১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে লেখা হুয়ান রামোন হিমেনেসের চিঠি

তামাটে, জলপাই, শ্বেত, পীত ও কৃষ্ণ—পাঁচ প্রজাতির সংমিশ্রণে, বজ্রাস্ত্রের পঞ্চধাতব বলয়ের মতো, নিবিড় মানবস্তবকে ঘনীভূত, খর্বকায় ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা বারবার মুখ ফেরান ক্ষরস্রোতা বহমান প্রবাহ থেকে। আবার দিবাস্বপ্ন-নালী ছাড়তেও তিনি নারাজ।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে লেখা হুয়ান রামোন হিমেনেসের চিঠি
ছবি: ১৯২৪ সালের জুনের শেষ দিকে বাঁদিক থেকে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কা, সেনোবিয়া কাম্প্রুবি, ইসাবেল গার্সিয়া লোর্কা, এমিলিয়া ইয়ানোস, হুয়ান রামোন হিমেনেস এবং কন্চা গার্সিয়া লোর্কা

লায়লা ফারজানা লায়লা ফারজানা

Published : 20 Aug 2026, 11:22 AM

Updated : 16 Sep 2026, 12:58 PM

হুয়ান রামোন হিমেনেসের পরের প্রজন্মের কবি ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কা। লোর্কা কেবল পরের প্রজন্মেরই ছিলেন না, হিমেনেসের কোনো কোনো প্রবণতার তিনি ছিলেন উত্তরাধিকারীও; লোর্কার কবিতায় সবুজের যে-স্তুতি, ইন্দ্রিয় ঘন প্রতিমা—এসবের এক নিবিড় সংযোগ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু লোর্কা প্রতিভাবলে উত্তরাধিকারকে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন সফল কবির মতোই। হিমেনেস এই অনুজের প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ কাব্যময় গদ্যের স্বর্ণাভরণের উত্তরীয় পড়িয়ে। লোর্কার জীবদ্দশায় লেখা এই চিঠি সেই উত্তরীয়। এই চিঠি লেখার আট বছর পর, ১৮ আগস্ট ১৯৩৬ সালে লোর্কাকে ফ্রাঙ্কোপন্থীরা গ্রানাদায় হত্যা করেছিল। গার্সিয়া লোর্কার মৃত্যুদিবস স্মরণে স্প্যানিশ থেকে বাংলায় এই মূল্যবান চিঠিটি অনুবাদ করেছেন কবি ও অনুবাদক লায়লা ফারজানা। বি. স

তামাটে, জলপাই, শ্বেত, পীত ও কৃষ্ণ—পাঁচ প্রজাতির সংমিশ্রণে, বজ্রাস্ত্রের পঞ্চ ধাতুর বলয়ের মতো, নিবিড় মানব-স্তবকে ঘনীভূত, খর্বকায় ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা বারবার মুখ ফেরান ক্ষরস্রোতা বহমান প্রবাহ থেকে। আবার  দিবাস্বপ্ন-নালী ছাড়তেও তিনি নারাজ।

শেষ মেশ —উরু জোড়া করে, পায়ের নিচের অংশ বাইরের দিকে বাঁকিয়ে, অদ্ভুত এক টালমাটাল চালে—তিনি বিষাদগ্রস্তদের সেই দীর্ঘ সারির মধ্য দিয়ে ধীর পায়ে বিচরণ করেন আর দুধ-সাদা পাথরের ফোয়ারার জলে নিজের স্বরতন্ত্রী ছিঁড়ে ফেলেন। কিম্বা আচমকা এক দৌড়ে, উইন্ডশিল্ডে আছড়ে পড়া বড় নীলমাছির মতো অবরুদ্ধ গোধূলির গায়ে ধাক্কা খেয়ে; গ্রানাদায় নেমে আসা রাতের দৃশ্যকে—গাঢ় লাল রঙের জাদুকরী লণ্ঠনের গায়ে সমান্তরাল কালো ফিতার রেখায় আঁকেন।

(নিজের গোপন পাড়ার গলিপথগুলোর নীলচে দেয়ালজুড়ে তিনি কাঠকয়লার গুঁড়ো দিয়ে কেবলই এঁকে রেখে গেছেন: গোলাপ এবং বিতৃষ্ণা। দীর্ঘ বিকেলের আলোয় ঝলমলে ঝারবাতির সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে, তিনি নির্মল জলের তিন ডাইনিকে নিক্ষেপ করেছেন সুনির্দিষ্ট, অবজ্ঞাপূর্ণ গালি। ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়ির সেই অলক্ষুণে বার্তায় তিনি মগ্ন থেকেছেন এক গোপন, উলম্ব কথোপকথনে। অতঃপর, অন্য এক প্রাচীরে চড়ে বসে রজনীগন্ধা ছুড়ে দিয়েছেন, গোধূলির আলো-আঁধারিতে নিজের সবজি-বাগান খুঁড়তে নিমগ্ন শ্বেতশুভ্র সন্ন্যাসিনীর দিকে ।

ছবি: ১৯২৪ সালের জুনের শেষ দিকে তোলা এই ছবিতে বাঁদিক থেকে এমিলিয়া ইয়ানোস, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কা, হুয়ান রামোন হিমেনেসের স্ত্রী সেনোবিয়া কাম্প্রুবি, ইসাবেলিতা, হুয়ান রামোন হিমেনেস এবং কন্চা গার্সিয়া লোর্কা

চাপা, গমগমে হাসিতে ফেটে পড়ে পথে কোনো দড়ি পেয়েই সহসা তিনি দড়িলাফ খেলায় মেতে উঠতেন, কিংবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে জনে জনে সবার কাছে আগুন চাইতেন। তারপর, ছাগলছানার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যেতেন সাদা-ব্রোঞ্জের টিকটিকি, চুন-ছিটানো নীল মর্নিং গ্লোরি আর পিঁপড়েদের অন্তহীন ঢিবির সেই পুরনো পথ ধরে।)

…তিনি আত্মহনন করেননি। 

তিনি কি ওই ভাঙা বাড়িটির ভেতরে ঢুকেছিলেন? 

তিনি ঠিক কোথা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, আমরা আর জানি না! কিন্তু এখন, কোন সুড়ঙ্গপথে তিনি নিজের সেই রঙিন লণ্ঠন হাতে পরমেশ্বরের সঙ্গী হয়েছেন? কোন কুয়োর মুখ, নর্দমা বা পাইপ দিয়ে নেমে লাল মার্বেল স্ল্যাব তুলে সেই স্যাক্রিস্টিতে (গির্জার পবিত্র কক্ষ) এসে হাজির হয়েছেন, যেখানে ‘মুচকি হেসে’ ফাইয়া তাঁরই অপেক্ষায় ছিলেন?

তিনি ভূতপ্রেত, জয়ধ্বনি আর আদর-সোহাগ ঝেড়ে ফেলে; দুনিয়ার অদৃশ্য এতিমখানার অনাথের মতো, শেষ প্রহরে বাড়ি পৌঁছান; তারপর, দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠ আর চোখে করুণ দৃষ্টি নিয়ে, কাপড়ের লিলি ফুল হাতে, ইসাবেলিতার সঙ্গে গেয়ে ওঠেন ব্যালাড আর বড়দিনের গান।

(১৯২৮)