Published : 05 Jul 2026, 11:27 PM
পরিবেশবাদীদের আন্দোলন আর হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞায় রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণকাজ থেমে যাওয়ার পর চলতি বছর থেকে ফের কর্মযজ্ঞ চলছে পুরোদমে।
আদালতের নির্দেশনা মেনে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী চার-পাঁচ মাস পরই এ র্যাম্প খুলে দেওয়া হতে পারে।
পান্থকুঞ্জ পার্কে এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণকাজ বন্ধে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাদের করা এক রিট আবেদন নিয়ে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথের হাই কোর্ট বেঞ্চ এর কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত করেও দিতে বলেছিল আদালত।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাই কোর্ট নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে নিয়েছে। কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, সেই মোতাবেক আমরা কাজ শুরু করেছি।
“এ বছরের শুরু থেকে কাজ চলছে, তবে এখন পুরোদমে কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এই অংশের র্যাম্পটি খুলে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।”
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কাজ শুরু করেছি, কাজ চলছে। আগামী চার পাঁচ মাসে পরেই এই র্যাম্প খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।”
হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, “হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছি না, সেই নির্দেশনায় কিছু বিষয় মেনে চলার কথা বলেছে, সেই অনুযায়ী কাজ করছি।
“আদালত কিছু গাইডলাইন সাপেক্ষে মামলাটি তুলে নিয়েছে। সে অনুসারে আগাচ্ছি। গাইডলাইনে পরিবেশ রক্ষা করার বিষয়টি রয়েছে।”
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালি পর্যন্ত পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর আওতায় র্যাম্পসহ মোট ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের চুক্তি সই ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি।
এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার মূল এক্সপ্রেসওয়ে এবং র্যাম্প ২৭ কিলোমিটার। পুরো এক্সপ্রেসওয়েতে মোট ৩১টি র্যাম্প হবে।
২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকল্পের সংশোধিত চুক্তি সই হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৪৬১ মিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কর্মাশিয়াল ব্যাংক অব চায়না’ এর সঙ্গে ৪০০ মিলিয়ন ডলার মিলিয়ে মোট ৮৬১ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়।
এরই একটি র্যাম্প (উঠার জন্য) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁও সংলগ্ন পান্থকুঞ্জ পার্কের অংশে পড়েছে। কিন্তু পার্কের পরিবেশ নষ্ট করে র্যাম্প নির্মাণ নিয়ে পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’ এর সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীনসহ নয়জন একটি রিট আবেদন করেন। এরপর পান্থকুঞ্জে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধের আদেশ দেয়।
তবে রিট আবেদনকারীদের একজন আমিরুল রাজিব বলেন, “ওরা তো আদালতে কোন নির্দেশনাই মানে নাই। পান্থকুঞ্জ পার্কে ‘বেলা’ (পরিবেশবাদী সংগঠন) থেকে একটা রিট আবেদন করা হয়েছিল। সেখানে ময়লা ফেলার যে স্টেশন, সেটা যেন না হয়। কিন্তু সেটাও হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এক্সপ্রেসওয়ের এই অংশ নিয়ে একটা মামলা করেছিলাম। ওইখানে যে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই তারা কাজটা চালিয়েছে। এমনকি আদালত যখন তাদের নির্দেশ দিয়েছে কাজটা না চালানোর জন্য, তখনও কিন্তু তারা কাজটা চালিয়ে গেছে।
“এই অঞ্চলে তো একটা মাঠও নাই। যদি রাস্তাটা এখানে চলে যায়, আরো ৮০০ গাছ কাটা পড়বে। পুরো এলাকার মানুষজনের দুর্ভোগ হবে। এটা হলে জনদুর্ভোগ কিন্তু কমছে না।”
পান্থকুঞ্জ পার্ক ছাড়া ওই এলাকা সবুজ জায়গা নেই মন্তব্য করে আমিরুল রাজিব বলেন, “এটা একটা ধান্দাবাজি প্রজেক্ট।”
পান্থকুঞ্জ পার্কে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দুই ধরনের বক্তব্য রয়েছে। কেউ বলছেন, পার্ক ধ্বংস করে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের র্যাম্প নামানো প্রকৃতি বিধ্বংসী কাজ। আবার কেউ কেউ পার্কের পরিবেশ ঠিক রেখে র্যাম্প নির্মাণের পক্ষে কথা বলছেন।
পান্থকুঞ্জ পার্ক সংলগ্ন কাঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, “বাসা থেকে বের হলেই রিকশার চাপে মাথা নষ্ট হয়ে যায়, তাও যানজট পোহাতে হচ্ছে না। কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের গাড়ি ওঠার ব্যবস্থা করা হলে তো আর বেরই হওয়া যাবে না। যানজটে অতিষ্ঠ হতে হবে প্রতিদিন।
“তাছাড়া পান্থকুঞ্জ পার্ক ছাড়া আমাদের এলাকায় কোনো পার্ক নাই। হাঁটার কোনো ব্যবস্থা নাই। গাছ কেটে করা হচ্ছে এসব, পরিবেশ আর থাকল কোথায়।”
হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ওরশন জামান বলেন, “কাঁঠালবাগান ও হাতিরপুল এলাকার একমাত্র সবুজ উদ্যান পান্থকুঞ্জ পার্ক। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের জন্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে বিপন্ন হচ্ছে। এর ফলে বায়ুদূষ আরও বেশি হবে।”
কাঠালবাগান এলাকার আরেক বাসিন্দা তার যাতায়াত ভোগান্তির কথা তুলে ধরে বলেন, “নিয়মিত উত্তরা অফিস করতে হয়, এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতেই আধা ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
“অর্থাৎ পুরান ঢাকা, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বুয়েট, বকশিবাজার, আজিমপুরসহ পুরো এলাকার লোকজনের এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে হলে যেতে হয় বিজয় সরণি বা তেজগাঁও। এখানে র্যাম্প থাকলে তো আমাদের জন্য প্রশান্তি হবে। এত যানজটের চাপ নিতে হবে না।”
তিনি বলেন, “এটা তো খুশির খবর, কারণ পার্কের পরিবেশ ঠিক রেখে র্যাম্প নামালে কোনো সমস্যা দেখছি না। রাস্তা করতে হলে তো কিছুটা পরিবেশ নষ্ট হবেই। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে।”