চীনের ‘ডান্সিং রোবট’ পশ্চিম বিশ্বের জন্য কতটা উদ্বেগের?
এসব রোবট সামনের দিকে ঝুঁকে কসরত দেখিয়েছে, শূন্যে ডিগবাজি দিয়ে ঠিকঠাক হাঁটু গেড়ে বসেছে, আবার ঘুরে ঘুরে লাফিয়ে নেচেছে। এবং একটি রোবটও পড়ে যায়নি।
চীনের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চে এবার দেখা গেল বিস্ময়কর এক দৃশ্য। একদল হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে রোবট নিখুঁত তালে নেচে, ডিগবাজি খেয়ে ও কুংফু প্রদর্শন করে কোটি কোটি দর্শককে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
এ চোখধাঁধানো প্রদর্শনী কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির লড়াইয়ে চীনের ক্রমাগত আধিপত্যেরই নজির বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিট্রিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান।
সোমবার চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ স্প্রিং ফেস্টিভাল গালা’তে মূল আকর্ষণ ছিল এসব ‘ডান্সিং রোবট’, যেগুলো সামনের দিকে ঝুঁকে কসরত দেখিয়েছে, শূন্যে ডিগবাজি দিয়ে ঠিকঠাক হাঁটু গেড়ে বসেছে, আবার ঘুরে ঘুরে লাফিয়ে নেচেছে। সবচেয়ে বড় কথা, একটি রোবটও পড়ে যায়নি।
এ প্রদর্শনীটি যেমন চমৎকার তেমনই অনেকের মনে প্রশ্নও জাগিয়েছে, এখন রোবট যদি নাচতে বা মার্শাল আর্ট করতে পারে তবে এদের আরও কী কী করার বাকি থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের অবশ্য এ নিয়ে মিশ্র মতামত রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এসব রোবটের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে এবং এ পুরো প্রদর্শনীটিকে চীনা সরকারের প্রচারণার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
চীনের বেশ কয়েকটি রোবটিক্স কোম্পানির তৈরি এসব রোবট মানুষের পাশাপাশি কুংফু, কমেডি স্কেচ ও সুশৃঙ্খলভাবে তাল মিলিয়ে নাচের মাধ্যমে এদের দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও দেখে অনেকেই গত বছরে নববর্ষের অনুষ্ঠানের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। গতবারও রোবটের নাচ ছিল, তবে এবারের নড়াচড়া বা গতিবিধি ছিল আগের তুলনায় অসম্ভবরকম উন্নত।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কাইল চ্যান বলছেন, নিজেদের প্রযুক্তির শক্তি বিশ্বজুড়ে এবং দেশের মানুষের কাছে চমক হিসেবে তুলে ধরার জন্যই এ ধরনের প্রদর্শনী করেছে চীন সরকার।
“এআই মডেল বা কারখানার যন্ত্রপাতির মতো বিভিন্ন বিষয় সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। তবে মানুষের মতো দেখতে এসব রোবট চীনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক দৃশ্যমান উদাহরণ, যা সাধারণ মানুষ তাদের ফোন বা টেলিভিশনে সহজেই দেখতে পান।”
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাড়তে থাকা প্রযুক্তি লড়াইয়ের দিকে ইঙ্গিত করে কাইল চ্যান আরও বলেছেন, “এআই প্রযুক্তিতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সমানতালে লড়াই করলেও হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে চীন নিজেদের এগিয়ে থাকার দাবি করতে পারে, বিশেষ করে বড় পরিসরে উৎপাদনের ক্ষেত্রে।”
চীনের এ গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন অনুষ্ঠানের প্রতীকী গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন বৈশ্বিক প্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘স্টিলিয়ার টেকনোলজি অ্যান্ড মার্কেটিং’-এর রোবোটিক্স প্রধান গেয়র্গ স্টিলিয়ারও।
