা (দিনক্ষণ নির্ধারণ) করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে যত নির্বাচন হয়েছে, সব নির্বাচনের তারিখে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে। কখনো অন্তবর্তীকালীন সরকার বা অন্য কোন সরকার এটা ঘোষণা করেন নি। এখন মানে যেটা হবে যে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল, ইলেকশন কমিশন তো বটেই, দেশটা এখন নির্বাচনমুখী হয়ে গেল।”
তফসিল ঘোষণা ও ভোটের তারিখ সামনে রেখে এখন রোডম্যাপের প্রস্তুতি নিতে পারে বলে মনে করেন এ বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “সামনে একটা রূপরেখা আছে, সময়সূচি আছে। এখন ইলেকশন কমিশন যদি মনে করে, একটা রোডম্যাপও ঘোষণা করতে পারে, আর যথাসময়ে তফসিল ঘোষণা করবে।”
আব্দুল আলীম বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনমুখী হয়ে যাবে। তারা তাদের যে অন্যান্য কার্যক্রম, সমস্ত কিছুর চেয়ে নির্বাচনকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেবে। ইলেকশন কমিশনও যে কাজগুলো শুরু করেছিল, প্রাক নির্বাচনের যে প্রস্তুতি, সেগুলো আরও গতিশীল হবে।”
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি না হয়-প্রধান উপদেষ্টার এমন বার্তার কথা তুলে ধরে এ নির্বাচন বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, মাননীয় প্রধান যেটা বলছেন যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে কোন সংঘাতময় পরিস্থিতি না হয়। কেউ যেন এটাকে বানচাল করতে না পারে।
“ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। যেটা আমি বারবার বলে আসছি- আগামী নির্বাচনের একটা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা নিয়ে একটা বড় প্রস্তুতির ব্যাপার আছে ইলেকশন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ”
ইতিহাসের সেরা নির্বাচন ও যাতে সবাই ভোট দিতে পারে সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
আব্দুল আলীম বলেন, “এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তো সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে দেশটা এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী হয়ে গেল।”
‘প্রস্তুত ইসি, এখন কর্মপরিকল্পনা‘
নির্বাচন কমিশন বলছে, এখন ভোটার তালিকাসহ আনুষঙ্গিক যেসব কাজ আছে, সেগুলোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলার দিকেও তারা নজর দেবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “এখন আমাদের একটাই বার্তা হচ্ছে, আমাদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে, সমস্ত কাজ আমাদের করতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বিষয়টাকে আমরা দেখব। ভোটার তালিকাসহ আনুষঙ্গিক যেসব কাজ আছে, সেগুলো করব। আর মোটামুটি ৫০- থেকে ৬০ দিন আগে ইনশাল্লাহ আমরা সিডিউল ঘোষণা করব।”
ইসির চলমান কাজের মধ্যে বৃহস্পতিবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আরপিওর একটা পরিবর্তন আসতেছে। আমরা একটা প্রস্তাব পাঠাবো সরকারের কাছে।”
৫০-৬০ দিন বিবেচনায় নিলে ডিসেম্বরেরশেষার্ধে তফসিলের ঘোষণা আসতে পারে। সেক্ষেত্রে আবহাওয়া, পরীক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে তফসিল দেওয়ার সময় চূড়ান্ত করবে ইসি।
তিনি বলেন, “ভোটের তারিখের ৫০ থেকে ৬০ দিন আগে বা দুই মাস আগে তফসিল হলে সেরকমই (ডিসেম্বরের শেষে) হতে পারে। আরপিও’র ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রত্যাহারের সময় ও ভোটের দিন বর্ণনা করে এ তফসিল দেওয়া হবে।”
নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা রোডম্যাপ ঘোষণা করবো না। তবে আমাদের ‘অ্যাকশনপ্ল্যান’ আমরা শিগরি ঘোষণা করব ইনশাল্লাহ। কী কী কাজ, কখন করব, কোনটা কখন শেষ হবে, তা সেখানে তুলে ধরা হবে।”
রোজার আগে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন মানে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ নির্বাচন হবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হতে পারে। সে হিসাবে ডিসেম্বরে শেষার্ধে তফসিল হতে পারে।
ইতোমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ভোটের তারিখের প্রায় দু’মাস আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ভোট সামনে রেখে কাজের বাস্তবায়নসূচি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ইসি সচিবালয়। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর বাস্তবায়নসূচি হালনাগাদ করা হবে। তফসিল ঘোষণার বিষয়টি দেখবে নির্বাচন কমিশন। ইসির নির্দেশনা পেলে যথাসময়ে সব কিছু চূড়ান্ত হবে।
তফসিল ঘোষণা ও ভোটের তারিখ: প্রথম থেকে দ্বাদশ
>>প্রথম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি, ভোট ৭ মার্চ
>>দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর, ভোট ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি
>>তৃতীয় সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৮৬ সালের ২ মার্চ, ভোট ৭ মে
>>চতুর্থ সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৮৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর, ভোট ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ
>>পঞ্চম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৯০ সালের ১৫ ডিসেম্বর, ভোট ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি
>>ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর, ভোট ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি
>>সপ্তম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ১৯৯৬ সালের ২৭ এপ্রিল, ভোট ১২ জুন
>>অষ্টম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ২০০১ সালের ১৯ অগাস্ট, ভোট ১ অক্টোবর
>>নবম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর, ভোট ২৯ ডিসেম্বর
>>দশম সংসদ নির্বাচন: তফসিল ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর, ভোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি
>>একাদশ সংসদ নির্বাচন: তফসিল ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর, ভোট ৩০ ডিসেম্বর
>> দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: তফসিল ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর, ভোট ৭ জানুয়ারি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা হালনাগাদের খসড়া প্রকাশ, নতুন দলের নিবন্ধন, ৩০০ আসনের সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত খসড়া প্রকাশ, দেশি-বিদেশি পয়বেক্ষক সংস্থা নীতিমালা, আইন-বিধি সংস্কার, প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত পদক্ষেপ,প্রশিক্ষণ, নির্বাচনী কেনাকাটাসহ সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।
