‘ইয়াবা না দেওয়ায়’ মামুনকে গুলি, দুইজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
পুলিশের ভাষ্য, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে মামুনের সঙ্গে তামিম ও হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় মামুন শিকদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তানভীর ইসলাম ওরফে তামিম ও মেহেদী হাসান ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে মামুনের সঙ্গে তামিম ও হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। হত্যার রাতে ইয়াবা সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা মামুনের মেসে যায়। সেখানে তামিম ইয়াবা চান। না দেওয়ায় মামুনকে গুলি করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান তারা।
২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর রাত সাড়ে ৩টার দিকে মধ্য বাড্ডার কমিশনার গলির একটি মেসের নিচতলায় মামুনকে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরদিন মামুনের মামা মো. জামান বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই তামিম ও হৃদয়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন বাড্ডা থানার এসআই ইব্রাহিম আকন্দ।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মামুন পেশায় বাসচালক ছিলেন। মধ্য বাড্ডার কমিশনার গলির একটি মেসে লিটন মাদবরের সঙ্গে থাকতেন তিনি। তামিম ও হৃদয় মাঝে মধ্যে ওই মেসে গিয়ে মামুনের সঙ্গে মাদক সেবন করতেন। এ সূত্রেই তাদের মধ্যে পরিচয় হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ আগে মাদকসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মামুনের সঙ্গে তামিম ও হৃদয়ের ঝগড়া ও মনোমালিন্য হয়। এর জেরে তারা মামুনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
হত্যার রাতে যা ঘটেছিল
হৃদয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর রাত ১টার দিকে হৃদয় তামিমের বাসার নিচে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর তারা দুটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেন।
রাত আড়াইটার দিকে আবার ইয়াবা সেবনের নেশা চাপলে তামিমের মোটরসাইকেলে করে তারা মেরুল বাড্ডার পশ্চিম মেরুল এলাকায় যান। সেখানে শুভ ও ‘পেট কাটা রুবেল’ নামে পরিচিত দুজনের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। তামিম তাদের কাছে ইয়াবা চান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়াবার দাম পরিশোধ নিয়ে তামিমের সঙ্গে শুভর তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হয়। হৃদয় দুজনের বিরোধ থামিয়ে তামিমকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন।
ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন হৃদয়। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, তামিম তাকে মধ্য বাড্ডার ইউ লুপের বাঁ পাশ দিয়ে কমিশনার গলিতে ঢুকতে বলেন। রাত তখন প্রায় সাড়ে ৩টা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তামিমের নির্দেশে হৃদয় মোটরসাইকেল চালিয়ে মামুনের মেসের সামনে যান। সেখানে তামিম মোটরসাইকেল থেকে নেমে হৃদয়কে বলেন, “দাঁড়া, ইয়াবা নিয়া আসি।”
হৃদয় মোটরসাইকেলের কাছে অপেক্ষা করতে থাকেন। তামিম পিস্তল নিয়ে মেসের কক্ষে ঢোকেন।
অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, সেখানে মামুনের কাছে ইয়াবা চান তামিম। মামুন ইয়াবা না দেওয়ায় তামিম তার কোমরে থাকা পিস্তল বের করে মামুনের থুতনির নিচে ঠেকিয়ে গুলি করেন।
আর হৃদয়ের জবানবন্দি অনুযায়ী, কয়েক মিনিট পর দুজন তরুণ ওই জায়গা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসেন। এরপর তামিমও বেরিয়ে এসে তাকে দ্রুত মোটরসাইকেল চালাতে বলেন। তখন তামিম বলে, “বন্ধু তাড়াতাড়ি চল, আমি তো গুলি করে মানুষ মাইরা ফালাইছি।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গুলির শব্দ ও মামুনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে তামিম ও হৃদয় মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। গুলিতে ঘটনাস্থলেই মামুনের মৃত্যু হয়।
