‘সহিংসতা আসছে’: লন্ডনে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে ‘লড়ো নয়তো মরো’ বার্তা মাস্কের
ডানপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট টমি রবিনসন আয়োজিত এ বিক্ষোভে আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিল, বলেছে পুলিশ।
যুক্তরাজ্যে হওয়া কট্টর ডানপন্থিদের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ঘিরে সংঘাতের পর পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
শনিবার ডানপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট টমি রবিনসন আয়োজিত এ বিক্ষোভে প্রায় দেড় লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিল বলে প্যারিসভিত্তিক এক বার্তা সংস্থার খবরের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রবিনসনের এই ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া লাখো মানুষ ওয়েস্টমিনিস্টার সেতুর ওপর দিয়ে মিছিল করে ডাউনিং স্ট্রিটের কাছে সমাবেশ করেছে। সমাবেশে ধনকুবের ইলন মাস্কের মতো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সুপরিচিত অনেক কট্টর ডানপন্থি ব্যক্তিত্ব বক্তৃতা দেন।
“আপনারা এখানে একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি। বামপন্থা হল হত্যা ও হত্যা উদযাপনের দল। আপনি সহিংসতা বেছে নেন বা না নেন, সহিংসতা আপনার দিকে আসছে। হয় পাল্টা রুখে দাঁড়াবেন, নয়তো মরবেন,” ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দেওয়া ভাষণে এমনটাই বলেছেন মাস্ক।
রবিনসনের এই আয়োজনে বক্তাদের মধ্যে আরও ছিলেন ফরাসী কট্টরডানপন্থি রাজনীতিক এরিক জেমুর ও জার্মানির অভিবাসনবিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) পেতর বিস্ত্রন।
জেমুর তার বক্তৃতায় ডানপন্থি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের তথাকথিত ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বই আওড়ান, যেখানে বলা হচ্ছে, ইউরোপে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা হবে।
যুক্তরাজ্যের মধ্যপন্থি লিবারেল ডেমোক্রেটদের নেতা এড ডেভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী এ কর্মসূচি, তাতে মাস্কের বক্তব্য দেওয়া এবং বিক্ষোভকে ঘিরে হওয়া সহিংসতার সমালোচনা করেছেন।
“এই কট্টর-ডানপন্থি গুন্ডারা ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করে না,” বলেছেন তিনি।
এদিন অনেক বিক্ষোভকারী ইংলিশ ও ব্রিটিশ পতাকা নিয়ে বিক্ষোভে হাজির হয়েছিলেন, তাদের সমাবেশ ঘিরে আশপাশের এলাকাগুলোতে কয়েক ঘণ্টা টান টান উত্তেজনাও ছিল।
ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার সময় ‘অগ্রহণযোগ্য সহিংসতায়’ ২৬ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবারের বিক্ষোভে আনুমানিক এক লাখ ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে বলে ভাষ্য মেট্রপলিটন পুলিশের।
এই সংখ্যা ‘আয়োজকদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি’; বিক্ষোভকারীদের একটা অংশ পাল্টা-বিক্ষোভকারীদের কাছের ‘নিরাপদ এলাকায়’ ঢোকার চেষ্টা করলে সংঘাত বাঁধে, বলেছে তারা।
অভিবাসনবিরোধীদের কর্মসূচি থেকে প্রায় এক মাইল উত্তরে ‘স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম’ মিছিল হয়, এতে হাজার পাঁচেক লোক অংশ নেয়। দুই পক্ষকে আলাদা রাখতে প্রায় এক হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
“বেশিরভাগই এসেছিলেন তাদের প্রতিবাদের আইনি অধিকার চর্চায়, কিন্তু অনেকে এসেছিলেন সহিংসতা করার উদ্দেশ্যে। তারা পুলিম সদস্যদের মুখোমুখি হন, শারীরিক ও মৌখিক আক্রমণ চালায় এবং সবাইকে নিরাপদে রাখার জন্য দেওয়া ঘেরাটোপ ভাঙার চেষ্টা করে,” বলেছেন মেট্রপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার ম্যাট টুইস্ট।
পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ।
এমন এক সময়ে লন্ডনে অভিবাসনবিরোধী এ বিক্ষোভ হল যখন ব্রেক্সিটের সমর্থক নাইজেল ফারাজের ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে জনমত জরিপগুলোতে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে এবং শরণার্থীদের রাখা বিভিন্ন হোটেল বিক্ষোভকারীদের নিশানায় রয়েছে।
গত বছর যুক্তরাজ্যের অনেক শহরে অভিবাসনবিরোধী দাঙ্গাও হয়েছে। রবিনসনের বিরুদ্ধে সেসময় অনলাইনে উত্তেজনামূলক পোস্ট দিয়ে দাঙ্গা উসকে দেওয়ায় অভিযোগও ছিল।
৪২ বছর বয়সী রবিনসন দীর্ঘদিন ধরেই অনলাইনে অভিবাসনবিরোধী ও মুসলমানবিরোধী নানা ধরনের পোস্ট করে আসছেন। শনিবারের কর্মসূচিকে তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘বাক স্বাধীনতার উৎসব’ হিসেবে।
“লাখো দেশপ্রেমিক, দেশপ্রেমের এমন ঐক্য আগে কখনো দেখা যায়নি,” সন্ধ্যার আগে আগে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর জমায়েতের ছবি এক্সে পোস্টে করে বলেন রবিনসন, যার আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলে-লেনন।
কর্মসূচিটি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকদিন আগে গুলিতে নিহত ডানপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট চার্লি কার্ককেও উৎসর্গ করেন তিনি।
শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের হাতেও ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র কার্কের ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। অনেকের ব্যানারে ছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে স্লোগান, কেউ কেউ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকা থামানোর আকুতি নিয়ে লিখে এনেছিলেন ‘স্টপ দ্য বোটস’।
“আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমি জানতাম, আমার এখানে থাকাই লাগবে। আমাদের কথা শুনতে হবে,” প্যারিসভিত্তিক একটি বার্তা সংস্থাকে বিশাল জমায়েত আর নিজের চাওয়া প্রসঙ্গে বলেন স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো থেকে লন্ডনের কর্মসূচিতে যাওয়া এমিলি রোজ। তার পরনে ছিল ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা খোদাই করা পোশাক।
যুক্তরাজ্যে বিপুল পরিমাণ অভিবাসীর উপস্থিতি নিয়ে চিন্তিত বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ২৮ বছরের রিচিও। তিনি ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রতিবছর আসা অভিবাসীর সংখ্যাকে ‘আক্রমণ’ হিসেবেই দেখছেন।
তাদের মাইলখানেক দূরে বর্ণবাদবিরোধী সমাবেশে দীর্ঘদিনের লেবার আইনপ্রণেতা ডায়ান অ্যাবট অভিবাসনবিরোধী রবিনসন ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে শরণার্থীদের হুমকি হিসেবে দেখিয়ে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘বিপজ্জনক’ মিথ্যা ছড়ানোর অভিযোগ এনেছেন।
“শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো দরকার আমাদের, আমরা যে ঐক্যবদ্ধ তা দেখানো দরকার,” স্কাই নিউজকে বলেছেন এ রাজনীতিক।
