১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তসলিমা নাসরিন: নিজেই নিজের কণ্ঠ রোধ করলেন

একজন লেখক যদি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাহলে কি সেই অবস্থান সব ধরনের মৌলবাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না? আমার মনে হয়েছে, ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে গিয়ে তিনি হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের ক্ষেত্রে একই স্পষ্টতা দেখান নি। বরং এমন এক রাজনৈতিক শক্তির নীরব সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন, যারা নিজেরাও ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে।

তসলিমা নাসরিন: নিজেই নিজের কণ্ঠ রোধ করলেন
ছবি: তসলিমা নাসরিনের ফেইসবুক পেজ থেকে নেওয়া

অনামিকা বসুধা অনামিকা বসুধা

Published : 03 Aug 2026, 01:44 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

আজকের পশ্চিম বাংলায় সবচেয়ে বড় ঘটনাটি হতে পারত তসলিমার বাংলায় ফেরা। তসলিমা বাংলায় এলেন- কিন্ত ঘটনাটি বড় হয়েও হলো না। অকিঞ্চিত হয়ে গেল। কবি জয় গোস্বামী সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন বলেই আমার জানা। আর তিনি আমন্ত্রিত না হলেও যেতে পারতেন। একজন সমসাময়িক বিশিষ্ট কবি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তসলিমা তাঁকে মঞ্চ থেকে মঞ্চে উপস্থিত হওয়ার ডাক দিলেন। আর সেখানে দর্শকদের একাংশের আপত্তির মুখে জয় গোস্বামীকে মঞ্চ থেকে নেমে আসতে হল! 

এ ঘটনার সব থেকে বড় সমাপতন হল— সে অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এমন একজন লেখক, যাঁর সমগ্র জীবনটিই বাকস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে থেকেছে, সেই তাঁরই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে আর-একজন প্রথিতযশা কবিকে কথা বলতে দেওয়া হল না।

এইসব অসামান্য গণতান্ত্রিক পটচিত্র থেকে আমরা আর রেহাই পাচ্ছি না। 

আপনি জয় গোস্বামীর রাজনীতির ও তাঁর কোনো রাজনৈতিক দল সমর্থনের বিরোধিতা করতেই পারেন। তাঁর কবিতাও অপছন্দ করতে পারেন। তাঁর অবস্থানের সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হবে? বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে? ? 

এটাই কি গণতন্ত্র হতে পারে? 

এই ঘটনাটি আর শুধু একজন কবিকে কথা বলতে না দেওয়ার ঘটনা হয়ে থাকে না।  এটি হয়ে ওঠে একটি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ।

ফ্যাসিবাদ সব সময় রাষ্ট্রের হাতের ব‍্যাটন দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময়ই তা শুরু হয় জনতার মধ্যে থেকে। যখন একদল মানুষ ঠিক করে দেয়—কে কথা বলবে, কে বলবে না; যখন যুক্তির বদলে হইচই, ভয় দেখানো, সংগঠিত চাপে একজন মানুষের কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া হয়—তখন সেটি গণতন্ত্র নয়। সেটি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকাশ।

 ফ‍্যাসিবাদকে চিনতেই আজকাল দেখছি মানুষের ভুল হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এতো সামান্য ঘটনায় ফ‍্যাসিবাদ কায়েম হয় না। সবকিছু মানতে মানতে- চাকরী- ব্যবসা- পুরস্কার বজায় রাখতে রাখতে ফ‍্যাসিবাদ ড্রয়িং কক্ষে নরমালাইজড হয়ে গেছে। বাংলাবাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে। 

ছবি: সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাগৃহে ও তার বাইরে কবি জয় গোস্বামী

তবে আজকের ঘটনায় সবচেয়ে অবাক হয়েছি যে কারণে—- 

কলকাতার মতো একটি শহরে, একটি গর্বের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাগৃহে, এত কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অথচ কার্যত সবাই এই সংগঠিত কণ্ঠরোধের সামনে মাথা নত করলেন। কেউ দাঁড়িয়ে বললেন না—

