০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

গুগলের এআই সাম্রাজ্য বাড়ছে, আর চলে যাচ্ছেন নেপথ্য কারিগররা

উদ্ভাবনের একদম প্রথম সারিতে থাকা এআই ল্যাব ও উদীয়মান বিভিন্ন স্টার্টআপের কাছে নিজেদের সেরা মেধা ও মূল গবেষকদের ক্রমেই হারাচ্ছে গুগল।

গুগলের এআই সাম্রাজ্য বাড়ছে, আর চলে যাচ্ছেন নেপথ্য কারিগররা
ডেমিস হাসাবিস গুগল ডিপমাইন্ডের সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান হওয়ার ঘোষণার পর শেয়ারের দাম কমেছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Aug 2026, 12:25 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

বাণিজ্যিক সাফল্য ও রেকর্ড রাজস্বের চূড়ায় থেকেও গুগলে যেন বাজছে বিদায়ের সুর। একদিকে তাদের এআই সাম্রাজ্য ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে কোম্পানিটি হারাচ্ছে সেইসব বিজ্ঞানী ও গবেষকদের, যাদের হাত ধরে আজকের এই এআই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল।

আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দৌড়ে গুগল এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? এমন প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গিভেদে উত্তরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এক পক্ষ মনে করছেন, নতুন এই বিপ্লবে টেক জায়ান্ট গুগলের অবস্থানই সবচেয়ে সুবিধাজনক ও শক্তিশালী। তবে অন্য পক্ষের মত, উদ্ভাবনের একদম প্রথম সারিতে থাকা এআই ল্যাব ও উদীয়মান বিভিন্ন স্টার্টআপের কাছে নিজেদের সেরা মেধা ও মূল গবেষকদের ক্রমেই হারাচ্ছে তারা।

গত দুই সপ্তাহের ঘটনাবলীতে এই বৈপরীত্য বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোম্পানিটি তাদের ক্লাউড বিভাগ থেকে ৮২ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির রেকর্ড খবর প্রকাশের পরপরই বড় ধাক্কা আসে এআই বিভাগে।

দীর্ঘ ২৭ বছর টানা সেবা দেওয়ার পর কোম্পানিটি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন গুগলের প্রধান বিজ্ঞানী জেফ ডিন।

২০১৭ সালের বহুল আলোচিত ‘ট্রান্সফর্মার’ গবেষণাপত্রের জন্মদাতা গুগল, যা আজকের জেনারেটিভ এআই বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। সেই গুগলের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসার একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে: বিনিয়োগ আসলে কোথায় করা উচিত? 

নতুন সারির প্রযুক্তি গবেষণায় বিপুল আগাম অর্থের প্রয়োজন হয়, যার ভবিষ্যৎ লাভ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যায়। অন্যদিকে, ক্লাউড ব্যবসা থেকে খুব দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে আয় আসছে, যা টেক জায়ান্ট অ্যামাজন বা মাইক্রোসফটের তুলনায় বেশি গতিশীল।

২০১৭ সালের বহুল আলোচিত ‘ট্রান্সফর্মার’ গবেষণাপত্রের জন্মদাতা গুগল, যা আজকের জেনারেটিভ এআই বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ছবি: রয়টার্স

২০১৭ সালের বহুল আলোচিত ‘ট্রান্সফর্মার’ গবেষণাপত্রের জন্মদাতা গুগল, যা আজকের জেনারেটিভ এআই বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল

অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী সুন্দার পিচাই গেল মাসের আর্নিংস কলে বলেছেন, বিশ্বের শীর্ষ ‘ফরচুন ১০০’ তালিকার ৯০ শতাংশ কোম্পানিই এখন ‘জেমিনাই এন্টারপ্রাইজ’ ব্যবহার করছে, যা ক্লাউড গ্রাহকদের কাছে এআই সেবা বিক্রিতে গুগলের বড় সক্ষমতারই প্রকাশ।

তবে ‘থিওরি ভেঞ্চার’-এর প্রতিষ্ঠাতা টমাস তুঙ্গুজ বলেছেন, কর্পোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদার জন্য যে সবসময়ই একদম শীর্ষ সারির মডেল প্রয়োজন তা এখন আর সত্য নয়।

