এআই টুথব্রাশ বানিয়েছে ডাইসন, এতে ক্যামেরাও আছে!
ব্রাশ করার সময় মুখের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করে দাঁতের ফাঁকা স্থান শনাক্ত ও সেখানে মাউথওয়াশ স্প্রে করে ক্ষতিকর প্লাক ও ময়লা পরিষ্কার করে দেবে এই টুথব্রাশ।
ডাইসনের নাম শুনলে সবার আগে চোখে ভাসে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের কথা। তবে, ব্রিটিশ এই কোম্পানি এবার নজর দিচ্ছে মানুষের মুখের ভেতর। কাজ ওই একই, সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
হ্যাঁ, প্রতিদিনের দাঁত পরিষ্কারের কাজে অভিনব পরিবর্তন আনতে ক্যামেরা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিওয়ালা টুথব্রাশ বাজারে এনেছে ডাইসন।
প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার জেমস ডাইসনের নির্দেশনায় তৈরি টুথব্রাশটি ব্রাশ করার সময় মুখের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করে নিজে থেকেই দাঁতের ফাঁকা স্থান শনাক্ত করে সেখান থেকে মাউথওয়াশ স্প্রে করে ক্ষতিকর প্লাক ও ময়লা পরিষ্কার করে দেবে।
দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণা ও প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ লাইন কোডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ডাইসন ক্যামেরাজেট’ নামের উদ্ভাবনটি ব্যবহারকারীদের দাঁতের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
ব্রাশটিতে ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ ক্যামেরা, যা মিনিটে ৫৮ হাজার বার কম্পনে মুখের ভেতরের অংশ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে পারে। ব্রাশ করার সময় দাঁতের ফাঁকা অংশ শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল্ট-ইন পানি থেকে মাউথওয়াশ স্প্রে করে দাঁতের প্লাক পরিষ্কার করে দেবে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের নতুন উদ্ভাবন নিয়ে ইতিবাচক মেজাজে কথা বলেন স্যার জেমস। ভবনটির লিফট নষ্ট থাকায় ছয় তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হলেও তার উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ডাইসনের ৬৬১ জন প্রকৌশলীর টানা গবেষণার পর আলোর মুখ দেখেছে এ ক্যামেরাজেট। পণ্যটির নামের সঙ্গে যোগ রয়েছে মোট ৩৮টি পেটেন্ট।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যাগ বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে ব্লেডহীন ফ্যান তৈরি কর্মজীবনের বড় অংশজুড়ে দৈনন্দিন বিভিন্ন পণ্যকে নতুন রূপ দেওয়ার জন্য পরিচিত ডাইসন। তবে ডেন্টাল কেয়ারে প্রবেশ একদমই ভিন্ন এক পদক্ষেপ।
এমন উদ্ভাবনের প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে ডাইসন বলেছেন, “বিষয়টি আসলে খুবই সাধারণ। সবার মতো আমিও দাঁতের সঠিক যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করি। ব্রাশ, ফ্লস ও ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহারের পরও দেখা যেত প্রতিবার হাইজেনিষ্টের কাছে গেলে তিনি যেন পিকঅ্যাক্স বা খোদাই করার হাতিয়ার দিয়ে শক্ত ময়লা সরাতে লেগে পড়তেন।”
তিনি অনুধাবন করেন, সাধারণ মানুষ দাঁত ফ্লস করতে তেমন পছন্দ করে না।
“প্রতি ১০ জনের মধ্যে কেবল ১ জন হয়ত নিয়মিত ফ্লস করেন। বেশিরভাগ মানুষই ব্রাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেন না।”
এ চিন্তা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্রাশ করার সঙ্গেই যদি দাঁতের ফাঁকে মাউথওয়াশের স্প্রে ফায়ার করা যায় তবে একসঙ্গে দুটি সমাধানই সম্ভব।
বাস্তব ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্যামেরাজেটের সাহায্যে ব্রাশ ও ফ্লসিংয়ের এ যুগলবন্দি মুখকে পরিষ্কার ও সতেজ অনুভূতি দেয়। তবে ব্যবহারের সঠিক কৌশল না জানা থাকলে আশপাশে কিছুটা তরল ছিটাতে পারেন।
ডাইসনের প্রকৌশলীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মুখের ভেতরে অনবরত নড়াচড়া করা ব্রাশটির মাধ্যমে রিয়াল-টাইমে দাঁতের ফাঁকা জায়গা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা।
