২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্যক্তিগত যৌন অভিমুখিতা ও সামাজিক উগ্রতা: আমাদের মোরাল পুলিশিং থামবে কবে?

সমকামিতা কোনো রোগ, বিকৃতি বা পছন্দ নয়; বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে সমকামিতা মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণীর মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ভিন্নতা। বিজ্ঞান বিশ্বজুড়ে এটি স্বীকার করেছে যে মানুষের আকর্ষণ যেমন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি হতে পারে, তেমনই একই লিঙ্গের প্রতিও হওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

ব্যক্তিগত যৌন অভিমুখিতা ও সামাজিক উগ্রতা: আমাদের মোরাল পুলিশিং থামবে কবে?
Portrait Of Shah Abbas I Embracing One Of His Pages, Safavid Dynasty, Persian, 1627

শাকিলা জেরিন শাকিলা জেরিন

Published : 15 Aug 2026, 01:07 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

সংবাদ মাধ্যমের একটি শিরোনামে চোখ আটকে গেল, ‘সমকামিতার’ অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষার্থীর হলের সিট বাতিল। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তথাকথিত সামাজিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সিট স্থায়ীভাবে বাতিল করেছে হল কর্তৃপক্ষ। এর কিছুদিন আগেও মাস্টারদা সূর্য সেন হলে একই অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং হলের সিট বাতিল করা হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে অতিথিদের কেন্দ্র করে ওঠা একই ধরনের অভিযোগে সিট বাতিলের ঘটনা আমরা দেখেছি।

কিন্তু এটাই শুরু বা শেষ নয়। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সমকামিতা বা ভিন্ন যৌন অভিমুখিতাকে কেন্দ্র করে যেভাবে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও হিংস্রতা ছড়ানো হচ্ছে, তা রীতিমত আশঙ্কাজনক। কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি কিছু নামধারী মোজো সাংবাদিক ও উগ্র জনতা শাহবাগে সাধারণ মানুষকে 'সমকামি' আখ্যা দিয়ে, জোরপূর্বক ভিডিও করেছে, প্রকাশ্যে করেছে হেনস্তা, করেছে মারধর। আরও একটু পেছনে ফিরলে মনে পড়ে ২০১৬ সালের কথা- সমকামি অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়ের কথা যাকে নিজের ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, শুধু ভিন্ন জেন্ডার পরিচয়ের মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করায়। এমনকি ২০২৪ সালে সপ্তম শ্রেণির সরকারি পাঠ্যপুস্তকে যখন তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির অংশ হিসেবে ‘শরিফার গল্প’ অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা নিয়েও একদল মানুষ অন্ধ বিদ্বেষ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মানুষের বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার ন্যূনতম মানসিকতাও এই সমাজে নেই। বরং বৈচিত্র্যকেই অপরাধ বলে গণ্য করা হচ্ছে।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা খুব জরুরি, তা হলো ‘সেক্স’ বা লিঙ্গ এবং ‘জেন্ডার’-এর পার্থক্য। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (National Institutes of Health)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘Sex is a multidimensional construct based on a cluster of anatomical and physiological traits that include external genitalia, secondary sex characteristics, gonads, chromosomes, and hormones.’

এবং জেন্ডার আইডেন্টিটি হলো- ‘Gender is a multidimensional construct that links gender identity, which is a core element of a person’s individual identity; gender expression, which is how a person signals their gender to others through their behavior and appearance (such as hair style and clothing); and cultural expectations about social status, characteristics, and behavior that are associated with sex traits.

সহজ কথায়, ‘সেক্স’ বা লিঙ্গ হলো মানুষের একটি জৈবিক বা শারীরিক পরিচয় যা প্রাকৃতিকভাবে জন্মসূত্রে পাওয়া বাহ্যিক যৌনাঙ্গ, গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য, প্রজনন গ্রন্থি, ক্রোমোজোম এবং হরমোনসহ একগুচ্ছ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। যা নারী পুরুষের বাহ্যিক গড়ন আলাদা করে।