“আমি মনে করি এআইয়ের ক্ষেত্রে আমরা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছি, বিশেষ করে হোয়াইট-কলার বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে, যেখানে মাঝারি বা ভালো মানের অনেক মডেলই চাহিদা মেটাতে পারে। এসব মডেলের পরবর্তী বিবর্তন সম্ভবত সেইসব ক্ষেত্রে বেশি সহায়ক হবে, যেখানে আপনার উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা কম্পিউটারের প্রয়োজন রয়েছে।”

এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুগলের এই ‘অল-ইন-ওয়ান’ পদ্ধতির কারণেই ২০২৫ সালে সব বড় প্রযুক্তি কোম্পানিকে পেছনে ফেলে ৬৫ শতাংশ শেয়ার দর বাড়ার পর এ বছরও শেয়ারের দাম ১৬ শতাংশ বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গুগলের পথচলা কিছুটা কঠিনই ছিল। মূলধনী খরচের উদ্বেগ নিয়ে সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর অ্যালফাবেটের শেয়ারের দরে পতন ঘটে।

বুধবার জেফ ডিনের বিদায় ও ডেমিস হাসাবিস গুগল ডিপমাইন্ডের সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান হওয়ার ঘোষণার পর শেয়ারের দাম আরও কিছুটা কমেছে।

ওয়াল স্ট্রিটের মনোভাব সাধারণত গুগলের পক্ষে থাকলেও কোম্পানিটির ভেতরের পরিবেশ সবার জন্য উদযাপনের ছিল না।

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র বলছে, নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী গবেষণা ও প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা না পেয়ে অনেক গবেষক ক্ষুব্ধ। তাদের চোখের সামনেই গুগল ক্লাউড তাদের নিজস্ব ‘টেনসর প্রসেসিং ইউনিট’ বা টিপিইউ চিপ বাইরের কোম্পানি, যেমন অ্যানথ্রপিকের কাছে বিক্রি করছে।

টিপিইউ হচ্ছে গুগলের নিজস্ব তৈরি এআই প্রসেসর, যা চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার জিপিইউ-এর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে।

পাশাপাশি, গুগলের প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও গবেষকদের বিরক্তির অন্যতম কারণ। কোনো গবেষণাকে চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তর করতে এখানে অনেকগুলো ধাপে প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক বা আরও নতুন স্টার্টআপগুলোকে এআই গবেষক ও ডেভেলপারদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যালেন্স শিট সামলানোর চেয়ে ল্যাবের গবেষণাকেই বেশি অগ্রাধিকার দেন।

জেফ ডিন তার সহকর্মী ও গুগলের প্রযুক্তিবিদ সঞ্জয় ঘেমাওয়াত, ওরিওল ভিনিয়ালস ও কুওক লে’কে সঙ্গে নিয়ে ‘ডিসকভারি লুপ’ নামে একটি নতুন স্টার্টআপ শুরু করতে গুগল ছাড়ছেন।

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ ডিন লিখেছেন, গুগল-সমর্থিত স্টার্টআপটি জনকল্যাণমূলক কর্পোরেশন হবে, যার উদ্দেশ্য ‘উদ্ভাবন ও অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে মেশিন লার্নিং, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলকে স্বয়ংক্রিয় করা’।

তাদের এই বিদায় ঘটেছে গুগলের অন্য গবেষকদের পথ ধরেই। তাদের মধ্যে রয়েছেন নোয়াম শাজির, যিনি জেনারেটিভ এআইয়ের মূল ভিত্তি ‘অ্যাটেনশন ইজ অল ইউ নিড’ গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ছিলেন। এর মাধ্যমে ২০১৭ সালের সেই ঐতিহাসিক পেপারের আটজন লেখকের সবাই এখন গুগল ছাড়লেন।

প্রায় ৩০০ কোটি ডলার খরচ করে গুগলে ফিরিয়ে আনার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জুনে নোয়াম শাজির ওপেনএআই’তে যোগ দিয়েছেন। তার বিদায়ের পরপরই নোবেলজয়ী জন জাম্পারও ডিপমাইন্ড ছেড়ে অ্যানথ্রপিকে যোগ দেন।

