কাদা-মাটিতে হাত মাখালে বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মিলছে সুফল
মাটি ও উদ্ভিদের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে আসা দেহের ত্বকের অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়ার একটি উপায়, যা কেবল ত্বকের জন্যই নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্যও ভালো।
মাটিতে হাত ছোঁয়ালে বা কাদা-মাখা প্রকৃতিতে সময় কাটালে ত্বকের উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্য বেড়ে যায়, যা কেবল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
বিবিসি লিখেছে, নিয়মিত পার্ক বা প্রকৃতির কাছাকাছি দীর্ঘ সময় হাঁটাহাঁটি করলেও অনেকেরই অভ্যাস প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কেবল চোখ জুড়িয়ে উপভোগ করা ও নিজের হাত পরিষ্কার রাখা, অর্থাৎ জুতা যতই কাদা লাগুক না কেন মানুষ পরিষ্কার হাতেই বাড়ি ফেরেন।
তবে ‘ফিনিশ এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর বাস্তুসংস্থান ও প্রকৃতি-স্বাস্থ্য গবেষক মিরা গ্রোনরুসের এক গবেষণা বলছে, গাছপালা, ঝোপঝাড় ও মাটির পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়ার সময় সেগুলোর সংস্পর্শে আসারও প্রয়োজন রয়েছে।
পরীক্ষামূলক এক গবেষণায় তিনি একদল মানুষকে কেবল ২০ সেকেন্ডের জন্য মাটি, পিট ও মস হাতে ঘষতে বলেছিলেন। তিনি দেখেছেন, ট্যাপের পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলার পরেও তাদের ত্বকে থাকা মাইক্রোব বা জীবাণুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, “খালি চোখে এসব হাত পরিষ্কার দেখালেও ত্বকের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন ছিল বড়।”
ত্বকে আরও ব্যাকটেরিয়া থাকার ধারণাটি অনেকের কাছে হয়ত অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে ত্বকে যখন বিভিন্ন ধরনের উপকারী মাইক্রোব বা জীবাণু সহাবস্থান করে তখন এরা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মানুষকে ক্ষতিকর রোগ তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, মাটি ও উদ্ভিদের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে আসা মানুষের ত্বকের মাইক্রোবায়াল বৈচিত্র্য বাড়ার সহজ একটি উপায়, যা কেবল ত্বকের জন্যই নয় বরং সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্যও ভালো।
কেবল বিশ সেকেন্ডের এ ছোট্ট বিরতি খুব বেশি সময় নয়। হাঁটার সময় গাছের ছাল স্পর্শ করা বা ঘাসের ওপর বসে পড়া খুব কঠিন কোনো কাজও নয়।
গবেষক মিরা গ্রোনরুসের ভাষ্য, দীর্ঘসময় ধরে প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা বেশি ফলদায়ক। কারণ তার ওই পরীক্ষায় উঠে এসেছে, ‘ত্বকের মাইক্রোবায়োটা খুব দ্রুতই এর আগের অবস্থায় ফিরে যায়’।
গবেষণার ফলাফলে ইঙ্গিত মিলেছে, প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বা ঘন ঘন শারীরিক সংস্পর্শ মানুষের ত্বক ও দেহের ভেতরের কার্যপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
মাটিতে হাত মাখিয়ে খেলাধুলা
মাটিতে হাত মাখিয়ে খেলাধুলা করা বা কাদা ছোঁয়া শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য কীভাবে উপকারী হতে পারে তা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
মধ্য ফিনল্যান্ডের ‘অরিংকোলিন্না ডে কেয়ার সেন্টার’-এর শিশুরা প্রতিদিন অন্তত কয়েক খেলার মাঠে কাটায়। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ, গাছে চড়া, বালির দুর্গ তৈরি ও মুঠো মুঠো মাটি ও কাঠের কুচি নিয়ে খেলা করে কাটানোর ফলে দিনের শেষে তাদের পুরো শরীর কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়।
গবেষকরা শিশুদের ত্বক, লালা ও মলের মাইক্রোব বা জীবাণু পরীক্ষার পাশাপাশি রক্ত ও চুলের নমুনা সংগ্রহ করছেন। এর মাধ্যমে তারা জানার চেষ্টা করছেন, খেলার মাঠে প্রকৃতিকে নিয়ে এলে দীর্ঘ তিন বছরে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়ে।
ফিনল্যান্ডের ৪৩টি ডে কেয়ার সেন্টারে চলমান ‘ভাহভিসতু’ নামের গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে অরিংকোলিন্না ডে কেয়ার সেন্টারে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিবেশ বিজ্ঞানী মারজা রোসলান্ডের সাম্প্রতিক একটি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এর আগে, ২০১৬-১৭ সালের দিকে মারজা রোসল্যান্ড এক ডে কেয়ারের উঠানে পিট ও গাছ লাগানোর বক্সসহ বনের মাটি এনে হাজির করেছিলেন।
