০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

পাসপোর্ট আকারের আইফোনসহ আরও যা যা আনল অ্যাপল

অ্যাপল অতীতে স্মার্টওয়াচ ও ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের ক্ষেত্রে যেমনটি করেছিল, ঠিক একইভাবে ফোল্ডএবল ফোনকেও মূলধারার প্রযুক্তিতে রূপ দিতে আইফোন ডুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পাসপোর্ট আকারের আইফোনসহ আরও যা যা আনল অ্যাপল
২০১৭ সালে বহুল আলোচিত আইফোন এক্স উন্মোচনের পর অ্যাপলের প্রধান পণ্যে এটাই সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ২৪

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 10 Sep 2026, 04:28 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:57 AM

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফোল্ডএবল ফোনের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে পা রাখল মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল। নতুন ডিজাইনসহ ডেটা প্রাইভেসির প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে এসেছে অ্যাপলের পাসপোর্ট আকারের এ ডিভাইস।

১ হাজার ৯৯৯ ডলারের ‘আইফোন ডুও’ নামের এ ফোল্ডএবল আইফোনের মাধ্যমে অ্যাপল নিজেদের ফ্ল্যাগশিপ ফোনের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করল বলে প্রতিবেদিনে লিখেছে রয়টার্স।

অভিনব ডিজাইন ও শক্তিশালী ডেটা প্রাইভেসির নিশ্চয়তা দিয়ে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলার বাজি ধরেছে অ্যাপল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ভাঁজ করার উপযোগী ফোন বিক্রি করে আসা প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য অ্যাপলের এ পদক্ষেপ বড় ধাক্কা হতে পারে।

এতদিন স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো চীনা বিভিন্ন কোম্পানি ফোল্ডএবল ফোনের বাজার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করে এলেও তাদের ডিভাইসগুলো নির্দিষ্ট ক্রেতাশ্রেণির মধ্যেই সীমিত ছিল।

এদিকে, বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাপলের এই বাজারে প্রবেশ ফোল্ডএবল ফোনের দুনিয়ায় বহুল প্রতীক্ষিত অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। অতীতে স্মার্টওয়াচ ও ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের ক্ষেত্রে যেমনটি করেছিল অ্যাপল, ঠিক একইভাবে ফোল্ডএবল ফোনকেও মূলধারার প্রযুক্তিতে রূপ দিতে ডিভাইসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পাসপোর্টের আকারে তৈরি ডুও ফোনের কোণগুলো বেশ গোলাকার। ফোনটি ভাঁজ করা অবস্থায় এর সামনে ছোট একক স্ক্রিন রয়েছে। ডিভাইসটি মেলে ধরলে ভেতরে ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চি বা ১৯ সেন্টিমিটার ডায়াগনালের প্রশস্ত অনুভূমিক স্ক্রিন মেলে, যা লম্বালম্বিভাবেও দেখা সম্ভব।

অ্যাপলের দাবি, আইফোন ডুও খোলা অবস্থায় তাদের এ পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে পাতলা ফোন। তবে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৈরি ফোল্ডএবল ফোনের তুলনায় অ্যাপলের ফোনটি কিছুটা পুরু।

২০১৭ সালে বহুল আলোচিত আইফোন এক্স উন্মোচনের পর অ্যাপলের প্রধান পণ্যে এটাই সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন। নতুন পণ্যটির উন্মোচন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাস।

সর্বশেষ অর্থবছরে কেবল আইফোন বিক্রি করেই ২০ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার আয় করেছে অ্যাপল, যা কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি।

অনুষ্ঠানে বর্তমান বাজারে থাকা বিভিন্ন ফোল্ডএবল ফোনের কড়া সমালোচনা করে জন টার্নাস বলেছেন, এসব ডিভাইস বেশ ভারী ও স্ক্রলিং বা ভিডিও দেখার মতো কাজের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়।

কাস্টমাইজড হিঞ্জ, সমানুপাতিক অ্যাসপেক্ট রেশিওওয়ালা ডুয়াল ডিসপ্লে ও নতুন টাইটানিয়াম বডির সমন্বয়ে পকেট-আকারের ডিভাইসেই আইপ্যাডের মতো দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা দিতে ডুও’র এই ডিজাইন বেছে নেওয়ার কথা বলেছেন টার্নাস।

পাসপোর্টের আকৃতি ও মাপে তৈরি ডুও ফোনের কোণগুলো বেশ গোলাকার। ছবি: রয়টার্স

পাসপোর্টের আকৃতি ও মাপে তৈরি ডুও ফোনের কোণগুলো বেশ গোলাকার

“আইফোন ডুও একেবারে নতুন ও পরিচিত ডিভাইস, যা আপনার পাসপোর্টের মতো আকৃতির হওয়ায় হাতে ধরা সহজ ও এক হাতে ব্যবহারেও আরামদায়ক।”

এদিকে, অ্যাপলের নতুন পণ্য উন্মোচনের পর অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েনি।

জনপ্রিয় ভাষা শেখার অ্যাপ ‘ডুওলিংও’-এর লোগোতে একটি সবুজ প্যাঁচার মাসকট ও নামেও ‘ডুও’ রয়েছে। তারা এক্স-এ হ্যান্ডলে হাসির ইমোজিজুড়ে দিয়ে লিখেছে, “আমাদের কপিরাইট লঙ্ঘন করা হয়েছে।”

তাদের সেই পোস্টে সংহতি প্রকাশ করে ফোল্ডএবল ফোন বাজারজাতকারী কোম্পানি ‘স্যামসাং মোবাইল ইউএস’ লিখেছে, “তারা আমাদেরও কপি করেছে।”