‘ইতিহাসের অংশ হওয়ার তাগিদ’

ডি এ ডেভিডসনের বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞ গিল লুরিয়া গুগলের এই শীর্ষ মেধা হারানোর প্রবণতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন।

অ্যালফাবেটের শেয়ার ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে লুরিয়া বলেছেন, “তারা কিন্তু এআই বাণিজ্যীকরণে আগ্রহী নন। তারা মূলত ইতিহাসের অংশ হতে চান। আর এ কারণেই তারা অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই বা অন্য কোনো উদীয়মান স্টার্টআপকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন, যেখানে তারা ইতিহাসের অংশ হওয়ার এই স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।”

গুগলের ভেতরে যে কয়জন হাতে গোনা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলোর সমালোচনা করার সাহস দেখিয়েছেন, জেফ ডিন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

এ বছরের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন অ্যানথ্রপিক’কে ‘সাপ্লাই-চেইন ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানান তিনি। ডিন বলেছিলেন, সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো মার্কিন এআই শিল্পকেই ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

তবে প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে ডিনের আসল অবদান আরও গভীর। তিনি গুগলের সেই প্রারম্ভিক কম্পিউটিং পরিকাঠামো ও নিউরাল নেটওয়ার্ক সিস্টেম তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন, যা গুগলকে আধুনিক এআই দুনিয়ায় প্রথম সারির ‘নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

অন্যদিকে, ২০১০ সালে ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং চার বছর পর তা গুগলের কাছে বিক্রি করে দেওয়া ডেমিস হাসাবিস এবার কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পদের পাশাপাশি অ্যালফাবেটের নবগঠিত ‘চিফ সায়েন্টিস্ট’ পদে আসীন হচ্ছেন। সেখানে তার মূল নজর থাকবে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও এজিআই-এর সামাজিক প্রভাবের ওপর।

পাশাপাশি ডিপমাইন্ড থেকে জন্ম নেওয়া এআইভিত্তিক ওষুধ গবেষণা কোম্পানি ‘আইসোমরফিক ল্যাবস’-এও তিনি এখন থেকে বাড়তি সময় দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

ডিপমাইন্ডের প্রযুক্তি প্রধান ও অ্যালফাবেটের চিফ এআই আর্কিটেক্ট কোরাই কাভুকচুওগলু এখন থেকে বিভাগটির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী জেমিনাই মডেল উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন।

ডিপমাইন্ড দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, হাসাবিস গত এক বছর ধরেই কাভুকচুওগলুর ওপর মডেল তৈরি ও জেমিনাইয়ের বড় বিভিন্ন এআই মডেল বাজারে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো ছেড়ে দিচ্ছিলেন। এই সময়ে হাসাবিস ল্যাবের দৈনন্দিন কাজ থেকে কিছুটা সরে এসে এআই নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন।

এদিকে, গুগলের ভেতরের অসন্তোষের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে কম্পিউটিং সক্ষমতা বা ‘কম্পিউট’। বিশ্বের যে কোনো কোম্পানির চেয়ে ডেটা সেন্টার, চিপ ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোয় গুগল সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালছে।

এরপরও মূল সক্ষমতার টানাটানি রয়েই গেছে। নতুন কোনো মডেল ট্রেইনিং দেওয়া, নিজস্ব পণ্যে সেবা দেওয়া বা ক্লাউড গ্রাহকদের চুক্তি মেটানো প্রতিটি কাজের জন্য টিপিইউ বরাদ্দের মানে অন্য একটি জরুরি অগ্রাধিকারকে পিছিয়ে দেওয়া।

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সুত্রগুলো বলছে, কম্পিউট ব্যবহারের স্বাধীনতা না পেয়ে গবেষকদের ক্ষোভ তখন চরম রূপ নেয় যখন গুগল তাদের নিজস্ব জেমিনাইয়ের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিকের মতো ল্যাবগুলোতে বড় পরিকাঠামো সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অন্য সূত্রের মতে, গুগলের গবেষণা, মডেল ট্রেইনিং, সার্চ ও জেমিনাইয়ের মতো পণ্য পরিচালনা ও ক্লাউড গ্রাহকদের সামলানোর জন্য চাহিদার দীর্ঘমেয়াদী প্রাক্কলন করা থাকে। বছরের পর বছর আগেই এ চাহিদা নির্ধারণ করা হলেও কোনো পণ্যের চাহিদা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়লে বা অগ্রাধিকারের পরিবর্তন হলে স্বল্পমেয়াদে সক্ষমতার এই বণ্টন এদিক-ওদিক হতে পারে।

গত দুটি আয়ের হিসাবে সুন্দার পিচাই বলেছেন, ক্লাউড গ্রাহকদের চাহিদা বাড়লেও গুগলের কাছে ডিপমাইন্ডের কম্পিউট চাহিদাই সবার আগে।

জুলাইয়ে টিপিইউ বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, এজিআই তৈরির লড়াইয়ে শীর্ষে থাকতে প্রয়োজনীয় কম্পিউট সুনিশ্চিত করাই তাদের ‘প্রথম অগ্রাধিকার’ ও এই কাজটিই তাদের ‘সব মূল ভিত্তির ভিত্তি’।

পিচাই আরও বলেছেন, গ্রাহকদের চাহিদা ও পণ্য চালনার কম্পিউট চাহিদার সঙ্গে লড়াইয়ের মূল গবেষণার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়েই গুগল এখন সরাসরি থার্ড পার্টির ডেটা সেন্টারে টিপিইউ বসানোর কাজ শুরু করেছে।

এদিকে, এ অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকে বেশ স্বাভাবিক বলেই মনে করেন ‘নাইলস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও গুগলের শেয়ারহোল্ডার ড্যান নাইলস।

নাইলসের ভাষ্য, “গুগলের অসংখ্য ধরনের ব্যবসা রয়েছে। ফলে কাকে কতটুকু সম্পদ দেওয়া হবে সেই হিসাব তাদের মেলাতেই হয়। আর এমন পরিস্থিতিতে দিনশেষে কাউকে না কাউকে অখুশি থাকতেই হবে।”

ডিপমাইন্ড ও ক্লাউড বিভাগকে আরও কাছাকাছি আনার প্রয়াস

এ বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এ ডেমিস হাসাবিস ও গুগল ক্লাউডের প্রধান টমাস কুরিয়ান যৌথভাবে এক মঞ্চে হাজির হয়ে করপোরেট পর্যায়ের এআই ব্যবহার ও পণ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গুগল ক্লাউডের অভ্যন্তরীণ পরিচালনার বিষয়টিকে কাছ থেকে দেখেছেন এমন একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, কোম্পানি দুটির স্বতন্ত্র পরিচালনা শৈলী ও হাসাবিসের এতদিনকার স্বতন্ত্র দূরত্বের কথা বিবেচনা করলে এক মঞ্চে তাদের এই উপস্থিতি ছিল বেশ অভূতপূর্ব দৃশ্য।

তার মতে, এ যৌথ উপস্থিতি থেকে ইঙ্গিত মেলে, হাসাবিস এখন গুগলের এআই প্রযুক্তির করপোরেট প্রয়োগে, বিশেষ করে কোডিং ও কাস্টমার সার্ভিসের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে গুগলের মূল গবেষণা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে এক সুতায় বাঁধার যে আয়োজন চলছে এটা তারই প্রতিফলন।

তবে এর পরের মাসগুলোতে গুগলের বিভিন্ন এআই মডেল নিয়ে বেশ কিছু বিপত্তি তৈরি হয়। যার মধ্যে বড় ঘটনাটি ছিল তাদের নতুন ফ্ল্যাগশিপ মডেল ‘জেমিনাই ৩.৫ প্রো’-এর উন্মোচন পিছিয়ে যাওয়া। ঠিক সেই সময়েই টমাস কুড়িয়ানের পরিচালনায় ক্লাউড ব্যবসায়ে দেখা যায় ইতিহাসের সবচেয়ে রেকর্ড পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি।

