১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

১২ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে চীন-উত্তর কোরিয়া নতুন সেতু চালু

চীন ও উত্তর কোরিয়ার নতুন সড়ক সেতু চালুর বিষয়টিকে দুই মিত্রের সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

১২ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে চীন-উত্তর কোরিয়া নতুন সেতু চালু

চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সড়কপথে যুক্ত করা ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Oct 2026, 11:48 AM

Updated : 15 Oct 2026, 11:48 AM

দীর্ঘ ১২ বছরের প্রতীক্ষা ও টানাপড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মুক্ত হল চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সড়কপথে যুক্ত করা নতুন একটি সেতু।

দুই পুরনো মিত্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ নামের এই সেতুটি চালু হয়েছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানিয়েছে বিবিসি।

তিন কিলোমিটার (১ দশমিক ৯ মাইল) দীর্ঘ এই সড়ক সেতুটি চীনের সীমান্ত শহর দানদংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে এটিই হতে যাচ্ছে দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের প্রধান পথ।

নতুন এই অবকাঠামোটি মূলত ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাপানি ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত পুরোনো ‘চীন-উত্তর কোরিয়া মৈত্রী সেতু’র বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

২০১৪ সালেই সেতুটি চালুর কথা ছিল। কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় উত্তর কোরিয়া তাদের অংশের সংযোগ সড়ক ও শুল্ক অবকাঠামোর নির্মাণকাজ হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে যায় প্রকল্পটি।

বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নতুন সেতুটিকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ‘সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, এই রুট দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ও অর্থনৈতিক লাইফলাইন হলো বেইজিং।

২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা মহামারী-পূর্ববর্তী স্তরে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই বাণিজ্যের সিংহভাগই উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি।

জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় সীমান্তে বাণিজ্যে খুব দ্রুত বড় কোনো উল্লম্ফনের সম্ভাবনা দেখছেন না দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং।

বিবিসিকে তিনি বলেন, অবাধে চীনা পণ্য ঢুকলে অভ্যন্তরীণ বাজারের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক রয়েছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার এই উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে চীনও সম্ভবত ধীরেসুস্থে বাণিজ্য বাড়ানোর নীতি নেবে।

বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রয়েছে এবং চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেই।

দুই দেশের এই নৈকট্যকে ‘দাঁত আর ঠোঁটের মত নিবিড় সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

ঐতিহাসিক এই বন্ধুত্বে টানাপড়েনও কম ছিল না। ২০১০-এর দশকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার জেরে বেইজিংয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে।

পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে চীন অনেকটাই নমনীয় অবস্থান নেওয়ায় বরফ গলতে শুরু করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, “মাত্র এক দশক আগেও পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার প্রকাশ্য দাবি তুলে বেইজিং যেভাবে কড়া সমালোচনা করত, এখন তারা এ বিষয়ে কার্যত নীরব।”

মহামারীর কারণে দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যাত্রীবাহী ট্রেন এবং বেইজিং-পিয়ংইয়ং ফ্লাইট পুনরায় চালু করা হয়।

এদিকে ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যে কৌশলগত ও সামরিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, তার ওপর কড়া নজর রাখছে চীন।

গত মাসেই উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতুটি চালু হয়, যা দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ যানবাহন ও দুই হাজার মানুষ পারাপার হতে পারছে।

এমন প্রেক্ষাপটে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে তৎপর বেইজিং। এ বছরের জুনেই নিজের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে পিয়ংইয়ং গিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করেছিলেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

সিউলের এহওয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেন, “ইয়ালু নদীর সেতুটি চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতিরই প্রমাণ। এতে স্পষ্ট হল, জুনে শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফর স্রেফ লোক দেখানো ছিল না।

“তবে এই একটি সেতু চালুর পেছনে এক যুগের বিলম্বই বলে দেয়, উত্তর কোরিয়াকে সামলানো বেইজিংয়ের জন্য কতটা জটিল।”