জ্বালানি তেল আমদানি বেসরকারি খাতে ছাড়ার উদ্যোগ ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’: জামায়াত
জ্বালানি তেলে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে ‘বেসরকারি একচেটিয়া প্রভাব’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বলছে জামায়াত।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তা ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এ সংক্রান্ত সরকারের খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ করা এবং অন্তত ৬০ দিনের মধ্যে জনমত গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার দাবি দলের পক্ষ থেকে তুলে ধরেছেন তিনি।
শনিবার বিকালে ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ নিয়ে দলটির বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের বদলে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।
“পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।”
দেশে ‘নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত’ করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’ এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, প্রস্তাবিত নীতিমালা প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা।
“এছাড়া একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জরুরি বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা, এই নীতিমালার লক্ষ্য।”
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে ওই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কাজেই এই নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।”
তবে জামায়াতে ইসলামী বলছে, বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে ‘বেসরকারি একচেটিয়া প্রভাব’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেক্রেটারি জেনারেল পরওয়ার বলেন, “এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিংগেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে।”
তিনি বলেন, “বর্তমান জ্বালানি সংকট বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়। এটি মূলত বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফল। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।
“গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।”
পরওয়ার বলেন, “দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পর বিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।”
জ্বালানি নিরাপত্তা আনতে গিয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
“জামায়াত বাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়; তারা বিরোধিতা করছে জবাবদিহিতাহীন হস্তান্তরের। প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।”
বেসরকারি ব্যবস্থায় গেলে এলপিজি খাতের মত ‘সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে’ বলে মন্তব্য করেন গোলাম পারওয়ার। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত ছয়টি দাবি তুলে ধরেন তিনি।
>> সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি করতে হবে। সেখানে বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা।
>> বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার, স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ, প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য উন্মুক্ত করা।
>> ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন করা।
>> জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহার করা।
>> স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশ করা।
>> ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনে পাবনা-১ আসনের নাজিবুর রহমান মোমেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও উপস্থিত ছিলেন।