ওরাকলের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী টমাস কুরিয়ান ২০১৯ সাল থেকে গুগল ক্লাউডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কনজিউমার বা সাধারণ ইন্টারনেট সেবায় একক আধিপত্যের জন্য পরিচিত গুগলের ভেতরেই তিনি গড়ে তুলেছেন সফল ও চাঙ্গা এক করপোরেট সেলস টিম।

গুগল ক্লাউড বর্তমানে নিজস্ব এআই চিপ ডিজাইন, নিজস্ব বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং বিভিন্ন মডেল, ডেটাবেইস, সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যার’সহ এআই এজেন্ট তৈরির নানা টুল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে।

এ বিশেষ কৌশলের কারণে এআইয়ের বড় বাজার চাহিদা থেকে আয় করার বহুমুখী পথ খুলে গেছে গুগলের সামনে।

একদিকে তারা ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন ল্যাবের কাছে নিজেদের ক্লাউড অবকাঠামো বিক্রি করে মুনাফা করতে পারছে, অন্যদিকে করপোরেট গ্রাহকদের কাছে নিজস্ব জেমিনাই বিক্রি ও সার্চ, ইউটিউব বা ওয়ার্কস্পেসের মতো জনপ্রিয় সেবাগুলোতে এআই যোগের সুবিধাও পাচ্ছে।

জেনারেটিভ এআই উন্মাদনার প্রায় চার বছর পেরিয়ে এসে এখন একটি মূল প্রশ্ন সামনে উঠে এসেছে, গুগল কি নিজেই সবসময় বিশ্বের সেরা ও শীর্ষ এআই মডেল তৈরি করে যাবে, নাকি মডেল তৈরির বড় ব্যয়ভার অন্যান্য কোম্পানির ওপর ছেড়ে দিয়ে ক্লাউডের ব্যবসা গুটিয়ে আনাই তাদের জন্য বেশি লাভজনক হবে?

মে মাসে গুগলের বার্ষিক ডেভেলপার সম্মেলনে ডিপমাইন্ডের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কাভুকচুওগলু সংবাদমাধ্যম বলেছেন, গুগলের মূল লক্ষ্য এআই প্রযুক্তির সীমানা প্রসারিত করার পাশাপাশি এর কার্যসক্ষমতার উন্নয়ন ঘটানো।

তিনি বলেছেন, তাদের তৈরি ‘ফ্ল্যাশ’ মডেলটি বিশ্বের শীর্ষ সারির মডেলগুলোর সমান সক্ষমতা দেয়, অথচ অন্যান্য সমমানের মডেলের চেয়ে চারগুণ দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করে। ফলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক ও সাধারণ গ্রাহক সেবা উভয়ের কাছেই উন্নত এআই সুবিধা সহজে পৌঁছে দেওয়া গুগলের জন্য সম্ভব হচ্ছে।

‘থিওরি ভেঞ্চারস’-এর প্রতিষ্ঠাতা টমাস তুঙ্গুজ-এর মতো টেক বিনিয়োগকারী ড্যান নাইলসও মনে করেন, বেশিরভাগ বাণিজ্যিক কাজের জন্য একদম শীর্ষ সারির সুপার-পাওয়ারফুল এআই মডেলের কোনো বাস্তব প্রয়োজন নেই।

“দৈনন্দিন কাজের ৯০ শতাংশ মেটানোর জন্য বর্তমান বিভিন্ন এআই মডেল যথেষ্ট ভালো। এসব সাধারণ কাজের জন্য তো আপনার ফেরারি গাড়ির প্রয়োজন নেই, একটি সাধারণ টয়োটা গাড়ি দিয়েই ৯০ শতাংশ কাজের সমাধান হয়ে যায়।”

তবে যেসব বিজ্ঞানী ও মূল গবেষক ২০১৭ সালের ‘ট্রান্সফর্মার’-এর মতো এআই দুনিয়ায় পরবর্তী নতুন কোনো বৈপ্লবিক উদ্ভাবন ঘটাতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন তাদের কাছে এই ‘চলার মতো ভালো’ বা মাঝারি মানের পারফরম্যান্স কখনোই যথেষ্ট নয়।