০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

চালক ছাড়া টেসলার গাড়ি এক ‘চলন্ত ঝুঁকি’: বরখাস্ত হওয়া ম্যানেজার

প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার গুরুতর ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পরই তাকে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করেছেন তিনি।

চালক ছাড়া টেসলার গাড়ি এক ‘চলন্ত ঝুঁকি’: বরখাস্ত হওয়া ম্যানেজার
চালকহীন গাড়ি তৈরিতে টেসলার কারিগরি দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তি নিয়ে অতীতেও নানা সমালোচনা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Jul 2026, 04:46 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তিতে গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরাপত্তা ত্রুটির প্রতিবাদ করায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এক কর্মীকে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক ওই ম্যানেজারের দাবি, প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় চালকহীন বিভিন্ন গাড়ি রাস্তায় ‘চলন্ত ঝুঁকিতে’ পরিণত হয়েছিল।

প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং বা এফএসডি প্রযুক্তির পরীক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা ওই বরখাস্তকৃত ম্যানেজার কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার গুরুতর ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পরই তাকে বেআইনিভাবে প্রতিশোধমূলক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করেছেন তিনি।

মামলার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। মামলাটি দায়ের করেছেন হ্যাভিয়ার মেডরানো নামের এক সাবেক কর্মকর্তা।

তার দাবি, চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি প্রযুক্তির উন্নয়নে বাড়তি বাজেট বা প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগে টেসলার অনিচ্ছার কারণে রাস্তায় একেকটি গাড়ি যেন ‘চলন্ত ঝুঁকিতে’ পরিণত হয়েছিল।

এ মামলার বিষয়ে এনগ্যাজেটের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি টেসলা।

মামলার নথি অনুসারে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত টেসলার এফএসডি সফটওয়্যার পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত সেইফটি অপারেটরদের একটি দলের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন মেডরানো।

একজন ম্যানেজার হিসেবে গাড়ি চালনার ভিডিও ক্লিপ অডিট, প্রতি সপ্তাহে সরেজমিনে গাড়িতে উঠে নিরাপত্তা তদারকি এবং সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে অন-কলে জরুরি সেবা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব ছিল।

মেডরানো বলেছেন, সমস্যা তৈরি হয় যখন তার অধীনে থাকা অপারেটরের সংখ্যা বেড়ে ৩৮ জনে দাঁড়ায়। টেসলার অটো পাইলট ডিরেক্টর পিট শিউটজো নিজেই প্রতি ১৫ জন অপারেটরের জন্য একজন ম্যানেজার রাখার নীতি নির্ধারণ করেছিলেন।

মামলায় বলা হয়েছে, অটো পাইলট ডিরেক্টর পিট শিউটজোর সঙ্গে এক আলাপে মেডরানো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, একজন ম্যানেজারের অধীনে এতো অপারেটর থাকার কারণে তার ‘ঠিকমতো খাওয়া ও ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে’।

তবে শিউটজো বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, “তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না যে তুমি পানিতে ডুবছ।”

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মেডরানোর এ উদ্বেগে সাড়া দিতে টেসলার অনিচ্ছাই শেষ পর্যন্ত তাদের ‘পর্যাপ্ত বাজেট ও কর্মীহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ চরম ব্যর্থতা ডেকে আনে, যার পরিণতি হিসেবে মেডরানো তদারকিতে থাকা অবস্থাতেই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে।

মামলার নথি বলছে, দুর্ঘটনার সময় মেডরানো ‘শারীরিকভাবে ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ফলে তিনি দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির অপারেটরকে ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ কারণে ওই নারী অপারেটর প্রায় এক ঘণ্টা ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাস্থলে অবস্থান করতে বাধ্য হন, যেখানে একজন অসচেতন ব্যক্তি তাকে বিরক্ত করতে আসে।

এ ঘটনার পর যেসব নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর উদ্যোগ নেন মেডরানো। একই সঙ্গে হিউস্টন অঞ্চলের জন্য টেসলা প্রয়োজনীয় সম্পদ ও কর্মী বরাদ্দ দিচ্ছে না বলেও প্রমাণ দেন তিনি।

তবে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পরপরই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।

বেআইনিভাবে প্রতিশোধমূলক বরখাস্তের প্রতিকার হিসেবে মেডরানো তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি না হওয়া শেয়ারের ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও ভবিষ্যৎ বেতন এবং ‘মানসিক যন্ত্রণা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও তীব্র আর্থিক অনটনের’ ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দাবি করেছেন।

চালকহীন গাড়ি তৈরিতে টেসলার কারিগরি দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তি নিয়ে অতীতেও নানা সমালোচনা হয়েছে।

এ মামলায় ইঙ্গিত মিলেছে, প্রযুক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিও টেসলার রোবোট্যাক্সিকে সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক করে তুলছে।

কেবল ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাই নয়, টেসলার স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলোর সফটওয়্যার নিয়েও উদ্বেগের অন্ত নেই। মে মাসে এক প্রতিবেদনে রয়টার্স বলেছিল, টেসলা সম্ভবত তাদের এফএসডি সফটওয়্যারের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়িয়ে বলছে।

টেসলা গাড়ির ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনাকারী কর্মীদের বরাতে রয়টার্স প্রতিবেদনে লিখেছিল, এফএসডি প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ট্রাফিক নিয়ম মানতেও ব্যর্থ হচ্ছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেইফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ও টেসলার এ প্রযুক্তির নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে চালকের নজরদারি সাপেক্ষে টেসলার এফএসডি সফটওয়্যার ব্যবহার করা যাচ্ছে। তবে একাধিক দুর্ঘটনা, রোবোট্যাক্সি চালুতে ধীর গতি ও সম্প্রতি সামনে আসা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত সংকট সব মিলিয়ে কোম্পানিটির এফএসডি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সাফল্যকে অনেকটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে।