Published : 12 Aug 2026, 07:21 PM
দেশে বন্য হাতির সংখ্যা যে কমে আসছে, সেই তথ্য তুলে ধরে এ প্রাণীর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
এ বছরের বিশ্ব হাতি দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘ব্রিংগিং দ্য ওয়ার্ল্ড টুগেদার টু হেল্প এলিফ্যান্টস’। এর বাংলা প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’।
মন্ত্রী বলেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষা মানে শুধু হাতিকে রক্ষা করা নয়; এর মাধ্যমে বন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত হয়।
“একসময় দেশে প্রচুর হাতি থাকলেও বর্তমানে এ প্রাণীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। আবাসস্থল দখল ও ধ্বংস, বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ হাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
২০১৫ সালের জরিপের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতি ছিল ২৬৮টি এবং পরিযায়ী বন্য হাতি ৯৩টি। এ ছাড়া পোষা হাতি ছিল ৯৬টি।
২০২৭ সালের মধ্যে আবার হাতি জরিপের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করে ‘বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮–২০২৭)’ প্রণয়ন করার কথা বলেন তিনি।
মানুষ-হাতি সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হাতির আক্রমণে নিহত ৩২২ জনের পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির শিকার ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ সময় হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুততম সময়ে ক্ষতিপূরণ দিতে বন অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
মানুষ-হাতি সংঘাত মোকাবিলায় হাতি অধ্যুষিত এলাকায় ১৫৯টি ১৫৯টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানান আবদুল আউয়াল মিন্টু।
তিনি বলেন, “হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে হাতি সংরক্ষণ কখনোই টেকসই হবে না।”
এই দলগুলো হাতির আগমন সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে কাজ করে। বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম ব্যবহারের উদ্যোগের কথা আগের সরকারি ও সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডের নথিতেও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল তার সংসদীয় এলাকায় হাতির আক্রমণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হাতি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপরও জোর দেন তিনি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সরকারের সঙ্গে একযোগে হাতি সংরক্ষণে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, হাতি রক্ষার সুফল অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হওয়ায় সংরক্ষণ প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে হাতি সংরক্ষণে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল মোতালেব হাতি নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে হাতি সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।