“আমি জয় গোস্বামীর সঙ্গে একমত নাও হতে পারি। কিন্তু তাঁকে বলতে দিতে হবে।”

একটি সমাজকে চেনা যায় সে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। আজকের ঘটনায় আমি একটি জাতির গভীর অসহিষ্ণু একটি অংশকে দেখতে পেলাম যাদের কাছে রাজনৈতিক মতভেদ আর যুক্তির বিষয় নয়, কেবলমাত্র ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বিষয়। 

আর এখানেই আমি তসলিমা নাসরিনের নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছি। এইটাই আমার বক্তব্যের মূল বিষয়— 

তসলিমা সারা জীবন ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন। সেই সাহসের জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়েছে। নির্বাসন, ফতোয়া, বই নিষিদ্ধ হওয়া—সবই ইতিহাসের অংশ। সেই সময় আমরা তাঁর বাকস্বাধীনতার পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলাম। আমি নিজে ২০০৭ সালে মহাশ্বেতা দেবীর হাত ধরে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে মিছিলে হেঁটেছি। সেই ইতিহাস আমি এখানে টানতে চাই না।

কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়।

একজন লেখক যদি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাহলে কি সেই অবস্থান সব ধরনের মৌলবাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না?

আমার মনে হয়েছে, ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে গিয়ে তিনি হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের ক্ষেত্রে একই স্পষ্টতা দেখান নি। বরং এমন এক রাজনৈতিক শক্তির নীরব সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন, যারা নিজেরাও ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে।

একজন লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল তিনি কোন মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখলেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তিনি কি সব ধরনের মৌলবাদের বিরুদ্ধে একই নৈতিক অবস্থান নিলেন, সেটাই আসল প্রশ্ন। যদি এক ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন হওয়া যায়, কিন্তু অন্য ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদ বা মৌলবাদের ক্ষেত্রে নীরব থাকা হয়, তাহলে সেই নৈতিক অবস্থান অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আমি লেখকের সাহিত্যিক মূল্য নয়, তাঁর নৈতিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তুলছি। কারণ মৌলবাদ ধর্ম বদলালেও তার চরিত্র বদলায় না। যে নীতি ইসলামী মৌলবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেই একই নীতি হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

আজকের ঘটনাটি সেই দ্বন্দ্বকেই সামনে এনে দিল। অনেকে বলছেন, “তসলিমা কিছু বলতে পারতেন না।”

আমি ঠিক এই কথাটাই প্রশ্ন করছি—কেন পারতেন না?

আমি তাঁর কাছ থেকে আশা করেছিলাম, তিনি অন্তত বলবেন—

“জয় গোস্বামীকে বলতে দিন।”

এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল।

প্রয়োজনে তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতেন। কারণ যাঁর নিজের কণ্ঠ একদিন রুদ্ধ করা হয়েছিল, তিনি নিশ্চয়ই আর-একজন লেখকের কণ্ঠরোধের সাক্ষী হয়ে নীরব থাকবেন না—এটাই তো আমাদের প্রত্যাশা ছিল।

মঞ্চে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায় ছিল। তাঁরা তাঁদের সমর্থকদের শান্ত করতে পারতেন। উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদেরও দায় ছিল। কারণ বাকস্বাধীনতা কোনো ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত বিশেষ অধিকার নয়।

আমি নিজের কথাই বলি। আমি তৃণমূলের সমর্থক না। আমি বিজেপির সমর্থক না। তাই বলে আজ যদি নরেন্দ্র মোদী বক্তব্য রাখতে আসেন, আমি কি তাঁর কণ্ঠরোধ করব?

না।

আজ যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রাখতে আসেন, আমি কি তাঁকে বলতে দেব না?

না।

অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা—যাঁদের আমি চরমভাবে অপছন্দ করি, যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে—তাঁদেরও নয়।

আমি তাঁদের বিচার চাইব।

প্রধানমন্ত্রী হোন, মুখ্যমন্ত্রী হোন, যে-ই হোন—আইনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দাবি তুলব। আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে তাঁদের শাস্তি চাইব। জনগণের কাছে তাঁদের রাজনৈতিক জবাবদিহিতা চাইব।

কিন্তু তাই বলে তাঁদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার আমি কে?