অ্যাপলের দীর্ঘদিনের লো-প্রোফাইল হার্ডওয়্যার প্রধান জন টার্নাসের ওপর এখন বড় দায়িত্ব বর্তেছে, যেখানে তিনি ২ হাজার ডলারের একটি ফোল্ডএবল ডিভাইস কিনতে গ্রাহকদের কীভাবে রাজি করাবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অ্যাপল বলেছে, আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে বাজারে পাওয়া যাওয়া আইফোন ডুও’তে রয়েছে এর ডিসপ্লে চালনার জন্য শক্তিশালী ‘এ২০ প্রো’ চিপ।

কোয়ালকমের ওয়্যারলেস ডেটা চিপের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অ্যাপলের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন ‘সি২’ মডেম চিপও এতে যোগ হয়েছে। এর ব্যাটারি ডুয়াল-স্ক্রিনে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মিশ্র ব্যবহার সমর্থন করে ও কেবল ২০ মিনিটে প্রায় ৫০ শতাংশ চার্জ নিতে পারে।

এ ইভেন্টের দিন বুধবার শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষে অ্যাপলের শেয়ারের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৩১৫ ডলার ৩৪ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।

এআই প্রাইভেসির ওপর জোর

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাবেক সিইও টিম কুক এক রসাত্মক ভিডিওর মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরুর বিষয়ে আলোচনা করে নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন।

ভিডিওর শেষ অংশে দেখা গেছে, টিম কুক ক্যামেরার কাছাকাছি এসে নতুন সিইওর দিকে ইঙ্গিত করে বলছেন, “আমি না। ওই তো মূল লোক।”

আইফোন প্ল্যাটফর্মকে ব্যক্তিগত এক এআই হাব হিসেবে বর্ণনা করে জন টার্নাস ডেটা প্রাইভেসির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন, অন্যান্য কোম্পানি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে চায়।

“সত্যি বলতে, আপনার ডেটা যখন আর আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না তখন বিশ্বাসের বিষয়টিও একটা সীমার মধ্যে আটকে পড়ে। আর ঠিক এজন্যই অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স যথাসম্ভব ডিভাইসের ভেতরেই পরিচালিত হয়।”

অ্যাপলে আইফোন এআই পণ্যের দেখভাল করেন লিলিয়ান রিনকন। এ বছরের শুরুতে তাকে গুগল থেকে এনেছিল অ্যাপল।

সর্বশেষ অর্থবছরে কেবল আইফোন বিক্রি করেই ২০ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার আয় করেছে অ্যাপল, যা কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি। ছবি: রয়টার্স

সর্বশেষ অর্থবছরে কেবল আইফোন বিক্রি করেই ২০ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার আয় করেছে অ্যাপল, যা কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি

আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্স

প্রচলিত ধারার নন-ফোল্ডিং লাইনআপের আধুনিক হ্যান্ডসেট, যেমন আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্স দেখিয়েছে অ্যাপল। আইফোন ১৭ প্রো ও প্রো ম্যাক্স-এর তুলনায় এগুলোর দাম ১০০ ডলার বাড়িয়ে যথাক্রমে ১ হাজার ১৯৯ ডলার ও ১ হাজার ২৯৯ ডলার নির্ধারিত হয়েছে।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগের বিষয়টি মাথায় রেখে একটি নতুন ফিচার আনছে অ্যাপল। নতুন আইফোন ১৮ প্রো ক্যামেরায় তোলা ছবির সত্যতা প্রমাণের জন্য তারা ‘অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ’ নামের নতুন এক স্ট্যান্ডার্ড চালু করেছে।

এ ছাড়া, এআই দিয়ে তৈরি বা এডিট করা ছবি শনাক্তকরণের ‘সিন্থআইডি’ স্ট্যান্ডার্ডও সমর্থন করবে। তবে ইইউ বা চীনে এ ‘অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ’ ফিচারটি পাওয়া যাবে না।

আইফোন ১৮ প্রো’তে থাকছে নতুন ‘এ২০ প্রো’ চিপ, যা উন্নত এআই মডেলগুলোকে সরাসরি আইফোনে চালাতে বিভিন্ন সুবিধা দেবে।

এয়ারপডস ও অ্যাপল ওয়াচের আপডেট

অ্যাপল বলেছে, ১২৯ ডলার থেকে শুরু হওয়া নতুন সংস্করণের এয়ারপডসে এবার অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন সুবিধা থাকছে, যা তাদের বাজেট ইয়ারবাড সিরিজে এই প্রথম যোগ হলো।

ফিটনেস ও রিকভারি পরিমাপের নতুন ফিচার এবং উন্নত হার্ট-রেট ট্র্যাকিং সুবিধাসহ স্বাস্থ্য-কেন্দ্রিক বড় ধরনের আপডেট হিসেবে অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২ ও অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৪ উন্মোচন করেছে কোম্পানিটি।

অনুষ্ঠানে মাইক্রনের সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা উপস্থিত ছিলেন, যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অ্যাপল খুব কম সময়ই এ ধরনের অনুষ্ঠানে সরবরাহকারীদের এমন গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

আইফোন ও অন্যান্য পণ্যে অ্যাপল যখন আরও বেশি এআই ফিচার যোগ করছে, তখন উচ্চ-কার্যসক্ষমতাওয়ালা মেমরির চাহিদাও বেড়েছে, বিশেষ করে গ্লোবাল মেমরি চিপ সংকটের এ সময়ে মাইক্রনের মতো সরবরাহকারীদের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।