বিনা দোষে ৪৩ বছরের জেল, মুক্তি পেয়েই ভারতে নির্বাসনের মুখে মার্কিন নাগরিক
খুনের মিথ্যা অভিযোগে জেল খাটার পর মুক্তির আনন্দ উপভোগ করার আগেই নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক সুব্রামনিয়ম বেদমের পরিবার।
খুনের মিথ্যা অভিযোগে জেল খেটেছেন ৪৩ বছর। জেল থেকে বেরোতেই এবার নির্বাসনের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুব্রামনিয়ম (সুবু) বেদম।
মুক্তির আনন্দ উপভোগ করার আগেই নতুন দুশ্চিন্তায় তার পরিবার। কারাগার থেকে বের হওয়ার পরই তাকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)।
তাকে ভারতে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ চলছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। যে দেশে তিনি শিশু বয়সে ছিলেন, এরপর আর কখনও পা রাখেননি।
এ মাসের শুরুতে নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে সুব্রামানিয়ম তার সাবেক রুমমেট টম কিনসার হত্যার অভিযোগ থেকে খালাস পান। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরপরই আইসিই কর্মকর্তারা তাকে হেফাজতে নেয়।
পরিবারের অভিযোগ, ১৯৮৮ সালের পুরনো বহিষ্কারাদেশ দেখিয়ে তাকে ফের আটক করা হয়েছে—যে সময়ের মামলা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়।
তার পরিবার বলছে, এই সিদ্ধান্ত অন্যায়, কারণ সুব্রামনিয়ম শিশু অবস্থাতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর আর কখনও ভারতে ফেরেননি। তার বোন সরস্বতী বেদম বিবিসি-কে বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম অবশেষে সব শেষ হল, কিন্তু আবার শুরু হলো নতুন লড়াই।
কারাগারে সে সবার প্রিয় ছিল, পরামর্শ দিত, নিজের কক্ষ ছিল। এখন ৬০ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।” নতুন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে এক কথাই বারবার বলছেন সুব্রামনিয়ম, “আমরা জয়ের দিকেই মন দিই।”
তিনি আরও বলছেন, “আমার নাম বন্দি তালিকা থেকে মুছে গেছে। আমি এখন আর বন্দি নই, আমি এখন শুধু আটক।”
১৯৮০ সালের হত্যা মামলা:
১৯ বছর বয়সী কলেজছাত্র টম কিনসার নিখোঁজ হওয়ার নয় মাস পর তার মরদেহ পাওয়া যায় বনাঞ্চলে, মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল। তদন্তকারীরা দ্রুতই সন্দেহভাজন হিসেবে সুব্রামনিয়ম বেদমকে গ্রেপ্তার করে।
জামিন পাননি, পাসপোর্ট ও গ্রিন কার্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়, ‘পলাতক হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হন।
দুই বছর পর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে মাদক মামলায় আরও দুই থেকে পাঁচ বছরের সাজা যোগ হয়, যা একসঙ্গেই ভোগের নির্দেশ ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই বেদম দাবি করে আসছিলেন, তিনি নির্দোষ।
বছরের পর বছর আপিলের পর নতুন প্রমাণ আসে, যা তাকে নির্দোষ প্রমাণ করে। পেনসিলভানিয়ার জেলা অ্যাটর্নি বার্নি ক্যান্টোরনা জানিয়ে দেন, নতুন করে মামলাটি আর চালানো হবে না।
মুক্তি, তারপর আবার আটক:
হত্যার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেও ১৯৮৮ সালের নির্বাসন আদেশ, যা সুব্রামনিয়মকে হত্যা ও মাদক সংক্রান্ত সাজার ভিত্তিতে জারি করা হয়েছিল।
পুরনো মাদক মামলার রায় বহাল থাকায় আইসিই পুরনো অভিবাসন আইনের আওতায় তাকে ফের আটক করে। সংস্থাটি জানায়, তারা “আইনসম্মত আদেশ” অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইসিই বিবিসি-র অনুরোধে মন্তব্য না করলেও অন্য কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে—সুব্রামনিয়মকে আদালতের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত হেফাজতেই রাখা হবে।
পরিবারের ক্ষোভ ও আশঙ্কা:
সুব্রামনিয়মের পরিবার বলছে, চার দশক কারাগারে কাটিয়েও তিনি নিজের জীবন গড়েছেন। স্নাতকসহ তিনটি ডিগ্রি অর্জন করেছেন, বন্দিদের পরামর্শ দিয়েছেন, কখনও নিয়ম ভাঙেননি।
সরস্বতী বেদম বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, অবশেষে তাকে আলিঙ্গন করতে পারব। কিন্তু তা সম্ভব হলো না। যেভাবে সে সম্মান ও সততার সঙ্গে বেঁচে ছিল, সেটা যেন কোনও মূল্যই রাখে না।”
সুব্রামনিয়মের জন্ম ভারতে হলেও মাত্র নয় মাস বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তার নিকটাত্মীয়রা সবাই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়।
“তাকে যদি এখন ভারতে পাঠানো হয়, সেটা হবে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া,” বলেন তার বোন।
সুব্রামনিয়মের আইনজীবী আভা বেনাক বিবিসি-কে বলেন, “একজন মানুষ, যিনি ইতিমধ্যে এক নজিরবিহীন অবিচারের শিকার হয়েছেন, তাকে এখন এমন দেশে পাঠানো হচ্ছে যেখানে তার কোনও শিকড় নেই—এটি আরেকটি ভয়াবহ ভুল হবে।”
