০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইতালির ছোট্ট গ্রামে শতবর্ষ ছুঁচ্ছেন নারীরা, দীর্ঘায়ুর নতুন ‘ব্লু জোন’ ?

ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপের ছোট্ট পাহড়ি গ্রাম ‘বোলোতানা’ এখন দীর্ঘায়ুর নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

ইতালির ছোট্ট গ্রামে শতবর্ষ ছুঁচ্ছেন নারীরা, দীর্ঘায়ুর নতুন ‘ব্লু জোন’ ?

ইতালির সার্দিনিয়া। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 06:24 PM

Updated : 08 Oct 2026, 06:24 PM

দীর্ঘায়ুর মূল রহস্য কি নারী হওয়া? অন্তত ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপের একটি ক্ষুদ্র পার্বত্য গ্রামের শতবর্ষী প্রবীণদের ওপর চালানো সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্বের যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে শতবর্ষী বা দীর্ঘায়ু মানুষের বসবাস সবচেয়ে বেশি, সেগুলোকে চিহ্নিত করা হয় ‘ব্লু জোন’ হিসেবে।

১৯৯৯ সালে সার্দিনিয়ার মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি গ্রামগুলো মূলত অস্বাভাবিক দীর্ঘায়ু পুরুষদের বাসস্থান হিসেবে বিশ্বের পাঁচটি প্রধান ‘ব্লু জোন’-এর একটির স্বীকৃতি পেয়েছিল।

তবে মূল ব্লু জোন থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সার্দিনিয়ার কেন্দ্রীয় ‘মার্জিন’ এলাকার ‘বোলোতানা’ গ্রামটি এখন দীর্ঘায়ুর নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে প্রতি বছর নতুন নতুন শতবর্ষী দেখা দেওয়ার বিস্ময়কর ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন মূলত নারীরা।

সার্দিনিয়ার সাসারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহাম’-এর গবেষকদের যৌথ এই গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বোলোতানা গ্রামে ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানো নারীদের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশই শেষ পর্যন্ত জীবনের ১০০ বছর স্পর্শ করতে পারেন। নারী দীর্ঘায়ুর বিচারে হংকংয়ের পর বোলোতানা এখন বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

২০০৯ সালের পর থেকে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়া ইতালিতে যেখানে ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানো নারীদের গড়ে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ শতবর্ষের মাইলফলকে পৌঁছাতে পারেন, সেখানে এই ছোট্ট গ্রামের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বহু গুণ বেশি।

গবেষকরা ১৯০০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে বোলোতানায় জন্মগ্রহণকারী বাসিন্দাদের সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখেন, তাদের মধ্যে ৩৮ জন ১০০ বছর বা তার বেশি সময় বেঁচেছিলেন। এই গ্রামে দীর্ঘায়ুর হার সমগ্র ইতালির জাতীয় গড়ের চেয়ে ৫৭ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২,২৬৬ জন জনসংখ্যার এই গ্রামটিতে গত বছর ১২ জন শতবর্ষীর উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা পুরো সার্দিনিয়া দ্বীপের গড়ের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি।

পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ৬ জন মারা গেলেও বর্তমানে যে ৬ জন বেঁচে আছেন, তাদের সবাই নারী। এদের মধ্যে প্রবীণতম দুজনের বয়স ১০২ বছর। গবেষকরা আশা করছেন, চলতি বছর এবং ২০২৭ সালের মধ্যে আরও কয়েকজন বাসিন্দা শতবর্ষের এই বিশেষ মাইলফলক স্পর্শ করবেন।

গবেষণার ফলে আরও দেখা গেছে, বিশ্বের অন্য চারটি মূল ব্লু জোন, জাপানের ওকিনাওয়া, কোস্টারিকার নিকোইয়া উপদ্বীপ, গ্রিসের ইকারিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডার তুলনায় সার্দিনিয়ার এই দীর্ঘায়ু অঞ্চলটি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে।

গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী এবং ‘ব্লু জোন’ ধারণার অন্যতম উদ্ভাবক জোভান্নি মারিও পেস জানান, ২৫ বছরেরও বেশি সময় পর সার্দিনিয়ার চিরাচরিত ব্লু জোনের সীমানার বাইরে দীর্ঘায়ুর নতুন কোনও স্থায়ী কেন্দ্রের সন্ধান মিলল।

তিনি বলেন, “বোলোতানা গ্রামটি মূল ব্লু জোনের মতো একই বৈশিষ্ট্য বহন করলেও এটি আরও ব্যতিক্রমী। মূল অঞ্চলে নারী ও পুরুষের বেঁচে থাকার হারে এক ধরনের সামঞ্জস্য ছিল, কিন্তু বোলোতানায় শতবর্ষীদের ক্ষেত্রে নারীদের স্পষ্ট জয়জয়কার।”

পেস আরও উল্লেখ করেন, জৈবিক বা শরীরবৃত্তীয় কারণে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি দিন বাঁচেন, এ কথা সার্বিকভাবে সত্য ও প্রমিত হলেও বোলোতানার নারীদের দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনা পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশের নারীর তুলনায় অন্তত তিন গুণ বেশি।

পেস নিজে সার্দিনিয়ার অধিবাসী, যার পরদাদা ১১০ বছর বেঁচেছিলেন এবং তার মায়ের বর্তমান বয়স ১০১ বছর। তবে এই গ্রামের প্রবীণদের দীর্ঘায়ুর সুনির্দিষ্ট কারণ বা গোপন রহস্য সম্পর্কে এখনই কোনো অনুমান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে চাননি তিনি।

তিনি জানান, বর্তমান গবেষণাটি মূলত বোলোতানায় অবিশ্বাস্য দীর্ঘায়ুর এই বিরল ঘটনার অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।