জেমস ডাইসন বলেছেন, “অন্ধকার মুখের ভেতরে দেখতে আলোর প্রয়োজন ও ফাঁকটা কোথায় তা চিহ্নিত করতে ক্যামেরার দরকার। এরপর ঠিক সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় স্প্রে করতে হয়। শুনতে সহজ মনে হলেও কাজটি জটিল। কারণ ব্রাশ হেডটি প্রচণ্ড দ্রুত গতিতে কাঁপতে থাকে। সিগনাল পাঠিয়ে স্প্রে করার আগেই ব্রাশ স্থানটি পেরিয়ে যায়। ফলে ক্যামেরাটিকে আগে থেকেই বুঝতে হয় ফাঁকা জায়গাটি আসছে ও কত দ্রুত আসছে।”
এ জটিল প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হয়েছে বড় আকারের সফটওয়্যার কোডিং। ডাইসন বলেছেন, ডিভাইসটি পরিচালনায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ লাইন কোড ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে ঠিক সময়ে সঠিক স্প্রে করা সম্ভব হয়।
অন্যান্য প্রচলিত ওয়াটার পিকে সাধারণত ব্যবহৃত হয় চিকন সূঁচের মতো সুচালো ওয়াটার জেট, যা জেমস ডাইসনের মতে প্লাক পরিষ্কারের বদলে উল্টো তা ছিদ্র করে দেয়।
সেই জায়গায় ক্যামেরাজেটে ব্যবহৃত হয়েছে এক ধরনের শঙ্কু আকৃতির স্প্রে, যা দাঁতের ওপর কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি ছাড়াই দ্রুত ময়লা পরিষ্কার করে।
কম্পনশীল ব্রাশের স্পিড ও ক্যামেরার দৃষ্টিপথের সামঞ্জস্য ধরে রাখাও বড় বৈজ্ঞানিক লড়াই। ডাইসন বলেছেন, “আমরা লাইট ও ক্যামেরার ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে এমন এক ধরনের সূক্ষ্ম সময়গত পার্থক্য রেখেছি যাতে তা আলো সরবরাহ করে ফ্রেম ধরতে পারে।”
এ ছাড়া, প্রচলিত টুথপেস্টের অতিরিক্ত ফেনার কারণে যাতে ক্যামেরার দেখার পথ বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য ডাইসনের প্রকৌশলীরা ফেনামুক্ত বিশেষ ধরনের টুথপেস্টের ফর্মুলাও উদ্ভাবন করেছেন।
ক্যামেরার দৃশ্যপট নিশ্চিত করার জটিলতাটি তুলে ধরে ডাইসন বলেছেন, “অন্ধকারে মুখগহ্বরের মেঝের নিচে ও টুথপেস্ট, ফেনা, থুতুর মাঝখানে সঠিকভাবে দেখতে পারা অনেকটা যেন যুদ্ধের মত, যা অনেকটা পানিপূর্ণ বালতিতে আইফোন ডুবিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে সবকিছু নিখুঁতভাবে শুট করার চেষ্টার মতই কঠিন।
“ঠিক যেমন উড়ন্ত পাখি শিকারের সময় পাখিকে নয়, পাখির ভবিষ্যৎ গতিপথ লক্ষ্য করে সামনে ফায়ার করতে হয়, টুথব্রাশের প্রযুক্তিকেও তেমনই আগামী স্পটের গতি ও রূপ আগে থেকে ধারণ করে স্প্রে করতে হয়েছে।”
প্রযুক্তির এ ধারায় রোবোটিক সলিউশনের উদাহরণ দিয়ে জেমস ডাইসন বলেছেন, “প্রযুক্তিটি হোম রোবটের মতো, যা প্রতিনিয়ত আপনার মুখের গঠন চিনে নিতে থাকে ও দিন দিন দাঁতের গ্যাপ শনাক্তকরণে আরও পরিপক্ক হয়ে ওঠে।”
নতুন উদ্ভাবনের চড়া দাম ও বাজারজাতকরণ নিয়েও মন্তব্য করেছেন জেমস ডাইসন। ক্যামেরাওয়ালা এ প্রিমিয়াম টুথব্রাশটির দাম ৪১৯.৯৯ পাউন্ড।
দামের বিষয়ে ডাইসন বলেছেন, “আমি বলব না যে আমি খরচের কথা ভাবি না। তবে সম্পূর্ণ নতুন ও অনন্য কাজের জন্য তৈরি ডিভাইসের প্রাথমিক খরচ একটু বেশিই হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভাবলে তা ব্যবহারকারীদের ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার হাজার হাজার পাউন্ড অর্থের খরচ ও কায়িক কষ্ট একেবারেই কমিয়ে আনবে।
“আমি আগে থেকেই গ্যারান্টি দিতে পারি না কোনটা সফল হবে, যেমন আমাদের ইলেকট্রিক গাড়ি প্রজেক্টটি কখনও বাজারে আসেনি। তবে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে ঝুঁকি নেওয়া ও নিজের আশার ওপর ভরসা করা।”
অনুষ্ঠানে একইসঙ্গে ঘর মোছার সুবিধাওয়ালা নতুন ভ্যাকুয়াম রোবট, আধুনিক তারওয়ালা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, হেয়ার কেয়ার ও বাতাস পরিষ্কারের এয়ার পিউরিফায়ারেরও উন্মোচন করেছে ডাইসন।
প্রযুক্তির এসব নতুন আয়োজনকে ছাপিয়ে জেমস ডাইসনের উদ্ভাবনী ক্যামেরাওয়ালা টুথব্রাশই আপাতত বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
