০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

গোলাম মুরশিদের ধারাবাহিক রচনা: শ্যামাসংগীত

গোলাম মুরশিদ

Published : 24 Jul 2020, 10:47 AM

Updated : 23 Jun 2022, 03:59 PM

আর্যরা আসার আগে এ দেশের সমাজ ছিলো খুব সম্ভব মাতৃতান্ত্রিক। এখনো এ সমাজে প্রচলিত পুজোগুলোয় দেবীদের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। এমন কি, বাঙালিদের জীবনে পিতার তুলনায় মায়ের প্রতি বেশি ভালোবাসা ও নির্ভরতা দেখা যায়। হয়তো এ জন্যেই দেবীপূজার প্রতি এ অঞ্চলের লোকেদের একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। দেশকে আমাদের সংস্কৃতিতে পিতৃভূমি না-বলে মাতৃভূমি বলা হয়। তাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জনপ্রিয় স্লোগান ছিলো 'বন্দে মাতরম্'।
রবীন্দ্রনাথও দেশকে সর্বত্র মা বলে সম্বোধন করেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বাঙালিরা, বিশেষ করে হিন্দু 'ভদ্রলোক' শ্রেণী, দেশ-বিভাগের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছিলো। তখন রবীন্দ্রনাথ বাউল সুরে বিশটি দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছিলেন। 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটাও ছিলো তার মধ্যে। আর-একটি ছিলো 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি / তুমি কোন অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।' মূর্তিপূজায় রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং ঘোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু এ গানটি রচনাকালে বাংলাদেশকে তিনি দেবী দুর্গারূপে কল্পনা করেছিলেন। দুর্গা, চণ্ডী, কালী ও উমা একই দেবীর বিভিন্ন রূপ। বস্তুত, বাঙালিদের কাছে মা এমন একটি প্রিয় এবং শক্তিশালী ধারণা, যা শাক্তধর্মকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিলো। শক্তির ধারণা যেভাবে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বিত হয়েছে, তাও দেবী কালীর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে।

কীর্তন এবং বাউল গান অনেক প্রাচীন। কিন্তু মাতৃপূজা তার থেকেও পুরোনো, বিশেষ করে দুর্গাপূজা। তবে কালীপূজার প্রচলন হয় দুর্গাপূজার প্রায় পাঁচ শতাব্দী পরে – আঠারো শতকে। দেবী কালীর গায়ের বর্ণ অনুসারে তাঁর আর-এক নাম শ্যামা। সে জন্যেই কালীর আরাধনা করে রচিত গানগুলোকে বলে শ্যামাসংগীত— কালীসংগীত নয়।
শ্যামাসংগীত ঠিক কখন প্রথম রচিত হলো, তা সঠিক জানা যায় না। তবে শ্যামাসংগীতের প্রথম শ্রেষ্ঠ রচয়িতা ও গায়ক হিসেবে যিনি পরিচিত হন, তাঁর নাম রামপ্রসাদ সেন। তিনি জ্ন্মগ্রহণ করেন ১৭২০ সালের দিকে, কলকাতা থেকে মাইল পঁচিশেক উত্তরে – হালিশহর গ্রামে। আর তিনি মারা যান ১৭৮০ সালের দিকে (কারও কারও মতে তার কয়েক বছর আগে)। তার অর্থ রামপ্রসাদ তাঁর শ্যামাসংগীতগুলো রচনা করেছিলেন আঠারো শতকের মধ্য ভাগে।


