Published : 30 Jun 2026, 10:53 AM
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধে করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে মঙ্গলবার।
এদিন দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করবে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম সোমবার বলেন, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে দুপুর দেড়টায় রায় বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিভিন্ন মামলায় হেফাজতে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু করে প্রতিবেদন দাখিল করে ১১ সেপ্টেম্বর। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ২২ জুন রায়ের জন্য মঙ্গলবার দিন ঠিক করে দেয় ট্রাইব্যুনাল।
মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার একটি হচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করার নির্দেশসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া।
প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা হল- আইন অনুযায়ী তার যে অপরাধ, সে অনুযায়ী তার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়, সেটাই প্রত্যাশা করছি।”
আসামির আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি—এই মামলায় হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মনগড়া, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
“প্রসিকিউশন ইনুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি এবং তারা ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র গোপন করেছে।”
আইনজীবী শুভ বলেন, “আসামিপক্ষ থেকে ২১টি পত্রিকার (প্রিন্ট ও অনলাইন) রিপোর্ট, দুটি টেলিভিশন টকশো এবং কুষ্টিয়ার ৬জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত ৬টি মামলার এজাহার বা নালিশি দরখাস্তের কপি প্রদর্শনী হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।
“আমরা আশা করছি, মাননীয় ট্রাইব্যুনাল জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এ বাংলাদেশে সংঘটিত ‘নন-ইন্টারন্যাশনাল আর্মড কনফ্লিক্ট’ এর সম্পূর্ণ চিত্র বিবেচনায় নিয়ে জনাব ইনুকে বেকসুর খালাস প্রদান করবেন।”
কী কী অভিযোগ, যেভাবে রায়ের পর্যায়ে
গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর মামলার ইনুর বিরুদ্ধে ৩৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে ২০ জনকে সাক্ষী করা হয় এবং মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, ১৮ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাও’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে বল প্রয়োগের উসকানি ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় সারা দেশে সেনা মোতায়েন করে কারফিউ জারি ও ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নির্দেশ দেন।
তৃতীয় অভিযোগ হচ্ছে, ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, একই দিন দুপুরে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছত্রীসেনা নামিয়ে ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিং করে হত্যার পরিকল্পনায় তিনি সহায়তা করেন।
পঞ্চম অভিযোগ হচ্ছে, ২৭ জুলাই বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন ইনু।
ষষ্ঠ অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সপ্তম অভিযোগ হচ্ছে, ৪ অগাস্ট বিকালে আন্দোলনকারীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া।
সর্বশেষ অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ অগাস্ট কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় ইনুর নির্দেশে আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিন (১৬), সুরুজ আলী বাবু (৪১), আশরাফুল ইসলাম (৩৭), বাবলু ফরাজী (৫৮), ইউসুফ শেখ (৫৬) ও উসামা (১৮) নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ দাখিলের দিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এবং জাসদের সুপ্রিম নেতা হিসেবে নিয়মিত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তিনি ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে স্থানীয় এসপি এবং দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিতেন। শেখ হাসিনাকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন সশস্ত্র ক্যাডারদের বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে নির্দেশনার বিষয়েও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপ বিশেষজ্ঞ মতামত এবং ট্রান্সক্রিপ্টসহ দাখিল করার কথা জানিয়ে কৌঁসুলি মিজানুল বলেছিলেন, কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ধরে মেরে ফেলার ইঙ্গিত দেওয়া হয় এবং প্রচারের কৌশল হিসেবে ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ খেলার কথা বলা হয়। ফোনালাপে ৫ অগাস্ট কারফিউ উঠিয়ে দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ২ হাজার লোক ঢাকায় জমায়েত করে শিবিরের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং বিএনপিকে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। এছাড়া জোনায়েদ সাকি ও সাইফুল হককে কীভাবে দলে টানা যায়, সে বিষয়েও দুজনের কথা হয়।
গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের শুনানির একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল ইনুর উদ্দেশে বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে; তিনি ‘গিল্টি প্লিড’ (দোষ স্বীকার) করলে কাজ শেষ হয়ে যাবে, নয়তো বিচার শুরু হবে।
জবাবে ইনু তার আবেদন আমলে না নেওয়ার অভিযোগ তুললে ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, তার আবেদনটি খারিজ করা হয়েছে।
এরপর ইনু কথা বলার অনুমতি চাইলে প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীর মাধ্যমে কথা বলার নিয়ম মনে করিয়ে দেয়।
তার পরও ইনু নিজেকে ‘রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার’ দাবি করে বলেছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টা গায়েবি মামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তার বিরুদ্ধে সিএমএম কোর্টে ৬০টি মামলা চলমান এবং ট্রাইব্যুনালেও গায়েবি অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, “আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি মনে করি আল্লাহর পর বিচার নিষ্পত্তির প্রতিনিধি আপনি। আপনি ন্যায়বিচার করবেন।”
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর কৌঁসুলি আব্দুস সোবহান তরফদারের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষী হিসেবে মেহেরপুরের বাসিন্দা রাইসুল হকের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যপর্ব শুরু হয়।
দীর্ঘ এই বিচারে প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৩ জন, বিশেষজ্ঞ ২ জন, ভুক্তভোগী পরিবারের ১ জন, জব্দ তালিকার ২ জন, জেলার ১ জন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষীও দেন। মামলায় ২০ সিরিজের ডকুমেন্ট এবং ৫টি বস্তু উপস্থাপন করা হয়।
বিচার চলাকালে গত ১১ মার্চ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য দেন ইনু। সেখানে তিনি সব অভিযোগকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও বানোয়াট দাবি করেন।
গত ২ এপ্রিল ইনুর পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন থেকেই আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে, যা চলে টানা নয় দিন। এরপর ৬ মে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে ইনুর খালাস দাবি করেন।
এরপর ১৪ মে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে।
ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, আসামিপক্ষ এই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের বদলে ‘সংঘাত’ ও ‘অস্থিরতা’ বলে আদালত অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছে।
উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল-২ সেদিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে এবং সবশেষ ২২ জুন রায়ের জন্য মঙ্গলবার দিন ঠিক করে দেয়।
২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসা থেকে হাসানুল হক ইনুকে আটক করা হয়। শুরুতে নিউ মার্কেট থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্যে গত বছরের ২১ অগাস্ট কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, বর্তমানে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার দেখানো মামলার সংখ্যা ৮৭টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।
১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নির্বাচনি রাজনীতিতে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে পরাজিত হলেও, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।