ফ্রান্সিস্কো গোইয়ার চিত্রকর্ম

গণতন্ত্রে অপরাধের বিচার হয় আইনের মাধ্যমে, রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে প্রতিবাদ, প্রশ্ন, যুক্তি, নির্বাচন, আদালত, জবাবদিহিতা। কাউকে বলতে না দেওয়া তার বিকল্প কোনোকালে হতে পারে নাকি?

আমি তাঁদের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করতে পারি। তাঁদের মিথ্যা ধরিয়ে দিতে পারি। তাঁদের রাজনীতিকে পরাজিত করতে চাইতে পারি। কিন্তু তাঁদের কণ্ঠরোধ করতে পারি না। 

ফরাসি আলোকায়নের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—যুক্তির জবাব যুক্তি, বইয়ের জবাব বই, বক্তৃতার জবাব বক্তৃতা। কণ্ঠরোধ নয়। তাঁরা বলতেন—যে সমাজ বই পোড়াতে শুরু করে, সে একদিন মানুষকেও পোড়াবে।

জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর On Liberty গ্রন্থে লিখেছিলেন, আমরা যে মতকে ভুল বলে মনে করি, সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতাও রক্ষা করা জরুরি। কারণ যে মতকে আমরা ভুল ভাবছি, সেটিও হয়তো আংশিক সত্য বহন করছে; আর যদি তা সম্পূর্ণ ভুলও হয়, তাহলেও সেই ভুলের সঙ্গে সংঘর্ষেই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই গণতন্ত্রে যুক্তির জবাব কখনও কণ্ঠরোধ হতে পারে না।

মিশরের নারীবাদী লেখিকা নাওয়াল এল সাদাভি, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আজীবন লড়েছেন, তিনিও বারবার বলেছেন—ক্ষমতা শুধু লেখককে ভয় পায় না; ভয় পায় সেই সমাজকে, যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে। তাই ইতিহাসে প্রথমে বই নিষিদ্ধ হয়, তারপর লেখক নির্বাসিত হন, তারপর সমাজকে শেখানো হয়—কার কথা শোনা যাবে, আর কার কথা শোনা যাবে না।

আমেরিকার ম্যাকার্থি যুগেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল। শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অধ্যাপক—অনেকেই জেলে যাননি, কিন্তু তাঁদেরকে জনজীবন থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল। কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের কথা শোনাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাস পরে সেই সময়কে গণতন্ত্রের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত করেছে।

বাকস্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষাটাই তাই তখন হয়, যখন আমরা আমাদের সবচেয়ে অপছন্দের মানুষেরও কথা বলার অধিকার রক্ষা করি।

তাই আজকের ঘটনায় আমার কাছে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি জয় গোস্বামীর “অপমান” নয়। আমি এটিকে অপমান মনেই করছি না। 

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এই যে, যাঁর জীবন বাকস্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যার বাকস্বাধীনতা ফেরাতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন— তাঁর উপস্থিতিতেই আর-একজন কবির বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল।

আর সেই তিনি নীরব রইলেন।

কখনও কখনও কণ্ঠরোধ বাইরে থেকে আসে। আবার কখনও মানুষ এমন এক রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানে পৌঁছে যায়, যেখানে তার নিজের কণ্ঠও আর সে স্বাধীন রাখতে পারে না।

আজকের ঘটনায় আমার মনে হয়েছে, জয় গোস্বামীর কণ্ঠরোধের পাশাপাশি আমরা আর-একটি নীরব কণ্ঠরোধও প্রত্যক্ষ করলাম। সেটি তসলিমা নাসরিনের নিজের কণ্ঠের। তিনি নিজেই আজ নিজের কণ্ঠরোধ করলেন। 

এবং সেখানেই আজকের ঘটনার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।