সংস্কৃত ও ফারসী-সহ বেশ কয়েকটি ভাষা শিখেছিলেন তিনি। তবে কারও কাছে সংগীত শিখেছিলেন বলে জানা যায় না। তিনি তিনটি কাব্য রচনা করেন : বিদ্যাসুন্দর, কালীকীর্তন এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। কিন্তু তিনি খ্যাতি লাভ করেন তাঁর রচিত শ্যামাসংগীতের জন্যে। তাঁর রচিত এই গানগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। বিশেষ করে বাউল ও কীর্তন সুরের সঙ্গে হাল্কাভাবে রাগরাগিণী মেশানো তাঁর একটা সুর এতো জনপ্রিয় হয় যে, এই সুরের নামই হয়ে যায় রামপ্রসাদী।
এই সুরটি লোকগীতির মতো সরল অথচ আকর্ষণীয়। তাই রামপ্রসাদের মৃত্যুর পরে অনেক সংগীতজ্ঞই এই সুরে গান রচনা করেছিলেন। এঁদের মধ্যে তাঁর ঠিক পরের শ্যামাসংগীত রচয়িতা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যও ছিলেন। এমন কি, এক শতাব্দীরও পরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন এবং অতুলপ্রসাদ সেনও এই সুরে গান রচনা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের 'আমরা মিলেছি সব মায়ের ডাকে' গানটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই গানটি রামপ্রসাদী সুরে রচিত। আজও এর সরল সহজ সুরের জন্যে গানটি শ্রোতাদের চিত্তকে নাড়া দেয়।
শ্যামাসংগীতে দেবীকে চারটি রূপে কল্পনা করা হয়। তিনি কন্যারূপে অর্থাৎ দুর্গার বেশে তিন দিনের জন্যে পিতৃগৃহে আগমন করেন। তাঁর এই আগমন উপলক্ষে রচিত গানগুলোকে বলে আগমনী গান। আর দেবী পিতৃগৃহ থেকে বিদায় নেওয়া উপলক্ষে রচিত গানগুলোকে বলে বিজয়া সংগীত। তা ছাড়া, গান রচয়িতারা তাঁদের গানে শ্যামাকে কখনো কন্যারূপে কল্পনা করেন আর নিজেদের কল্পনা করেন পিতারূপে। আবার রচয়িতারা কখনো তাঁকে কল্পনা করেন মাতারূপে। শ্যামাসংগীতের বেশির ভাগেই শ্যামাকে মাতারূপে অঙ্কন করা হয়। তা ছাড়া, তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁকে অন্যান্য রূপেও কল্পনা করা হয়। যেমন, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা, ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী, কালকালী, চণ্ডিকাকালী ইত্যাদি। প্রত্যেক রূপে কল্পনা করেই তাঁকে নিয়ে সংগীত রচনা করেছেন নানাজন।

শাক্তদের সঙ্গে বৈষ্ণবদের ধর্মীয় বিরোধ দীর্ঘ কালের। তাই বৈষ্ণবধর্ম এবং কীর্তন গান যখন ষোলো থেকে আঠারো শতকের মধ্যে বঙ্গদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শাক্তরাও তাদের আরাধ্য দেবীকে নিয়ে পদাবলী রচনার দারুণ তাগিদ অনুভব করে। তা ছাড়া, আঠারো শতকে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় আড়ম্বরের সঙ্গে কালীপূজা প্রবর্তন করেন। এই দুই ঐতিহাসিক প্রয়োজনের মুহূর্তে দুই প্রতিভাবান শাক্তগীতিকারের আবির্ভাব ঘটে – একজন রামপ্রসাদ সেন, অন্যজন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। সুনাম শুনে রামপ্রসাদ সেনকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর দরবারে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে কবিরঞ্জন উপাধি দেন।

এই দুই সংগীতকারের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, দুজনেই শাস্ত্রীয় সংগীতে পারদর্শী ছিলেন। 'কালী কালী বল রসনা'র মতো গান থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে রামপ্রসাদ সেনের পারদর্শিতা বোঝা যায়। তবে শাস্ত্রীয় সংগীতে কমলাকান্তের দখল ছিলো অসাধারণ। রামপ্রসাদ সেনের কণ্ঠ ছিলো মধুর। তাঁর গানের ভাষাও ছিলো সহজ সরল – মুখের ভাষার মতো। এই দু্ইয়ের আকর্ষণে তাঁর গানগুলি আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে শাক্ত উপাসকগণের চিত্ত হরণ করেছিলো। তা ছাড়া, তাঁর গানের মধ্যে অঙ্কিত চিত্রকল্পগুলিও সাধারণত প্রাত্যহিক জীবন থেকে নেওয়া। উদাহরণ হিসেবে তাঁর একটি বিখ্যাত গানের কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করতে পারি:
মন রে কৃষি কাজ জান না।
এমন মানব জমিন রইলো পতিত,
আবাদ করলে ফলতো সোনা।
কালীনামে দেওরে বেড়া, ফসলের তছরূপ হবে না।
সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁষে না।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এই গানে রামপ্রসাদ কোনো পুস্তকী শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং সব শব্দই রোজকার জীবনে ব্যবহৃত শব্দ। তা ছাড়া, কালীর প্রতি নিবেদিত রচনা হলেও, তিনি আবাদ, ফসল ও তছরূপের মতো কয়েকটা আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সর্বোপরি, এ গানে রামপ্রসাদ যে-চিত্র অঙ্কন করেছেন, তা গ্রাম-বাংলার প্রাত্যহিক জীবনের সুপরিচিত ছবি। কাজেই দেবীর আরাধনা ছাড়াও এ গানের আবেদনের পেছনে আছে এর কথা, সুর এবং রূপকল্প।
রামপ্রসাদ নাকি মাসে তিরিশ টাকা বেতনে কলকাতায় খাতা লেখার কাজ পেয়েছিলেন এক ব্যবসায়ীর দপ্তরে। কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে, হিসাবের খাতায় তিনি অনেক সময় তাঁর রচিত গান লিখে রাখতেন। তাঁর মালিক যখন এ কথা জানতে পারলেন, তখন তাঁকে কাজ থেকে সরিয়ে দিলেন। তারপর তাঁকে কিছু বৃত্তি দিয়ে তাঁর গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। তবে, আগেই বলেছি, তিনি ডাক পেয়েছিলেন কৃষ্ণনগরের রাজার দরবার থেকে। অপর পক্ষে, কমলাকান্ত তাঁর খ্যাতির দরুন ডাক পেয়েছিলেন বর্ধমানরাজের কাছ থেকে। অতঃপর আমৃত্যু তিনি রাজার পুরোহিত ও গুরুর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।


