Published : 08 Aug 2025, 09:20 PM
জনপ্রশাসনের যারা ‘দুর্নীতি’ করেছেন, তাদের কেউ কারাগারে, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব মাথায় রেখে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে কাজ করার তাগিদ এসেছে এক সেমিনারে।
সেখানে এও বলা হয়েছে, জনগণ প্রশ্ন করতে শিখে গেছে, এখন আর দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে না।
শুক্রবার ‘জুলাই গণঅভ্যুথানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনারে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন অভিমত এসেছে।
ঢাকার ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে এ সেমিনার আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
সেখানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুথানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্খা গড়ে উঠেছে, তাতে এখন দুর্নীতি করে আর পার পাওয়া যাবে না।
“জনপ্রশাসন আজকে একটা চৌরাস্তায় এসে ঠেকেছে। এখন চিন্তা করতে হবে, কোন পথে যাবেন? পথ দুটি, একটি এতকাল যে পথে চলেছি। আরেকটু হল- নতুন পথে চলা। আমরা পুরোনো পথে ফিরবো নাকি আত্ম-বিশ্লেষণ করে নতুন পথ গড়বো, তা নিয়ে সবাইকে চিন্তা করতে হবে।”
অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ এসেছে, তাতে এখন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারপন্থি হওয়ার কোনো চাপ নেই দাবি করেন মুখ্য সচিব। তার বলেন, এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজের মতো কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সিরাজ উদ্দিন বলেন, “২০১৮ সালে কিশোরেরা যে আন্দোলন করেছিল, তাদের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা নিইনি। সেদিনের কিশোরেরা আজকে তরুণ হয়ে অভ্যুথান ঘটিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুন পথ তৈরি, নতুন ভাবমূর্তি এবং আত্মপরিচয় তৈরি করতে পারলেই জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ হবে। পুরনো পথে গেলে ধ্বংসের পথে যেতে হবে।”
সেমিনারের মুখ্য আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, “প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা দুর্বল করে ফেলেছি। মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শিখে গেছে। ফলে এখন ইচ্ছা থাকলেই দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে না।
“আর রাজনীতি থেকে প্রশাসনকে আলাদা রাখা যাবে? সেটা কতটা সম্ভব? এটা পরিস্কার, প্রশাসনে যারা থাকবেন, তারা যোগ্য লোক হবেন। পেশাদারিত্বের সাথে নীতির বাস্তবায়ন করবেন।”
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসির সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, “আমরা বছরে বছরে শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিকুলাম পরিবর্তন করেছি। এটা মূলত একটা ব্যবসা। আমাদের বই ছাপাতে হয়েছে অন্য দেশে গিয়ে। কেন আমাদের দেশেই করা গেলো না?
“আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়ায়নি। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়তে পারিনি। প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে যাওয়ার কারণেই কিন্তু জুলাই অভ্যুথান হয়েছে।”
তিনি বলেন, “টাকা পাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান হয়েছেন, যা দুর্ভাগ্যজনক।”
জনপ্রশাসনকে দলীয় রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার কথাও বলেন সানোয়ার জাহান।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাজে ন্যস্ত, কোনো দলীয় লোক নয়। আইনসংগত না হলে তা বিনয়ের সাথে বলতে হবে। আমরা মনে হয় তা বলিনি, যদি বলতাম- তাহলে এতটা অকার্যকর হতো না প্রতিষ্ঠানগুলো।”
সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ ও কোটাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে চাকরি প্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায় বলেও মন্তব্য করেন সরকরি কর্ম কমিশনের এই সদস্য।
সেমিনারে অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার বলেন, “জনপ্রশাসনে কর্মরতদের কোনো দলীয় বৃত্তে না থেকে কাজ করতে হবে। বিগত সময়ে যারা দুর্নীতি করেছেন, আমাদের সহকর্মীরা। তাদের কেউ কেউ এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ এখন কারাগারে। এসব মাথায় রেখে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে কাজ করতে হবে।”
জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের যে চাওয়া, তা পূরণ করার কথা বলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র আমাদের বেতন দেয়, জনগণের জন্য কাজ করার জন্য। আমরা যেন কোনো ফ্যাসিস্টের সহায়ক না হই।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, “আমাদের এত আইন রয়েছে, তার প্রয়োগ নেই। আমি মনে করি, আমাদের আর আইনের দরকার নেই। দরকার প্রয়োগ। যত আইন আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ হলেই অনেক কিছুর সমাধান হবে।
“আমাদের অন্তত চারজন সহকর্মী এখন কারাগারে। তারা আমাদের চেয়েও বড় পদে কাজ করেছেন। কিন্তু তারা কি সেসব ভোগ করতে পেরেছেন? এসব মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে।”
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা লাসনা কবীর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. রমজান আলী, শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি।
সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম।