০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্যার পর সুড়ঙ্গে ৯ দিন: কীভাবে বেঁচে ছিলেন নেপালের দুই জলবিদ্যুৎকর্মী?

তাদের ফিরে আসার গল্পে মিশে আছে পরিবারের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের স্মৃতি আর প্রিয়জনকে আবার জীবিত দেখার আনন্দাশ্রু।

বন্যার পর সুড়ঙ্গে ৯ দিন: কীভাবে বেঁচে ছিলেন নেপালের দুই জলবিদ্যুৎকর্মী?
সঞ্জয় শাহ ও কবির মহার্জন। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্ট

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Sep 2026, 11:36 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:27 PM

চারদিকে অন্ধকার। বাইরে কী ঘটছে, তার কোনো খবর নেই। কখন উদ্ধারকর্মীরা আসবে, আদৌ কেউ আসবে কি না—জানা নেই। শুধু জানা ছিল, সুড়ঙ্গের গভীরে আটকে আছেন তারা।

এভাবেই কেটে গেছে এক দিন, দুদিন করে নয়টি দিন।

নেপালের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আটকে থাকা মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ ও মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জনের জন্য প্রতিটি দিন ছিল অপেক্ষার। আর বাইরে তাদের পরিবারগুলোর জন্য প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উৎকণ্ঠার।

অবশেষে শুক্রবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়। উদ্ধারকারীরা তাদের কাছে পৌঁছান। নয় দিন পর জীবিত অবস্থায় টানেল থেকে বেরিয়ে আসেন দুই কর্মী।

কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, তাদের এই ফিরে আসার গল্পে যেমন আছে ভয়াবহ বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা, তেমনি আছে সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের সরে যাওয়ার সুযোগ হারানো এক কর্মীর কাহিনী; আছে পরিবারের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের স্মৃতি আর প্রিয়জনকে আবার জীবিত দেখার আনন্দাশ্রু।

নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া সঞ্জয় শাহ। ছবি: রয়টার্স

নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া সঞ্জয় শাহ

‘শেষ পর্যন্ত আমি বের হতে পারিনি’

সপ্তরী জেলার ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মী। গত ২৬ অগাস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে যখন বরফ, কাদা ও পাথরের বিধ্বংসী ঢল নেমে এল, তিনি তখন ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

২৬ অগাস্ট হঠাৎ প্রকল্প এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। ভূগর্ভস্থ অংশে থাকা কর্মীরা তখন প্রাণ বাঁচাতে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন।

সঞ্জয়ের চোখে তখন নিজের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সহকর্মীদের নিরাপদে বের করে আনার দায়িত্ব।

শুক্রবার উদ্ধার পাওয়ার পর সেনা কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, সাধারণত ওখানে পাঁচ-ছয়জন মানুষ থাকতেন, কিন্তু ঘটনার সময় সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ জন ছিলেন।

তিনি সবাইকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। অন্যদের বের হতে সহায়তা করতে গিয়ে নিজের পালানোর সময় ফুরিয়ে যায়।

“শেষ পর্যন্ত আমি বের হতে পারিনি,” বলেন সঞ্জয়।

এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ অপেক্ষা। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে নয় দিন কাটে মন্ত্র জপে। 

সেনাবাহিনীর চিকিৎসক দলকে সঞ্জয় বলেন, “আমি কন্ট্রোল রুমে কাজ করতাম। সবাইকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল।”

তার ধারণা, টানেলের আরও গভীরে আরো কেউ কেউ হয় আটকে থাকতে পারেন।

পরিবারের সঙ্গে সেই শেষ ফোন

বন্যার ঠিক আগে পরিবারের সঙ্গে সঞ্জয়ের শেষ কথা হয়েছিল। ২৬ অগাস্ট সকাল ৭টার দিকে তার বোন সুধার সঙ্গে প্রায় তিন মিনিট কথা হয়।

তখনও বিপদের কোনো আভাস ছিল না। সঞ্জয় ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের প্রকল্পের ভেতরের কিছু যন্ত্রপাতি দেখান। তারপর জানান, তিনি কাজে ফিরে যাচ্ছেন।

সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ। এরপর এক পর্যায়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায়।

দিন পেরোতে থাকে। সঞ্জয়ের পরিবারের সদস্যরা তথ্যের জন্য পুলিশ ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে ঘুরতে থাকেন। তাদের একটাই চাওয়া ছিল; যেভাবেই হোক, সঞ্জয়কে যেন খুঁজে বের করা যায়।

অবশেষে শুক্রবার খবর আসে, সঞ্জয়কে জীবিত পাওয়া গেছে। সেই খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কাঠমান্ডুর পথে রওনা হন।

নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া কবির মহার্জন। ছবি: রয়টার্স

নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া কবির মহার্জন

অন্য গল্প কবিরের

সঞ্জয়ের মত কবির মহার্জন ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থায়ী কর্মী নন।

কাঠমান্ডুর কীর্তিপুরের বাসিন্দা কবির কুলেখানি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ত্রিশূলী-৩এতে গিয়েছিলেন। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার কাজের অভিজ্ঞতা ১৫ বছরের বেশি বলে জানিয়েছেন তার ভাই আমির।

বন্যার এক দিন আগে, ২৫ অগাস্ট সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন কবির। পরদিন বন্যার খবর পাওয়ার পর তার পরিবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু ফোন বন্ধ।

পরিবারের সদস্যরা পরদিন নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরে গিয়ে তার নিখোঁজ থাকার কথা জানান। কর্মকর্তারা তাদের বলেন, উদ্ধার অভিযান চলছে। তাতে পরিবারের মনে ক্ষীণ হলেও আশা তৈরি হয়, হয়ত কবির বেঁচে আছেন।

২৬ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্ত্রী হীরা শোভার সঙ্গে শেষবার কথা হয় কবিরের। তিনি জানান, সহকর্মীদের সঙ্গে নাশতা করে ভূগর্ভে কাজে যাবেন। সেখানে গেলে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ নাও থাকতে পারে—স্ত্রীকে সেটি জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর আর কোনো ফোন আসেনি।

হাসপাতালে কবির মহার্জনকে দেখে আসার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি তার স্ত্রী হীরা শোভা মহার্জন। ছবি: রয়টার্স

হাসপাতালে কবির মহার্জনকে দেখে আসার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি তার স্ত্রী হীরা শোভা মহার্জন

নয় দিন পর

বন্যার পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের ভেতরে ঢুকে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর শুরু হয় আটকে পড়াদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান।

নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সেই অভিযানে অংশ নেয় নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা। বিদেশি উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হন।

দিনের পর দিন অনুসন্ধানের পর শুক্রবার অবশেষে উদ্ধারকারীরা পৌঁছান সঞ্জয় ও কবিরের কাছে।

দুই কর্মীকেই প্রথমে ঘটনাস্থলে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু নেওয়া হয়।

কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে বীরেন্দ্র সৈনিক হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। তার পায়ে আঘাত লেগেছে বলে জানিয়েছেন স্ত্রী হীরা। 

সঞ্জয়ের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য তাকেও সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

হীরা যখন স্বামীকে দেখতে হাসপাতালে গেলেন, নয় দিনের অন্ধকার পেরিয়ে আসা কবির তাকে ঠিকই চিনতে পারেন। 

বেশি কথা বলার মত অবস্থায় তিনি ছিলেন না। শুধু বলেন, বড্ড তৃষ্ণা!

হীরা বলেন, “সে আমাকে চিনতে পেরেছে। আমার সঙ্গে কথা বলেছে, কিন্তু বেশি কথা বলার মত অবস্থায় ও নেই। আনন্দের কান্না আমি থামাতে পারিনি।”