২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার ১৫ লাখ শিশু: ইউনিসেফ

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুদের প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা তাদের পূর্বপরিচিত ছিল।

পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার ১৫ লাখ শিশু: ইউনিসেফ

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 22 Sep 2026, 05:35 PM

Updated : 22 Sep 2026, 06:13 PM

পাকিস্তানি কিশোরী ফারিয়া শাহ (ছদ্মনাম) একটি কম্পিউটার গেম খেলার সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির লক্ষ্যে পরিণত হয়। সাধারণ কথোপকথনের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিষয়টি পরবর্তীতে তাকে অনলাইন যৌন নিপীড়নের ফাঁদে ফেলে।

এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে ১৭ বছরের ওই কিশোরীর কথা তুলে ধরেছে। সে এক বছরে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া আনুমানিক ১৫ লাখ পাকিস্তানি শিশুরই একজন বলে জানানো হয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।

ফারিয়া জানায়, “আমরা অনলাইন গেম খেলার সময় চ্যাট করা শুরু করি এবং সে বন্ধুর মতো আচরণ করে। পরে সে দেখা করতে চায় এবং পরবর্তীতে আমার কাছে আপত্তিকর ছবি দাবি করে। আমি মানা করলে সে আমাকে হুমকি দেয় যে অনলাইনে আমার পরিবারকে খুঁজে বের করবে এবং আমাদের কথোপকথনের কথা তাদের জানিয়ে দেবে।”

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুদের প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা তাদের পূর্বপরিচিত ছিল।

ফারিয়া বলেন, পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার হুমকি তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছিল।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানে ভুক্তভোগীদের ৭১ শতাংশই বিষয়টি কাউকে জানায়নি। এমনকি জরিপে অংশ নেওয়া কোনও শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীর মতো আনুষ্ঠানিক কোনও মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানায়নি।

সামাজিক লজ্জা, অবমাননা এবং পরিবার ও সমাজ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেই ভয়ই তাদের এই নীরবতার মূল কারণ।

লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকার সংস্থা ‘পাহচান’-এর পরিচালক মেহেক নাইম বলেন, “প্রতিবেদনে আসা অভিযোগের প্রায় ৪৪ শতাংশই পুরোপুরি অনলাইনে ঘটেছে। এর মধ্যে স্ন্যাপচ্যাট ও হোয়াটসঅ্যাপেই সবচেয়ে বেশি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।”

পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে কন্যাসন্তানরা যৌন ব্ল্যাকমেইলের বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাইরে চলাফেরা সীমিত করে দেওয়া হয় কিংবা স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

ফারিয়ার ক্ষেত্রে পরিবার জেনে যাওয়ার ভয়ই তাকে চুপ রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।

সে বলে, “আমার স্কুলে যাওয়া বা বাসা থেকে বের হওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারত। মুখ খোলার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো মনে হয়েছিল। কিন্তু এই দুশ্চিন্তা আমাকে প্রতিদিন তিলে তিলে শেষ করছে।”

আইনি ফাঁকফোকর ও দুর্বল প্রয়োগ

ইউনিসেফের মতে, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে প্রযুক্তির বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

চলতি মাসে পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি প্রস্তাব পাস করেছে। তবে এই উদ্যোগ বিভিন্ন বাধার মুখে পড়েছে।

ডিজিটাল অধিকারকর্মী ওসামা খিলজি বলেন, “আমি এই নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে একমত নই। এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে এবং ভিপিএন ব্যবহার করে শিশুরা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারবে। তাছাড়া শিশুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, আর এই নিষেধাজ্ঞা সেই অধিকার কেড়ে নেয়।”

অলাভজনক সংস্থা ‘মুসলিম হ্যান্ডস’-এর মুখপাত্র তাহিরা আফ্রাসিয়াব জানান, পাকিস্তানে শিশুদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ দমনে আইনি কাঠামো রয়েছে, কিন্তু ‘কোনও বাস্তবায়ন নেই’।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সালমান আফ্রিদি জানান, এই বিষয়টি কীভাবে ‘আর্থিক দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়’ তা তুলে ধরে।

যৌনকাজের কনটেন্ট তৈরির বিনিময়ে শিশুদের মাত্র ১০ হাজার পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ৩৬ ডলার) পর্যন্ত দেওয়ার লোভ দেখানো হয়।

তিনি বলেন, “আমরা যা দেখছি তা হল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফাঁদে ফেলা, প্রলুব্ধ করা, জবরদস্তি, ব্ল্যাকমেইল, কনটেন্ট তৈরি, বিতরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের একটি পুরো নেটওয়ার্ক চালনা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “একে শোষণের এক ধরনের বাণিজ্যিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করার জোরালো ভিত্তি রয়েছে।”

ফারিয়াসহ বহু শিশুর জন্য অনলাইন গেম দিয়ে শুরু হওয়া এই অভিজ্ঞতার মানসিক আঘাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফারিয়া বলে, “আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম, এখনও ভীত। আমি প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বাস করছি।”