Published : 06 Sep 2026, 05:04 PM
ফিজিতে নিখোঁজ বাংলাদেশি শেফ পার্বণ বড়ুয়াকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট।
একইসঙ্গে তাকে খুঁজে বের করে বর্তমান অবস্থান জানাতে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার ও লেবার উইংয়ের সংশ্লিষ্ট ফার্স্ট সেক্রেটারিকে তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি রিট আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের হাই কোর্ট বেঞ্চ রোববার রুলসহ এ আদেশ দেয়।
পার্বণ বড়ুয়ার মা শেলী প্রভা বড়ুয়া ওরফে শেলী বড়ুয়া গত ১০ অগাস্ট হাই কোর্টে রিট আবেদনটি করেন। সেখানে মোট নয়জনকে বিবাদী করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, ক্যানবেরায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার ও লেবার উইংয়ের ফার্স্ট সেক্রেটারি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও ওয়েলফেয়ার উইংয়ের মহাপরিচালক এবং ফিজিতে কর্মরত রেস্তোরাাঁ ম্যানেজার মিল্টু সাংমা রয়েছেন তাদের মধ্যে।
শেলী বড়ুয়ার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, পার্বণ বরুয়া কক্সবাজারের একটি হোটেলে শেফ হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে কাজ করার সময় ময়মনসিংহের মিল্টু সাংমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
ভালো বেতনের চাকরির আশ্বাসে ফিজিতে যাওয়ার জন্য মিল্টু সাংমা ও টমাস গোমেজের মাধ্যমে পার্বণ ৪ লাখ টাকা খরচ করেন। পরে ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট তিনি ফিজিতে যান।
ফিজিতে যাওয়ার পর টাপ্পু গ্রুপের একটি হোটেলে শেফ হিসেবে কাজ পান পার্বণ। সেখানে কর্মরত দুই ভারতীয় প্রধান শেফ–সুরেন্দ্র ও প্রাবীণের সঙ্গে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষের জেরে তার সম্পর্কের অবনতি হয়।
জ্যোতির্ময় বলেন, “এক পর্যায়ে ওই দুই ভারতীয় শেফ ও রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মিল্টু সাংমা মিলে পার্বণকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। নির্যাতনের শিকার হয়ে পার্বণ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানান।”
সবশেষ ২০২৫ সালের ৬ জুলাই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। নিখোঁজ হওয়ার আগে ম্যানেজার মিল্টু সাংমা পার্বণের মামাকে ফোনে জানিয়েছিলেন, ফিজির টটোগো পুলিশ স্টেশন পার্বণকে হেফাজতে নিয়েছিল।
তবে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর মিল্টু সাংমা আবার ফোন করে বলেন, পার্বণ পুলিশ স্টেশন থেকে ‘পালিয়ে গেছেন’। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মিল্টু সাংমা টাপ্পু গ্রুপের ওই রেস্তোরাঁয় ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন জানিয়ে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বলেন, পার্বণ নিখোঁজ হওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা আর সম্ভব হয়নি।
পার্বণকে খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তার মা ও মামা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি ও আবেদন করেন। কিন্তু কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন।
ফিজিতে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশন নেই জানিয়ে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাই কমিশন ফিজির বিষয়গুলো দেখাশোনা করে।
সেখানকার হাই কমিশনার ও লেবার উইংয়ের সংশ্লিষ্ট ফার্স্ট সেক্রেটারিকে পার্বণ বড়ুয়ার বিষয়ে তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে হাই কোর্টে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে এ আইনজীবী বলেন, নোটিস পাওয়ার পর থেকে ৩০ দিনের সময় গণনা হবে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের বাইরে থাকলেও একজন নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার রয়েছে।
এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮-এর ৮(৬) ধারা অনুযায়ী বিদেশে বিপদে পড়া কর্মীকে উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয়তা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে আইনি সহায়তা ও দেশে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার বিষয়টিও রিট মামলার ভিত্তি হিসেবে দেখাচ্ছেন আইনজীবী।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “পার্বণ বড়ুয়া সর্বশেষ ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য আমি নিজের জীবন উৎসর্গ করলাম।’ তবে ওই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে কটাক্ষ করার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে পার্বণের সঙ্গে ভারতীয় ওই দুই শেফের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্বণ ‘কোনো ঘটনার শিকার’ হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
“পার্বণ বড়ুয়াকে এখনও নিখোঁজ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জীবিত থাকলে কোথায় ও কী অবস্থায় আছেন, আর মারা গেলে কবে মারা গেছেন—এসব তথ্য জানতে চায় তার পরিবার।”