১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ফ্ল্যাট ‘জালিয়াতি’: টিউলিপদের মামলার অভিযোগ গঠন ঝুলে গেল

“আদালত আমাদের বলেছেন, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নিয়ে আসতে,” বলেন দুদকের প্রসিকিউটর সালাম।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Sep 2026, 06:32 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:56 PM

রাজধানীর গুলশানে ‘ঘুষ হিসেবে’ একটি ফ্ল্যাট গ্রহণের মামলায় উচ্চ আদালত এক আসামির বিরুদ্ধে কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এ কারণে মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি আবার পিছিয়ে গেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি, ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিকসহ এ মামলায় আসামি দুইজন।

এর মধ্যে রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে আগামী বছরের ১১ জানুয়ারি ধার্য করেছে।

ওই আদালতের স্ট্রেনোগ্রাফার সোহানুর রহমান এ তথ্য দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মোশাররফ হোসেনের পক্ষে তার আইনজীবী আদালতকে বিষয়টি অবহিত করে শুনানি পেছাতে আবেদন করেন।

দুদক প্রসিকিউটর মীর আহম্মেদ আলী সালাম বলেছেন, এ মামলায় আসামি ছিলেন তিনজন। এক আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত স্থগিত করেছে উচ্চ আদালত। এখন মোশাররফ হোসেন উচ্চ আদালতে গিয়ে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতাদেশ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, “আদালত আমাদের বলেছেন, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নিয়ে আসতে। আমরা এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতে আপিল করব।” 

গত ৭ জুলাই উচ্চ আদালত মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে আদেশ দেন, বলেছেন দুদকের প্রসিকিউর।

ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৫ এপ্রিল টিউলিপ, রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান ও সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা-১ সরদার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

মামলা হওয়ার পর জুলাই মাসে আসামি শাহ খসরুজ্জামান তদন্ত স্থগিত চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন। হাই কোর্ট খসরুজ্জামানের বিষয়ে তদন্ত তিন মাসের জন্য স্থগিত করে।

খসরুজ্জামানকে ছাড়াই বাকি দুই আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর গত ১৩ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। 

মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

টিউলিপ সিদ্দিককে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির পদক্ষেপ চেয়ে আদালতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৬ ফেব্রুয়ারি শুনানি নিয়ে আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে। 

এরপর আসামিদের আদালতে হাজির হতে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৬৩ সালে তৎকালীন বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরী গুলশানে ১ বিঘা ১৯ কাঠা ১৩ ছটাক আয়তনের একটি প্লট (বর্তমান ১১এ ও ১১বি) বরাদ্দ পান। 

সরকারি লিজ চুক্তি অনুযায়ী, ৯৯ বছরের মধ্যে ওই প্লট হস্তান্তর বা ভাগ করে বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল।

কিন্তু ১৯৭৩ সালে তিনি মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়াকে আমমোক্তার করে প্লটটি হস্তান্তর করেন। মজিবুর রহমান ভূঁইয়া এরপর প্লটটি ভাগ করে স্ত্রী শামসুন নাহার এবং শ্যালিকা জেরিন বেগমের কাছে বিক্রি করেন।

শামসুন নাহার পরে ৫০ লাখ টাকায় ওই প্লট বিক্রি করেন ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলামের দুই মেয়ে নাইমা ইসলাম ও কনিতা ইসলামের কাছে। তারা দুই বোন পরে ওই জমিতে ভবন নির্মাণের জন্য তাদের বাবা জহুরুল ইসলামকে ব্যক্তি হিসেবে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দেন।

জহুরুল ইসলাম রাজউকের মাধ্যমে প্লটটি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছয় তলা ভবন নির্মাণ শুরু করেন। কাজ চলার মধ্যেই তিনি মারা যান। পরে দুই বোন তাদের ভাই মঞ্জুরুল ইসলামকে আমমোক্তারনামা দেন; কিন্তু পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে সেই আমমোক্তারনামা বাতিলও করেন।

মঞ্জুরুল ইসলাম তখন আদালতে মামলা করেন। অন্যদিকে তার দুই বোনও তাদের স্বত্ত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় দুই বোন ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনুমতি না দেওয়ার জন্য রাজউকে আবেদন করেন।

দুদক বলছে, রাজউকের তৎকালীন আইন উপদেষ্টারা তখন দুই দফায় ‘অসত্য তথ্য’ দিয়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডকে ‘অবৈধভাবে’ ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনুমোদন দেন, যদিও ইস্টার্ন হাউজিং প্লটের মালিক না।

লিজ দলিলের শর্ত অনুযায়ী ৯৯ বছরের মধ্যে ওই প্লট হস্তান্তর করার কথা নয়। আংশিক বিভাজন করে হস্তান্তরেরও সুযোগ সেখানে নেই। সেখানে শর্ত না মেনে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে’ আমমোক্তার নিযুক্ত করা হয়েছে ও প্লটটি বিক্রি, বিভাজন ও হস্তান্তর করা হয়েছে বলে দুদকের ভাষ্য।

দুদক বলছে, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যানকে আমমোক্তার নিয়োগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক দুই পক্ষকে ডাকলেও তারা হাজির হননি। ওই আমমোক্তারনামা অনুমোদনই হয়নি।

মামলার অভিযোগে বলা হচ্ছে, ওই প্লট ভেঙে দুই টুকরো করে তাতে ভবন তুলে ৩৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়। অথচ Individual Person থেকে Legal Person হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের মালিকানা স্থানান্তর দুদকের ভাষায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ছিল।

দুদক বলছে, নিয়ম ভেঙে প্লটের বিভাজন এবং ৩৬টি ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনুমোদন করিয়ে দেবার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তার খালা শেখ হাসিনা তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ইস্টার্ন হাউজিংকে ওই ব্যবস্থা করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ‘অবৈধ পারিতোষিক হিসাবে বিনে পয়সায়’ একটি ফ্ল্যাট নিয়েছেন।

‘অবৈধ সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ’ হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি চিঠির কথা বলছে দুদক, যেখানে ‘রিজওয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ’কে বিনামূল্যে একটি ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইস্টার্ন হাউজিং থেকে রাজউকে ফ্ল্যাট মালিকদের যে তালিকা পাঠানো হয়েছিল, তার ৫ নম্বরে টিউলিপের নাম ছিল। দুদক বলছে, টিউলিপ যে ‘অবৈধ প্রভাব খাটিয়েছেন’ ওই তালিকা তার প্রমাণ।

বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ৮ এপ্রিল ঢাকার মহানগর হাকিম জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ মামলাটি ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে বদলির আদেশ দেন। একইসঙ্গে অভিযোগ গঠনের জন্য ১৬ এপ্রিল দিন ঠিক করা হয়েছিল।

বরাবরই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসা এই ব্রিটিশ এমপি বলে আসছেন, তার খালা শেখ হাসিনার প্রতি ‘প্রতিহিংসা’ থেকে তার বিরুদ্ধে এসব ‘মিথ্য ও বানোয়াট’ মামলা দেওয়া হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ এক ডেভেলপারের কাছ থেকে লন্ডনে ৭ লাখ পাউন্ড দামের একটি ফ্ল্যাট ‘উপহার’ পাওয়ার খবর নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন টিউলিপ সিদ্দিক।

এর আগে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির তিন মামলায় দুই বছর করে ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়েছে টিউলিপের।

বিচারের জন্য প্রস্তুত টিউলিপের 'ফ্ল্যাট দুর্নীতিমামলা