অন্যদিকে, জেন্ডার হলো ব্যাক্তির মানসিক অবস্থান। শারীরিকভাবে কোন মানুষ নারী না পুরুষ তার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই বরং কেউ নিজেকে মানসিকভাবে কোন লিঙ্গের মনে করে সেটাই তার জেন্ডার। তাই জেন্ডার ব্যক্তির লিঙ্গের সাথে মিলতেও পারে ভিন্নও হতে পারে। যেমন কোন মানুষ পুরুষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও মানসিকভাবে নিজেকে নারী ভাবতে পারে, তেমনি নারীর ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটতে পারে। এবং জেন্ডার দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশাকেও তুলে ধরে।  

আর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- Sexual orientation is a multidimensional construct encompassing emotional, romantic, and sexual attraction, identity, and behavior.

অর্থাৎ সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন বা যৌন অভিমুখিতা একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যা আবেগীয়, রোমান্টিক ও যৌন আকর্ষণ, পরিচয় এবং আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করে। মানুষের যৌন পরিচিতি বা আকর্ষণ একেবারেই সহজাত ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যা জোর করে তৈরি বা পরিবর্তন করা যায় না। সাধারণত নারী পুরুষের প্রতি এবং পুরুষ নারীর প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করে যাকে বিপরীতকামিতা বা স্ট্রেইট বলা হয়। এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিকে বলা হয় হেটেরোসেক্সুয়াল এবং  আমাদের সমাজে এটিই প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য। তবে এটিই শেষ কথা নয়। সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন-এর ধারণা ব্যাপক ও বিস্তৃত।  যেমন বিপরীতকামিতার পরই তুলনামূলকভাবে পরিচিত টার্মগুলো হলো হোমোসেক্সুয়াল বা সমকামি। যখন কেউ সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন--পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘গে’  এবং নারীদের ক্ষেত্রে ‘লেসবিয়ান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। 

বাইসেক্সুয়াল বা উভকামি। কোনো ব্যক্তি যখন নিজ লিঙ্গ এবং বিপরীত লিঙ্গের অর্থাৎ পুরুষ ও নারী উভয়ের প্রতি সমান বা ভিন্ন মাত্রায় শারীরিক ও রোমান্টিক আকর্ষণ অনুভব করেন।

প্যানসেক্সুয়াল, এই ধারার মানুষ কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট জেন্ডার আইডেন্টিটি বা শারীরিক গঠন বিবেচনা না করেই তার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। তাঁদের কাছে মূল বিষয় হলো মানুষটির ব্যক্তিত্ব বা মন, লিঙ্গ সেখানে কোনো বাধা বা প্রভাব তৈরি করে না।

এছাড়া ‘কুইয়ের’ একটি বিস্তৃত ও আমব্রেলা টার্ম । যেসব ব্যক্তি নিজেদের প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর যেমন শুধু হেটেরো বা গে-এর মধ্যে বন্দি রাখতে চান না, তাঁরা নিজেদের 'কুইয়ের' হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রয়েছে অ্যাসেক্সুয়াল এর ধারণাও, যাকে বাংলায় ‘অকামুক’ বা ‘যৌনতাহীনতা’ বলা যায়। যেসব ব্যক্তি কারও প্রতিই খুব একটা বা একেবারেই শারীরিক বা যৌন আকর্ষণ বোধ করেন না। তবে এদের অনেকেই মানসিক বা রোমান্টিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন।

ডেমিসেক্সুয়াল, স্যাপিওসেক্সুয়াল, নোওসেক্সুয়াল, বাইরোমান্টিক, অ্যারোমান্টিক, অ্যালোরোমান্টিক-এর মতো আরো বহু টার্ম রয়েছে  সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন-এর। মনস্তত্ত্ব ও বিজ্ঞানের মতে, মানুষের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা বিষয় নয়; এটি একটি বিশাল স্পেকট্রাম যার ভেতরে মানুষের অনুভূতি ও আকর্ষণের নানা মাত্রা থাকতে পারে। সুতরাং জেন্ডার নিয়ে মন্তব্য করার আগে সিসজেন্ডার, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স, নন-বাইনারির মতো বিষয়গুলো জানা জরুরি। 

ফিরে আসা যাক সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে সিট বাতিল করেছে বা অনলাইনে, অফলাইনে যে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে তার ভিত্তি কী? বাংলাদেশে সমকামিতা বিষয়ক আইনই বা কী?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশের আইনে 'সমকামিতা'কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। বাংলাদেশের আইনে এখনও সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ব্রিটিশ আমলের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার অধীনে। যেখানে বলা হয়েছে- Unnatural offences 377-  Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with 2[imprisonment] for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine. Explanation. Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offence described in this section.