রামপ্রসাদের পর তাঁর গানের ধারাকে কেবল বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং আরও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জন্ম বর্ধমানের একটি গ্রামে, কারও কারও মতে ১৭৭২ সালে। রামপ্রসাদ এবং কমলাকান্ত দুজনই তাঁদের জীবদ্দশায় কিংবদন্তীতে পরিণত হন। ফলে তঁদের সম্পর্কে অনেক অতিরঞ্চিত গল্প প্রচলিত আছে। তার মধ্য থেকে তাঁদের সত্যিকার জীবনী পুনর্গঠন করা কঠিন। তবে কমলাকান্ত বাল্যকালে টোলে লেখাপড়া করেন এবং শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষা করেন। গ্রামের মধ্যে উচ্চমানের সংগীত শেখার জন্যে ওস্তাদ কোথায় পেলেন, তা জানা যায় না। অসম্ভব নয় যে, যৌবনে বর্ধমানরাজের আহ্বান পাওয়া পর তিনি রাজার দরবারের সংগীত-শিল্পীদের কাছে সংগীত শিক্ষার সুযোগ লাভ করেন।

রামপ্রসাদের গানের সঙ্গে কমলাকান্তের গানের তুলনা করলে দেখা যাবে যে, রামপ্রসাদের গানগুলোর বাণী আকর্ষণীয় হলেও তা উঁচুমানের কাব্য হয়ে ওঠেনি। সুরের সঙ্গে মিলিত হলে তবেই তাঁর গান সত্যিকার উৎকর্ষ লাভ করে। অপর পক্ষে, কমলাকান্তের গানের বাণী তার কাব্যমূল্যের জন্যেই পাঠযোগ্য। তা ছাড়া, তিনি রামপ্রসাদী সুরের ধারাকে বজায় রাখলেও, তাঁর গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যবহার অনেক বেশি লক্ষ করা যায়। 'যতনে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে', 'শ্যামা মা কি আমার কালো রে', 'মজিল মোর মনভ্রমরা শ্যামাপদ নীলকমলে' ইত্যাদি গানকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ধৃত করা যায়। বিশেষ করে এই দুজনের অবদানেই শ্যামাসংগীত বাংলা গানের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ধারার গান হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
তবে তাঁদের মৃত্যুর পর অনেকেই শ্যামাসংগীতের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন রামচন্দ্র দত্ত, নীলকান্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। গিরিশচন্দ্র ঘোষকে লোকেরা সাধারণত নাট্যকার হিসেবেই জানে। কিন্তু তিনি তেরো শ গানও রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিলো শ্যামাসংগীত।

উনিশ শতকের সঙ্গে সঙ্গে এ গানের প্রবাহ লোপ পায়নি। বরং আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ইসলামের অবদানে। রবীন্দ্রনাথ মাত্র দু-তিনটি শ্যামাসংগীত রচনা করেছিলেন, সুতরাং তাঁকে সতিকার অর্থে শ্যামাসংগীত রচয়িতা বলে আখ্যায়িত করা যায় না। তাঁর সাংগীতিক জীবনে শ্যামাসংগীত ছিলো ব্যতিক্রমধর্মী কাজ।


