Published : 09 Mar 2026, 12:05 AM
বাংলাদেশের পুষ্পিতা রায় পড়ালেখা করছেন দিল্লির শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন মাসের ছুটিতে বাড়ি এসে ঘরে বসে থাকছেন না। অমর একুশে বইমেলায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের স্টলে পাওয়া গেল তাকে। এখানে তিনি বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।
পুষ্পিতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন মাসের ছুটিতে এসে ভাবলাম কি করা যায়, পরে বইমেলায় কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ভালো লাগছে যে বইয়ের সঙ্গে আছি।”
পুষ্পিতার মতো আরো অনেক শিক্ষার্থীকে কর্মব্যস্ত দেখা যাচ্ছে মেলার বিভিন্ন স্টলে। তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।
রোববার নারী দিবস উপলক্ষে কোনো কোনো স্টলের কর্মীরা এসেছিলেন বাহারি সাজে।
বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে এবার মেলায় অংশ নিচ্ছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানের মোট ১,০১৮টি ইউনিট রয়েছে।
এসব স্টলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে যারা কাজ করছেন, তাদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। অন্তত এক হাজারের বেশি জনবল কাজ করছে মেলার বিভিন্ন স্টলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে, যার অধিকাংশই নারী।
অনার্য পাবলিকেশনে বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাত আলম। এই প্রথম বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে বইমেলায় কাজ করছেন তিনি।

জান্নাত বলেন, “অনেক লোকজন আসেন, বই নিয়ে কথা হয়। সব মিলিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হচ্ছে। মেলায় এসে নতুন নতুন বই সম্পর্কে জানা যায়। পাঠকদের সাথে আন্তরিকতার জায়গা তৈরি হয়।”
মেলায় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার মঞ্চের পাশেই প্রকাশনা সংস্থা দোলনের স্টল। এই স্টলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন বিপ্লবী সরকার। ২০১৯ সাল থেকেই নিয়মিত বইমেলায় আসেন তিনি।
বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বিপ্লবী বলেন, “আমার ভালো লাগার জায়গা বইমেলা। সেইজন্যই আসা। তবে এবারের বইমেলা ব্যতিক্রম অনেক। কারণ, যে লোক সমাগম থাকার কথা, তার ছিটেফোঁটাও নেই। একজন বইপ্রেমী হিসেবে এটা পীড়াদায়ক আমার কাছে। কেমন একটা শূন্যতা অনুভব করছি।”
তিতুমীর কলেজে স্নাতকের ছাত্রী বিপ্লবী বললেন, মেলায় কাজ করাটা উপভোগ করছেন তিনি।
“এখানে কাজ করে তো একটা ভালো অভিজ্ঞতা হচ্ছে। নতুন নতুন মানুষ আছে মেলায়, তাদের সঙ্গে কথা বলছি। ভালো লাগছে।”
মেলায় প্রথমা, বাতিঘর, অন্যপ্রকাশ, আদর্শ, কথাপ্রকাশ, ইউপিএলসহ বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে ৮/১০ জন করেও বিক্রয় ব্যবস্থাপক রয়েছেন। ছোট স্টলেও দুজন করে রয়েছেন। সেই হিসাবে ১ হাজারের বেশি বিক্রয় ব্যবস্থাপক বই বিক্রির কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
অনিন্দ্য প্রকাশ স্টলের সাইমুন নেছা সাদিয়া ৫ বছর ধরে বইমেলায় একই প্রকাশনীর বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, “আমার খুব স্বাচ্ছন্দের একটি জায়গা হয়ে গেছে বইমেলা। এটাও একটা ব্যবসা, কিন্তু এই ব্যবসায় জ্ঞানের মিশেল আছে। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি আমি মানসিকভাবেও এখান থেকে লাভবান হতে পারছি। এজন্যই কাজটা আমার কাছে বেশি ভালো লাগে।”
রোববার ছিল অমর একুশে বইমেলার ১১তম দিন। মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
মেলার জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৭৫টি। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি, গবেষক, সাংবাদিক মাহবুব হাসান।
মেলার মাঠে ঘুরে দেখা যায়, নারী দিবস উপলক্ষে অনেকেই ঘুরতে এসেছেন বইমেলায়। কেউ কেউ প্রিয়জনদের বই উপহারও দিচ্ছেন। কেউ শাড়িতে সেজেছেন, কেউ আবার অফিস থেকে সোজা চলে এসেছেন বইমেলায়।
আনিকা, মাহমুদাসহ পাঁচ বান্ধবী এসেছিলেন বইমেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সহপাঠী ছিলেন। নারী দিবসে একসঙ্গে হতেই বইমেলায় এসেছিলেন।
মাহমুদা বলেন, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি পাঁচ বছর আগে। আমাদের সহপাঠীদের কেউ বিদেশে আছেন। কেউ আবার ঢাকাতেই চাকরি করছেন। ঢাকায় যারা আছি, তারা বইমেলায় একসঙ্গে হয়েছি।”

আসাদ চৌধুরী স্মরণ
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: আসাদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেন কবি সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করেন গবেষক সৈয়দ আজিজুল হক।
কুদরত-ই-হুদা বলেন, “কবি আসাদ চৌধুরী দীর্ঘ আশি বছর পুরোদস্তুর একজন কবির জীবনযাপন করেছেন। তার কবিতায় সবসময়ই সক্রিয় থেকেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি অপরিসীম দরদ। তার যাপন আর কবিতার মধ্যে ছিল একটা খাঁটি পূর্ববঙ্গীয় ব্যাপার। তাকে বাংলাদেশের ভাষা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস আর নিজস্ব কাব্যপ্রগতির সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে পাঠ করা যায়।”
সৈকত হাবিব বলেন, “আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম বরেণ্য ব্যক্তিত্ব কবি আসাদ চৌধুরী। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অবদান সুদূরপ্রসারী। তিনি একাধারে কবি, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও জনপ্রিয় উপস্থাপক।
“আসাদ চৌধুরী সকল ক্ষেত্রেই তার মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার শারীরিক ও বাচনিক ব্যক্তিত্বই আমাদের স্মৃতিতে প্রবলভাবে হাজির হয়।”
সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, “কবিতার মধ্য দিয়ে বাঙালির ঐতিহ্যকে তুলে ধরার একটি প্রবণতা কবি আসাদ চৌধুরীর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। বিচিত্র বিষয়ে লেখার প্রবণতা ছিল তার।
“তিনি আপামর জনসাধারণের কাছে কবি হিসেবে যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে বেশি পরিচিত একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ও সুবক্তা হিসেবে।”

গান-কবিতার আয়োজন
বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন রহিমা আখতার কল্পনা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আলো আরজুমান বানু, ফারজানা এ্যালি।
সংগীত পরিবেশন করেন কল্যাণী ঘোষ, নিপা আক্তার, জাকিয়া সুলতানা স্বর্ণলতা, আরিমা তাবাসসুম, সাধিকা সৃজনী তানিয়া, দিপু সমাদ্দার, মমতা দাসী ও তাপসী রায়। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন জয়সিংহ রায় (তবলা), ডালিম কুমার বড়ুয়া (কী-বোর্ড), এফ এম আলমগীর কবীর (বাঁশি), সুমন কুমার সাহা (অক্টোপ্যাড) এবং জহির উদ্দিন (দোতারা)।

সোমবার যা থাকছে
সোমবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ: শহীদুল্লা কায়সার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।