এশিয়ার দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলার ক্লাবে স্যামসাং
কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বর্তমানে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং একদিনে তা সর্বোচ্চ লাভের নতুন রেকর্ডও গড়তে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জোয়ারে শেয়ার বাজারে নজিরবিহীন উল্লম্ফনের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরীয় জায়ান্ট স্যামসাংয়ের বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে।
বুধবার কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় এ মাইলফলক স্পর্শ করেছে স্যামসাং।
চিপের ক্রমাগত চাহিদা ও অ্যাপলের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন চুক্তির খবরে স্যামসাংয়ের এ অভাবনীয় উত্থান তাদের এশিয়ার দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে পৌঁছে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে নাম লেখানো এশিয়ার প্রথম কোম্পানি ছিল তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা টিএসএমসি।
ফ্যাক্টসেট-এর তথ্য অনুসারে, ২৬ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটি প্রথমবারের মতো এ মাইলফলক স্পর্শ করেছিল স্যামসাং।
কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বর্তমানে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং একদিনে তা সর্বোচ্চ লাভের নতুন রেকর্ডও গড়তে যাচ্ছে।
গেল সপ্তাহে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের প্রথম প্রান্তিকের রেকর্ড আয়ের রেশ ধরেই শেয়ার বাজারে এ উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।
কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা আট গুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭.২ ট্রিলিয়ন ওন, আর মোট আয় রেকর্ড ১৩৩.৯ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওন পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের পুরো বছরে স্যামসাংয়ের মোট মুনাফা ছিল ৪৩.৬ ট্রিলিয়ন ওন, অথচ ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই সেই অংক ছাড়িয়ে বর্তমানে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫৭.২ ট্রিলিয়ন ওন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গ প্রতিবেদনে লিখেছে, স্যামসাংয়ের এ উন্নতির পেছনে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। অ্যাপল তাদের ডিভাইসের চিপ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরির বিষয়ে স্যামসাং ও ইনটেলের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। যার মাধ্যমে অ্যাপল তাদের দীর্ঘদিনের চিপ সরবরাহকারী কোম্পানি টিএসএমসি’র ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আরেক চিপ জায়ান্ট ‘এসকে হাইনিক্স’-এর শেয়ারের দামও ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর প্রভাবে দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘কোস্পি’ ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে তা প্রথমবারের মতো সাত হাজার পয়েন্টের মাইলফলক পেরিয়েছে।
উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা ‘হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ বা এইচবিএম চিপের বিক্রি স্যামসাংয়ের মুনাফা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এ বাজারে স্যামসাংকে এখনও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ তারা এইচবিএম চিপের বাজারের প্রাথমিক আধিপত্য প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি এসকে হাইনিক্সের কাছে হারিয়েছে।
বর্তমানে দ্রুত বেড়ে ওঠা এআই মেমোরি খাতে এসকে হাইনিক্সের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে স্যামসাং।
গেল ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানিটি দাবি করেছে, বিশ্বের প্রথম কোম্পানি হিসেবে তারা ‘এইচবিএম৪’ চিপের ব্যাপক উৎপাদন শুরু এবং এরইমধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রাহকদের কাছে তা সরবরাহ করতে শুরু করেছে।
‘এইচবিএম৪’ হচ্ছে হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি প্রযুক্তির ষষ্ঠ ও সর্বশেষ সংস্করণ। মার্কিন চিপ জায়ান্ট এনভিডিয়া’র আসন্ন ‘ভেরা রুবিন’ এআই আর্কিটেকচারে এসব চিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা ডেটা সেন্টারের উন্নত এআই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের শেয়ারের এ ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ এআই সংশ্লিষ্ট মেমোরি চিপের আকাশচুম্বী চাহিদা, বাজারে চিপের সীমিত সরবরাহ ও হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি চিপের ক্ষেত্রে স্যামসাংয়ের সক্ষমতা বেড়ে যাওয়া।
‘মর্নিংস্টার’-এর প্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্লেষক ইউ জিং জি বলেছেন, “বর্তমানে ডির্যাম ও ন্যান্ড মেমোরি চিপের সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ এআই প্রযুক্তির বড় ব্যান্ডউইথ ও স্টোরেজ প্রয়োজন মেটাতে অনেক পরিমাণে মেমোরি চিপের দরকার হয়।”
ডির্যাম হচ্ছে দ্রুতগতির এক ধরনের মেমোরি, যা প্রসেসর কাজ করার সময় সাময়িকভাবে তথ্য জমা রাখে। অন্যদিকে, ন্যান্ড হচ্ছে কিছুটা ধীরগতির স্টোরেজ চিপ, যা ডিভাইস বন্ধ থাকলেও তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারে।
বর্তমানে এইচবিএম বাজারের প্রায় ৫৫ শতাংশ এসকে হাইনিক্সের দখলে এবং স্যামসাংয়ের দখলে রয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে বিনিয়োগকারীরা এ ব্যবধান নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ ডির্যাম চিপের মুনাফা এইচবিএম-এর মুনাফাকেও ছাড়িয়েছে, যা স্যামসাংয়ের মতো বড় উৎপাদকদের জন্য সুখবরই বটে।