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী কিংবা পশুর সাথে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হবে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে, এবং একই সাথে তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হবে। এবং পেনিট্রেশন বা যৌনাঙ্গের প্রবেশই অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। 

এখানে সমকামিতার কোন উল্লেখ নেই, যদি  পেনিট্রেশন বা যৌনাঙ্গের প্রবেশই অপরাধ বলে বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে নারীদের কিসের ভিত্তিতে বিচার করবে? আর  ‘প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ’ বিষয়টিই বা কী? প্রাণী জগতে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সমকামিতার অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে ব্রিটিশ আইনে যে বলা হয়েছিল সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং ইসলামপন্থীরাও যে ওরকমই ভাবে তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। প্রাণিজগৎ জুড়ে সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন আচরণ, জোড়-বন্ধন এবং সন্তান লালন-পালনের মতো বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা প্রাইমেট ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে পাখি ও কীটপতঙ্গ—এমন দেড় হাজারেরও বেশি প্রজাতির মধ্যে এই আচরণগুলো শনাক্ত করেছেন। সুতরাং প্রকৃতি-বিরুদ্ধ বলে যে ফতোয়া দেয়া হয়ে তা কোনভাবেই গ্রাহ্য হতে পারে না। এবং বিভিন্ন জাতির সাহিত্য ও চিত্রকলায়ও এর উদাহরণ কম নয়। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের চিত্রকলার দিকে তাকালে দেখা যাবে সেই ইরানের সাফাভিদ যুগের চিত্রকর্ম কিংবা পশ্চিমের রেনেসাঁ-পূর্ব ও রেনেসাঁ-উত্তর বহু শিল্পকর্মে রয়েছে এর অসংখ্য নজির। কৌতূহলীরা ইচ্ছে করলেই এসব আজকাল নেটে অনুসন্ধান করলে সহজেই পেয়ে যাবেন। চিত্রকলা বা সাহিত্য মূলত একটি জাতির সামাজিক রীতিনীতি বা আচরণের দর্পন। যদি এর অস্তিত্বই না থাকতো তাহলে চিত্রকলা বা সাহিত্যে এর জায়গা হতো না।  তাছাড়া,  একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন অভিমুখিতা যা ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় তা কি অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে? 

কত বড় নির্মম সামাজিক প্রহসন দেখুন! ১৮৬০ সালের যে ব্রিটিশ আইন আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে, সেই যুক্তরাজ্যে কিন্তু সমকামিতা বহু আগেই আইনি বৈধতা পেয়েছে। শুধু যুক্তরাজ্য নয়, পুরো ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বহু দেশে আজ সমকামি বিবাহ ও সম্পর্ক পূর্ণ আইনি সুরক্ষাপ্রাপ্ত। প্রতিবেশি দেশ ভারত ও নেপালেও সমকামি সম্পর্ক অইনগতভাবে বৈধ, এমনকি নেপালে সমকামি বিবাহকেও বৈধতা দেয়া হয়েছে। অথচ আজও সেই ১৫০ বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক মানসিকতার বাহক হয়ে আমাদের দেশে সমকামিদের অপরাধীর চোখে দেখা হচ্ছে। 

এখানে কিছু প্রশ্ন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ওঠে: প্রাপ্তবয়স্ক দুটি মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়ে সমাজের এই উদগ্র অনধিকার চর্চা কেন? এই হিংস্রতার উৎস কোথায়? বাংলাদেশে কি আর কোনো সমস্যা নেই? দেশে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, চরম জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং, নিরাপত্তাহীনতা, অবসবাসযোগ্যতা ও দূষণ, চারদিকে যখন শত শত মৌলিক সংকটে মানুষ জর্জরিত, তখন হঠাৎ দুটো মানুষের বেডরুমে কে কার সঙ্গে রইল, তা নিয়ে সমাজের এত মাথাব্যথা কেন?