হৃদয়ের জবানবন্দি অনুযায়ী, পালানোর কিছুক্ষণ পর তামিমের মনে পড়ে, তিনি মেসে নিজের মোবাইল ফোন রেখে এসেছেন। এরপর তারা আবার সেখানে যান। তামিম মেসে গিয়ে ফোন খোঁজেন, তবে সেটি পাননি।
পরে তারা তামিমের বাসার নিচে যান। সেখানে তামিম তার স্ত্রীকে হৃদয়ের মোবাইল ফোন থেকে কল করে কাপড়চোপড় নিয়ে প্রস্তুত হতে বলেন। এরপর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তামিম সেখান থেকে চলে যান।
হৃদয় পরে লেকপাড় হয়ে হেঁটে গুলশানের দিকে যান এবং বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকেন বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন হৃদয়
মামলা হওয়ার পর তদন্তে প্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন তথ্য ব্যবহার করে হৃদয়ের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করে পুলিশ। পরে তাকে গ্রেপ্তারে র্যাবের সহায়তা নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য, ১৪ নভেম্বর পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানার মজিদবাড়িয়া শাহী জামে মসজিদ এলাকা থেকে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে বাড্ডা থানায় হস্তান্তর করা হয়।
পরদিন ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জি এম ফারহান ইশতিয়াকের আদালতে হৃদয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তামিমকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
অস্ত্র মেলেনি
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইব্রাহিম আকন্দ বলেন, মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরেই মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, “মাদক সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে ভিকটিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে দুইজনকে আসামি করে গত মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি। দুই আসামি কারাগারে রয়েছে।”
হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “দুই আসামির তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের ইনফরমেশন ভুল ছিল। হয়ত অস্ত্রটা হাত বদল হয়েছে বা কেউ পেয়েছে।”
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা তামিম ও হৃদয়কে ‘সন্ত্রাসী প্রকৃতির’ লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিমের বিরুদ্ধে মারামারি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এবং হৃদয়ের বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে।
ঘরে ছিলেন লিটন
ঘটনার সময় মামুনের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন লিটন মাদবর। তিনি বলেন, ওই রাতে অসুস্থ থাকায় দরজা চাপিয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
“ওইদিন আমার অনেক জ্বর ছিল। আনুমানিক রাত ২টার দিকে মামুন রুমে ঢোকে। এরপর কারা কারা যেন আসে। মিনিট ৩০ পর হুড়াহুড়ি, পাড়াপাড়ি শুরু হয়। আমার শরীর বেশি খারাপ লাগায় কাঁথা পেঁচিয়ে শুয়ে থাকি। একটু পর গুলির শব্দ পাই। গুলি করেই রুম থেকে বের হয়ে যায়।”
তিনি বলেন, “মামুনকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সবাই ভয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। আমিও ভয়ে বের হয়ে যাই। পরে শুনেছি, মামুন তখন ইয়াবা সেবন করছিল। যারা আসছিল, তারা নাকি ইয়াবা নিতে আসছিল। মামুন তাদের রুমে ঢুকতে না দিলে তো তারা ঢুকতে পারত না।”
মামুনের পরিবার বিচার চায়
মামলার বাদী ও মামুনের মামা মো. জামান বলেন, তারা ভাগ্নে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চান।
তিনি বলেন, “আমার একটা বোন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। বোনের জামাই আগেই মারা গেছে। বোনটা গত বছর রোজার ঈদের সময় মারা যায়। আর ভাগ্নির বিয়ে হয়েছে, সে শ্বশুড়বাড়িতে আছে।”
মামুনের পারিবারিক জীবনের কথা তুলে ধরে জামান বলেন, “মামুন বিয়ে করেছিল। বউটা চলে যায়। এরপর মাকে নিয়ে ছিল। মা মারা যাওয়ার পর ওই বাসায় ওঠে। কে বা কারা কীসের জন্য ভাগ্নেটা খুন করেছে জানি না। তবে আমরা সুষ্ঠু একটা দ্রুত বিচার চাই।”
