ট্রাম্প এখনো যেভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে পারেন
ট্রাম্প ও তার দল শেষ পর্যন্ত গাজা ও ইউক্রেইন যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি আনতে পারবেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যদি পারেন, তাহলে নোবেল কমিটি এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্পকে পদক দিতেই পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে নোবেল পুরস্কার পেতে আগ্রহী- তা নিয়ে কোনো ধরনের লুকোছাপা নেই।
তার সমর্থকরাও বারবার বলছেন, ট্রাম্পের এ পুরস্কার প্রাপ্য। অন্যদিকে সমালোচকরা এ নিয়ে করছেন উপহাস। তাদের কাছে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প যেসব নীতিতে চলছেন, সেগুলো তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারের জন্য অযোগ্য বানাচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউসে ঢুকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এখন পর্যন্ত এই শতাব্দীর সবচেয়ে বাজে দুই যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে ট্রাম্পকে। তবে এখন গাজা ও ইউক্রেইন উভয় যুদ্ধক্ষেত্রেই সমঝোতার আলো দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প ও তার দল শেষ পর্যন্ত এই দুই যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি আনতে পারবেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যদি পারেন, তাহলে নোবেল কমিটি এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্পকে পদক দিতেই পারে, বলা হয়েছে সিএনএনের এক নিবন্ধে।
তবে ওই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে ট্রাম্পের আগামী বছর নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে, শুক্রবার যে পুরস্কার ঘোষিত হতে যাচ্ছে, তাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্ভাবনা তেমন নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে একাধিক যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করা ট্রাম্প যদি এবারই শান্তি পুরস্কার পেয়ে যান, তাহলে সমালোচকরা যতই বিরক্ত হন না কেন, সমর্থকদের উল্লাস তো আর থামানো যাবে না। তাছাড়া, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক তো একেবারে নতুনও নয়।
ট্রাম্পের প্রতি বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা মূলত ইউক্রেইন ও গাজা যুদ্ধ থামাতে তিনি কতটা ভূমিকা রাখতে পারেন তার ওপরই অনেকখানি নির্ভর করছে।
প্রথমেই ধরা যাক ইউক্রেইন প্রসঙ্গ।
নয় মাস ধরে ট্রাম্পের আঁকাবাঁকা সব নীতি এবং গ্রীষ্মকালে ভ্লাদিমির পুতিন, ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, সামরিক অভিযানে রাশিয়ার শ্লথ অগ্রগতি, বলার মতো কোনো অঞ্চল নিজেদের কব্জায় না নিতে পারা এবং ২০ হাজারের বেশি হতাহতের ঘটনা যুদ্ধ থামাতে চুক্তির সম্ভাবনা ক্রমশ উজ্জ্বল করছে, বলছেন নিবন্ধের লেখক পশ্চিমা বিশ্লেষক ব্রেট এইচ ম্যাকগার্ক।
তার মতে, নতুন যে চুক্তি তাতে দুটো জিনিস থাকতে পারে। এক, ভবিষ্যৎ যে কোনো আক্রমণ মোকাবেলায় ইউক্রেইনে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো জোটের প্রতিশ্রুতি। এবং দুই, পূর্ব ইউক্রেইনে এখন যেখানে যুদ্ধ চলছে সেই লাইন বিবেচনায় কিছু অংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির শর্ত নির্ধারণ করা।
ইউক্রেইন হয়তো ভূখণ্ডে ছাড় দিতে রাজি হবে না, এদিকে রাশিয়ারও মানচিত্রে বদল ছাড়া যুদ্ধ থামাতে রাজি হওয়ার কথা নয়। সব মিলিয়ে এটাই হতে পারে আপাত সমাধান।
সেখানে পৌঁছাতে প্রয়োজন ইউক্রেইনকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর অব্যাহত অঙ্গীকার এবং মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো।
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প এ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই ইউক্রেইন সঙ্কটের সমাধান করতে চান। সে কারণেই এখন নেটো মিত্ররা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কিনে ইউক্রেইনে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে।
এদিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ানরাও জব্দ ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি রুশ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে ইউক্রেইনকে ঋণ দেওয়ার কথা আলোচনা করছে, যা কিইভের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
হোয়াইট হাউস যদি শেষ পর্যন্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল থাকে তাহলে সম্ভাবনা প্রকট যে পুতিনের হাতে চুক্তি করা ছাড়া মুখরক্ষার আর কোনো উপায় থাকবে না, বলছেন ম্যাকগার্ক।
তার হিসাবে, পুতিনের বেছে নেওয়া যুদ্ধে এরই মধ্যে রাশিয়ার ১০ লাখের বেশি সেনা হতাহত হয়েছে, অর্থনীতিও পড়েছে মারাত্মক চাপে, সুদের হার এগুচ্ছে ২০ শতাংশের দিকে, বাজেট নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে জ্বালানি রপ্তানির ওপর, নিষেধাজ্ঞার কারণে যা এমনিতেই ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই চাপ অব্যাহত রেখে ট্রাম্প যদি মস্কোকে চুক্তিতে রাজি করাতে পারেন, তাহলে নোবেল কমিটি তাদের ২০২৬ সালের পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় ট্রাম্পকে ভাবতেই পারেন।
গাজা যুদ্ধের ইতি
ট্রাম্প যখন জানুয়ারিতে ফের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন গাজায় তখন তিন ধাপের একটি যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ চলছিল। প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে জিম্মি-বন্দি বিনিময় আর ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ; ওই সময়ই দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হওয়ার কথা।
কথা অনুযায়ী প্রথম ধাপ কার্যকর হলেও ছয় সপ্তাহ পর মার্চে দ্বিতীয় ধাপ শুরুর আগেই ওই চুক্তি ভেঙে পড়ে। এরপর ইসরায়েল গাজায় তার অভিযানের তীব্রতা বাড়ায়, গাজা অবরুদ্ধ করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে সেখানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় বলে জাতিসংঘসহ একাধিক বৈশ্বিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে।
গাজা পরিস্থিতির কারণে নোবেল পুরস্কারের প্রসঙ্গ উঠলে দুই সপ্তাহ আগেও সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। শান্তি আলোচনা থমকে আছে, গাজা সিটি ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির উত্তরের জনবহুল অংশ দখলে নিতে ইসরায়েল বিতর্কিত সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
ইসরায়েলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে শুরু করেছেন, তারা গাজা দখলে নিয়ে সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও গাজাবাসীকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যেমনটা আগে অন্যত্র তারা করেছেন।
পরিস্থিতি যেন দিন দিন আরও বাজে হচ্ছিল।
গত সপ্তাহ থেকে বল ঘুরতে শুরু করে। যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প ২০ দফার পরিকল্পনা হাজির করেন, যেখানে ইসরায়েলকে গাজা দখল বা বসতি সম্প্রসারণের চিন্তা বাদ দিতে এবং হামাসকে গাজার দখল ছাড়তে এবং জীবিত-মৃত সব জিম্মিকে ছাড়তে বলা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অনেক ব্যাপারেই ইসরায়েলের সম্মতি দেখা যাচ্ছে, হামাসও নিমরাজি। প্রভাবশালী সব আরব ও ইসলামী দেশও পরিকল্পনাটিতে সমর্থন দিয়েছে।
এতে হামাসকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হলেও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীটি এখন পর্যন্ত তা মেনে নেয়নি। গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়েও সমঝোতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিশরে দুই পক্ষ পরোক্ষ আলোচনা শুরু করে এবং বুধবার চুক্তির প্রথম পর্যায় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
এ পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনী একটি নির্দিষ্ট লাইন বরাবর সেনা প্রত্যাহার করবে, দুই হাজারের মতো বন্দিকে ইসরায়েলি কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেবে।
সমঝোতার ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প জানান, সব ঠিক থাকলে সোমবার হামাস সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে পারে।
কিন্তু এর আগেও হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিগুলো শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করা যায়নি। এবারও সেই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ট্রাম্প যদিও বলছেন, তার এবারের পরিকল্পনা কেবল গাজায় নয় মধ্যপ্রাচ্যেই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আনবে।
তার যদি শুরুটাও দেখা যায়, তাহলে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রভাবশালী দাবিদার তো হতেই পারেন।
অসলোর টিকেট
প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে পুরস্কৃত হন শান্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেলজয়ীরা। কারা কারা পুরস্কারটি পাচ্ছেন, তা বেছে নেওয়া হয় আরও দুই মাস আগে।
ট্রাম্প তো চাইছেন, শুক্রবার এ বছর শান্তিতে পুরস্কারজয়ী হিসেবেই তার নাম আসুক। কিন্তু সে সম্ভাবনা কম। আগামী বছর পুরস্কারের ১২৫তম বার্ষিকী, সেদিকে তার চোখ তো থাকতেই পারে।
তবে ওই পদক গলায় ওঠার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনেকগুলো পরীক্ষা পাড়ি দিতে হবে। তিনি যদি গাজা ও ইউক্রেইনে যুদ্ধ থামিয়ে সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের পথে এগুতে পারেন, ইউরোপে রাশিয়ার আর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আকাঙ্ক্ষায় যতি টেনে দিতে পারেন, তাইওয়ানে সংঘাতের ঝুঁকি নামিয়ে আনতে পারেন, তাহলে ১২৫তম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নিজের দাবি জোরের সঙ্গে তুলে ধরতে পারেন ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসন নিয়ে যে যাই ভাবুক না কেন, যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার চেষ্টা সফল হোক, এটা আমাদের সবারই প্রত্যাশা করা উচিত, বলছেন ম্যাকগার্ক।