স্টিলিয়ার বলেছেন, “বিশ্বের অন্যান্য জায়গার তুলনায় চীনের এ অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব হচ্ছে, সরকারের শিল্পনীতি বা লক্ষ্য কীভাবে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে বিনোদন বা প্রদর্শনী হিসেবে পৌঁছে যায় তা এখানে স্পষ্ট দেখা গেছে।”
গত বছরের পারফরম্যান্সের সঙ্গে এবারের তুলনা করতে গিয়ে স্টিলিয়ার বলেছেন, গেলবার রোবটের হাঁটাহাঁটি, মোচড়ানো বা লাথি মারার মতো খুব সাধারণ ও সীমাবদ্ধ কিছু নড়াচড়া দেখেছিলেন দর্শকরা। তবে এবার চীনের রোবট প্রযুক্তির উন্নতির বড় প্রমাণ হচ্ছে ‘অনেকগুলো হুবহু একই রকম রোবটকে একসঙ্গে তাল মিলিয়ে, স্থিতিশীলভাবে ও প্রতিটি জয়েন্টের নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালনা করার ক্ষমতা’।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়েও সতর্ক করে স্টিলিয়ার বলেছেন, “মঞ্চে ভালো পারফর্ম করা মানেই এই নয় যে, এগুলো বাস্তব পরিস্থিতিতেও কাজের জন্য পুরোপুরি তৈরি।”
তার মতে, এসব রোবট নির্দিষ্ট এক রুটিন শত শত বা হাজার হাজার বার প্র্যাকটিস করার পর এমন ফলাফল দেখিয়েছে। কেউ চাইলে হঠাৎ করে এদের দিক পরিবর্তন করতে বা একদম নতুন কোনো কাজ করতে বলতে পারবেন না।
“এসব নাচের মুদ্রার পেছনে আশপাশের পরিবেশ বোঝার সক্ষমতা খুব কম লাগে। এগুলো শেখানো কিছু অঙ্গভঙ্গি নকল করা ও ভারসাম্য বজায় রাখার কাজ মাত্র। কোনো অগোছালো বা প্রতিকূল পরিবেশে কাজের জন্য যে নির্ভরযোগ্যতা প্রয়োজন তার সঙ্গে এর সম্পর্ক খুব সামান্য। এসব রোবটের চলাফেরা করার সক্ষমতায় যতটা উন্নতি হয়েছে হাতের আঙুল বা সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতায় ততটা হয়নি।”
এসব সর্বাধুনিক প্রজন্মের রোবট প্রদর্শনী চীনের বড় ধরনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ফুটিয়ে তোলে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চীনে চার লাখ ৫১ হাজার সাতশটি স্মার্ট রোবটিক্স কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে, যাদের মোট মূলধনের পরিমাণ প্রায় প্রায় ৯৩ হাজার ২১৬ কোটি ডলার।
চীন সরকারের বড় সব প্রকল্প, যেমন ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ ও ‘১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’র মাধ্যমে রোবটিক্স ও এআই বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
আর্থিক সেবা কোম্পানি ‘মরগান স্ট্যানলি’র পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে চীনে হিউম্যানয়েড রোবটের বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে ২৮ হাজার ইউনিটে পৌঁছাবে।
ইলন মাস্কের ধারণা, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে চীনা বিভিন্ন কোম্পানি। এখন মার্কিন ইভি নির্মাতা টেসলাকে এআই ও তাদের বিশেষ রোবট ‘অপটিমাস’-এর দিকে বেশি মনোযোগী করে তুলছেন মাস্ক।
গত মাসে মাস্ক বলেছিলেন, “চীনের বাইরের মানুষ চীনকে অবমূল্যায়ন করে। তবে চীন আসলে পরবর্তী ধাপের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।”
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনি’র প্রযুক্তির অধ্যাপক ম্যারিনা ঝাং বলেছেন, এ ধরনের প্রকাশ্য প্রদর্শনী সম্ভবত চীনের উৎপাদন খাতে নতুন এক ধাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, “যেখানে সাশ্রয়ী দরের অ্যাসেম্বলিং বা সাধারণ কাজ থেকে সরে এসে উচ্চমানের স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে এই রোবটিক্স।”
