সবচেয়ে দামি কোম্পানি হয়ে ওঠায় সিএক্সএমটি’র অবিশ্বাস্য যাত্রা
বিশ্বের মেমোরি চিপ বাজার এতদিন স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন টেকনোলজি’র মতো বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে সিএক্সএমটি।
সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের প্রথম দিনেই শেয়ারের দামে ৪৭০ শতাংশের বড় উল্লম্ফন দেখেছে চীনের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা কোম্পানি চেংশিন মেমোরি টেকনোলজিস বা সিএক্সএমটি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্রমাগত চাহিদা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা পাওয়ার ওপর ভর করে রেকর্ড গড়া আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি এখন মূল ভূখণ্ড চীনের সবচেয়ে দামি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
কোম্পানিটির এ অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে এআই খাতের দ্রুত প্রসার, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্বের বড় সব চিপ উৎপাদনকারী কোম্পানির ওপর।
পাশাপাশি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি আমদানিতে কড়াকড়ির মুখে পড়ে উচ্চ প্রযুক্তির খাতে স্বাবলম্বী হওয়ার যে কৌশলগত উদ্যোগ বেইজিং নিয়েছে তা সিএক্সএমটি’র এ প্রবৃদ্ধিতে বাড়তি জ্বালানি জুগিয়েছে।
লেনদেনের মধ্যভাগেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ৪৭০ শতাংশ বেড়ে যায়। সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের ‘স্টার মার্কেট’, যা যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাকের আদলে গঠিত প্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেন প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ারপ্রতি ৮.৬৬ ইউয়ান বা ১.৩ ডলারে ৮৬০ কোটি ডলার মূলধন তুলেছে সিএক্সএমটি।
মূলধনে বিপুল প্রবৃদ্ধি হলেও দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন টেকনোলজির মতো বিশ্বের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতাদের তুলনায় সিএক্সএমটি’র বাজারমূল্য এখনও বেশ ছোট।
সিএক্সএমটি কী?
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের চাহিদা বৃদ্ধির জের ধরে চিপ বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে চীনের অন্যতম শীর্ষ ‘ডাইনামিক র্যান্ডম-অ্যাক্সেস মেমোরি’ বা ডিআরএএম চিপ নির্মাতা কোম্পানি সিএক্সএমটি।
স্মার্টফোন, পার্সোনাল কম্পিউটার, সার্ভার ও এআই সিস্টেমের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ‘শর্ট-টার্ম মেমোরি’ সরবরাহে এই ডিআরএএম চিপ ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বের মেমোরি চিপ বাজার এতদিন স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন টেকনোলজি’র মতো বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সিএক্সএমটি দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
কোম্পানিটির আইপিও নথির তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারে প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চিপ নির্মাতায় পরিণত হয়েছে সিএক্সএমটি।
এআই চাহিদাকে কেন্দ্র করে মেমোরি চিপের দাম ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত বছর থেকে শুরু হওয়া বাজার-উত্থানের সুফল পূর্ণমাত্রায় পাচ্ছে কোম্পানিটি। বড় এ চাহিদার প্রভাব দেখা গেছে সিএক্সএমটি’র আয়-ব্যয়ের হিসাব ও প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’তে।
নথি অনুসারে, এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব গেল বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭১৯ শতাংশ বেড়ে ৫০৮০ কোটি ইউয়ান বা ৭৫১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এ বছরের প্রথমার্ধেই কোম্পানিটি ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি ইউয়ান রাজস্ব আয়ের আশা করছে, যা তাদের ২০২৫ সালের পুরো বছরের মোট আয় ৬১৮০ কোটি ইউয়ানের প্রায় দ্বিগুণ।
সিএক্সএমটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক যে কোনো কম্পিউটিং ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান মেমোরি চিপ, বিশেষ করে এআইয়ের বিভিন্ন মডেল পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ উচ্চগতির মেমোরির প্রয়োজন হওয়ায় এআই সার্ভারে ‘ডিআরএএম’ চিপের গুরুত্ব এখন আকাশচুম্বী।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা চীনের ওপর উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে দীর্ঘ দিন ধরেই বিদেশি প্রযুক্তি ও চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে বেইজিং।
দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাজনিত এ ঝুঁকি কাটাতে সিএক্সএমটি চিনের জন্য কৌশলগত ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির একচ্ছত্র আধিপত্যের এই বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক দেশীয় মেমোরি চিপশিল্প গড়ে তুলতে চীন কতটা সফল তার বড় পরীক্ষা ছিল সিএক্সএমটি’র শেয়ারবাজারে আসা।
শেয়ারবাজারে চালুর পর সিএক্সএমটি’র মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারে সিএক্সএমটি’র শেয়ার বেশ কম হলেও প্রাথমিক শেয়ার চালুর পর এর বাজারমূল্য মার্কিন কোম্পানি ‘মাইক্রন’-এর প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জায়গায় পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সিএক্সএমটি’র গুরুত্বেরই প্রমাণ দেয়।
সিএক্সএমটি’র নেপথ্যে কারা?
সিএক্সএমটি’র শেয়ারহোল্ডার কাঠামোর দিকে তাকালেই চীনের রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর ব্যবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কোম্পানিটির আইপিও নথি অনুসারে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে এর ৩৬.২৯ শতাংশ শেয়ার ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারীদের হাতে। যার মধ্যে রয়েছে হেফেই ও আনহুই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারী ও চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতের ফ্ল্যাগশিপ তহবিল, যা ‘বিগ ফান্ড’ নামে পরিচিত।
সিএক্সএমটি গড়ে তোলার পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন জু ইমিং। তিনি ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কোড সংরক্ষণে ব্যবহৃত ‘এনওআর ফ্ল্যাশ মেমোরি’ নির্মাতা চীনা কোম্পানি ‘গিগাদিভাইস সেমিকন্ডাক্টর’-এর প্রতিষ্ঠাতা।
কোম্পানির নথি অনুসারে, সিএক্সএমটি প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে জু ইমিং-এর অবদান কেন্দ্রীয় পর্যায়ের। মেমোরি চিপ শিল্পের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
বৈশ্বিক বাজার ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তি গবেষণা কোম্পানি কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুসারে, চিপ সরবরাহের দিক থেকে ২০২৫ সালে বিশ্ব ডিআরএএম মেমোরি বাজারের প্রায় ৬ শতাংশ দখল করে চতুর্থ স্থানে ছিল সিএক্সএমটি।
বাজারে শীর্ষস্থান ধরে রাখা স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের দখলে ছিল ৩৬ শতাংশ, এসকে হাইনিক্সের ২৯ শতাংশ ও মাইক্রনের দখলে ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ শেয়ার। তবে এ বছরের প্রথম তিন মাসেই সিএক্সএমটি’র বৈশ্বিক সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ শতাংশে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৮ সালের মধ্যে এদের বাজার শেয়ার ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে কোম্পানিটির ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক শেয়ার প্রয়োজন।
কাউন্টারপয়েন্টের মেমোরি সেমিকন্ডাক্টর বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা পরিচালক এমএস হাওয়াং বলেছেন, “চিপ তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকাই এখন সিএক্সএমটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।”
অন্যদিকে, জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানি যাতে সিএক্সএমটি’র মেমোরি চিপ কিনতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা।
সম্প্রতি নাসডাকে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের ২ হাজার ৬৫০ কোটি বা ২৬৫০ কোটি ডলারের বড় আইপিও চালুর পরপরই নিজেদের এ পাবলিক শেয়ার ইস্যু করল সিএক্সএমটি।