অপর পক্ষে, নজরুল ইসলাম ১৯৩৩/৩৪ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ/ছ বছর নিজের অন্তরের তাগিদে শতাধিক শ্যামাসংগীত রচনা করেছিলেন। কাব্যিক সৌন্দর্য, সাংগীতিক ঐশ্বর্য এবং আন্তরিক আবেদনে এই গানগুলো হলো বাংলা ভাষায় রচিত সর্বোত্তম শ্যামাসংগীত। কবি তাঁর আরবি নামটি কেবল গানের ভনিতায় লেখেননি। তাঁর গানগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের একটি পরোক্ষ প্রমাণ দিচ্ছি। রেকর্ড কম্পেনি এইচএমভি সহাস্রাব্দ পূর্তি উপলক্ষে পঞ্চাশটি শ্রেষ্ঠ শ্যামাসংগীতের একটি সংকলন প্রকাশ করে। তার মধ্যে তেরোটি গানের রচয়িতাই নজরুল ইসলাম। 'শ্মশানে জাগিছে শ্যামা', 'চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় মা', 'বল রে জবা মোরে বল', 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন', 'শ্যামা নামের লাগলো আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে' ইত্যদি গান তাঁর শ্যামাসংগীতের মধ্যে কয়েকটি।

অন্য যাঁরা শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন, তাঁদের তুলনায় তাঁর শ্যামাসংগীত তর্কাতীতভাবে শ্রেষ্ঠতর। কারণ তিনি কেবল শ্যামাসংগীত-রচয়িতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ কবি এবং গীতিকার। তিনি বাংলা ভাষায় সর্বাধিক সংখ্যক (তিন হাজারেরও বেশি) গান লিখেছিলেন। এসব গানের মান সর্বত্র সমান নয়। অনেক গান আছে যেগুলো ফরমায়েশী রচনা এবং যেগুলোর মান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু শ্যামাসংগীতে তাঁর আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। এগুলো তিনি লিখেছিলেন তাঁর জীবনের এমন একটা সময়ে যখন তিনি শ্যামাভক্তে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি এই পর্যায়ে দেবী কালীর আরাধনা এবং যোগ সাধনা করতেন। তাঁর শ্যামাসংগীতের উৎকর্ষ বোঝানোর জন্যে নীচে আমরা তাঁর সুপরিচিত একটি শ্যামাসংগীত উদ্ধৃত করছি।
শ্যামা নামের লাগলো আগুন আমার দেহ-ধূপকাঠিতে
যত জ্বলি সুবাস তত ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে।
ভক্তি আমার ধূপের মতো
ঊর্ধ্বে ওঠে অবিরত,
শিবলোকের দেব-দেউলে মা'র শ্রীচরণ পরশিতে।
ওগো অন্তর-লোক শুদ্ধ হল পবিত্র সেই ধূপ-সুবাসে
মা'র হাসিমুখ চিত্তে ভাসে চন্দ্রসম নীল আকাশে।
সব কিছু মোর পুড়ে কবে
চিরতরে ভস্ম হবে,
মা'র ললাটে আঁকব তিল সেই ভস্ম-বিভূতিতে।

নজরুল ইসলামের বহু গানের মতো এ গানটিও স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। পার্থক্য এই যে, পুরো গানটিতে মাত্রা, পর্ব অথবা অন্ত্যমিলে কোথাও জোড়াতালি নেই। এ গানের কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে একটি যৌক্তিক ধারাবাহিকতার ওপর। সূচনা ধূপকাঠিতে। মাঝখানে জ্বলন্ত ধূপশিখা। তারপর ধূপের সুবাস। আর পরিণামে ধূপভস্ম। এর এক-একটি উপমা এক-একটি অলংকারের মতো। ধূপকাঠির মতো দেহ, ধূপের মতো ভক্তি, ধূপ-সুবাসের মতো অন্তর, ধূপভস্মের মতো পরিণতি। সেই ভস্ম-বিভূতি দিয়ে দেবীর ললাটে তিলক অঙ্কনের বাসনা। এটি একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। এবং এই উৎকৃষ্ট কবিতার সঙ্গে যখন রাগিণীর মূর্ছনা যুক্ত হয়, তখন তা স্বর্গীয় সংগীতের রূপ নেয়। এ গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী অজয় চক্রবর্তী। অজয় চ্ক্রবর্তী শুধু এই গানটিরই শ্রেষ্ঠ শিল্পী নন, তিনি বহু শ্যামাসংগীতকে গীতসুধায় পরিণত করেছেন।

শ্যামাসংগীতের শিল্পী হিসেবে যাঁরা বিশ-একুশ শতকে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাঁদের মধ্যে অজয় চক্রবর্তী ছাড়া রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, পান্নালাল ভট্টাচার্য ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ শতকের শুরুতে যখন গানের রেকর্ড প্রকাশ বর্তমান সময়ের মতো ডাল-ভাতে পরিণত হয়নি, তখন শ্যামাসংগীতের প্রচুর রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য ধরনের গানের অনুপাতে বেশিই প্রকাশিত হয়েছে। তা থেকে গত এক শতাব্দীতে শ্যামাসংগীতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাই প্রমাণিত হয়।