আরও বড় প্রশ্ন ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তথাকথিত ছাত্রনেতারা শিক্ষার্থীদের সিট বাতিল করা, মোরাল পুলিশিং করা আর মানুষকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে ভীষণ তৎপর! অথচ আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকেছে, সেদিকে কারোর খেয়াল নেই। হলগুলোতে ছারপোকা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, মানবেতর আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গবেষণাপত্র চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। গবেষণার মান উন্নয়নে বা মৌলিক শিক্ষার উন্নয়নে কোনো কাজ দেখা যায় না। কিন্তু কারো ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা যৌন পরিচয় খুঁজে বের করে তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার কাজে তারা সদা প্রস্তুত!

অথচ আমাদের নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকে তাকালে কী দেখি? বাংলার লোকসংস্কৃতিতেই 'ঘেটুপুত্র' প্রথার অস্তিত্ব ছিল। ঘেটু গানে তরুণ বা কিশোর ছেলেদের নারী সাজিয়ে নাচগানের প্রচলন ছিল। ঘেটুপুত্রদের কাজ কেবল নাচগানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সমকামি বিত্তবানরা বিশেষ করে জমিদার, জোতদাররা  এইসব ঘেটুপুত্রদের যৌনসঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করতো। বিত্তবানদের স্ত্রীরা ঘেটুপুত্রদের সতীন হিসেবে দেখতেন বলেও প্রচলিত ছিল। তৎকালীন সমাজ এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিল। ইতিহাস বলে, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় এই জনপদে ভিন্ন যৌন পরিচিতি কখনো এভাবে ঘৃণা বা হত্যার কারণ হয়ে ওঠেনি। আজ আধুনিক যুগে এসে আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি।

সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি আর বৈপরীত্য দেখা যায় ইসলামপন্থার নামে উগ্র অংশের আচার-আচরণে। সমকামিতার প্রশ্নে তারা সবচেয়ে বেশি উগ্র, তারা সমকামীদের হত্যা করার ফতোয়া পর্যন্ত দেয়, সমাজকে তাদের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। অথচ প্রায় প্রতিটা দিনই সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলে দেখা যায় বিভিন্ন মাদ্রাসায় শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থী তাঁদেরই নিজেদের হুজুরদের দ্বারা ধর্ষণ বা বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। এই সব ভয়াবহ শিশু নির্যাতন ও ছাত্র ধর্ষণের ঘটনায় কিন্তু এই ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে কখনো রাস্তায় নেমে তৌহিদী জনতা হয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না! কোনো শিক্ষার্থী যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়, কিন্তু দুটো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি পারস্পরিক সম্মতিতে কোনো সম্পর্কে জড়ায় তখন তাদের ওপর সমস্ত 'ইসলামি অনুশাসন' ও ঘৃণা এসে পড়ে! এই ভণ্ডামির শেষ কোথায়?

আবার অনেকেই সমকামিতা ও ভিন্ন যৌন অভিমুখিতাকে মানসিক রোগ বা বিকৃতি বলে অখ্যা দেয়। সমকামিতা কোনো রোগ, বিকৃতি বা পছন্দ নয়; বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে সমকামিতা মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণীর মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ভিন্নতা। বিজ্ঞান বিশ্বজুড়ে এটি স্বীকার করেছে যে মানুষের আকর্ষণ যেমন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি হতে পারে, তেমনই একই লিঙ্গের প্রতিও হওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালেই সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা ভালোবাসা বা সম্পর্কে অন্য কারো হস্তক্ষেপ করার বা নীতি পুলিশিং করার কোনো অধিকার নেই। মানবাধিকারের মৌলিক শর্তই হলো মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, গোপনীয়তা এবং নিজের শরীর ও মন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করা। ঘৃণা ও বিদ্বেষের দেয়াল ভেঙে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত ভালোবাসা কোনো অপরাধ হতে পারে না, তা সে যেকোনো লিঙ্গ বা যৌন পরিচয়ের মানুষের মধ্যেই হোক না কেন।