শিশুরা সেখানে টানা ২৮ দিন নিয়মিত খেলা করার পর ও এক বছর বাদে তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ওপর এর প্রভাব পরিমাপ করেছিলেন তিনি। যে শিশুরা পাকা উঠানে খেলা করেছিল তাদের তুলনায় বনের মাটির সংস্পর্শে থাকা শিশুদের ত্বকে এক বছর পরেও বেশি ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা গেছে।
ত্বকের সুস্বাস্থ্যের জন্য এ বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ। মারজা রোসল্যান্ড বলেছেন, ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়লে রোগ তৈরিকারী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, যা পুরো মাইক্রোবায়াল সম্প্রদায়কে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।
“রোগ বা ইনফেকশন হচ্ছে একনায়কতন্ত্রের মতো, আর সুস্থ ত্বক হল গণতন্ত্রের মতো।”
তার গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা বনের মাটিতে খেলা করার পর তাদের ত্বকে ক্ষতিকর প্যাথোজেনের উপস্থিতি কমেছে। যার মূল কারণ, অন্যান্য উপকারী মাইক্রোব বা জীবাণুর প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য সেইসব ‘খারাপ’ ব্যাকটেরিয়াকে কোণঠাসা করে রাখে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আশপাশে অন্যকিছুর পরিমাণ এত বেশি থাকে যে, ক্ষতিকর জীবাণুদের বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।”
সুস্থ ত্বক, সুস্থ দেহ
ত্বকের যত্ন নেওয়া ও মাটির সংস্পর্শে আসার সুফল কেবল ত্বকের লাবণ্যেই আটকে নেই, এর প্রভাব দেহের ভেতর পর্যন্ত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ত্বকের স্বাস্থ্য হরমোনের কার্যক্রম, কার্ডিওভাসকুলার রোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে, ত্বকের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শ দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কীভাবে শক্তিশালী করে তা নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষক রোসল্যান্ড একটি পরীক্ষায় একদল শিশুকে বৈচিত্র্যময় অণুজীবে ভরপুর মাটিতে খেলা করতে এবং অন্য দলকে তুলনামূলক কম বৈচিত্র্যময় মাটির বাক্সে খেলতে দিয়েছেন।
স্বাভাবিকভাবেই, অণুজীবে ভরা মাটিতে খেলা করা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছিল। তবে এর পাশাপাশি এই শিশুদের রক্তের নমুনায় সাইটোকাইন নামের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মার্কারগুলোতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে সহায়তা করে।
এমনটা দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যে কোনো হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে, অথচ একে অতিসক্রিয় হতে দেয় না। এ ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলই ‘ভাহভিসতু’ প্রকল্পের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
ফিনল্যান্ডের অরিংকোলিন্না ডে কেয়ার সেন্টারে সরকারি অর্থায়নে খেলার মাঠের আঙ্গিনায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে পাথরের খোয়ার পরিবর্তে কাঠকুচি, বড় বালুকাময় এলাকা ও কাঠের পথ তৈরি হয়েছে, যা আগে থেকেই থাকা পাইন গাছের সঙ্গে মিলে শিশুদের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
ভাহভিসতু প্রকল্পের পেছনের গবেষণাটি ‘বায়োডাইভারসিটি হাইপোথিসিস’ বা জীববৈচিত্র্য অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে। এ তত্ত্ব অনুসারে, বিভিন্ন অণুজীবে ভরা বাতাস, উদ্ভিদ ও মাটি মানুষের মানব মাইক্রোবায়োম এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হচ্ছিল, পরিবেশ থেকে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়া বর্তমান যুগে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা বৃদ্ধির মূল কারণ হতে পারে। রোসলান্ডের গবেষণা সেই কারণটিই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করছে।
রোসলান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, ‘গ্যামপ্রোটেব্যাকটেরিয়া’ নামের ব্যাকটেরিয়ার নির্দিষ্ট পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বনের মাটির মতো প্রাকৃতিক আঙিনায় খেলা করা শিশুদের ত্বকে এই ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছিল এবং এর সঙ্গে টি সেল বা শ্বেত রক্তকণিকার সংযোগ রয়েছে।
এসব কোষ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করতে ও অটোইমিউন বা রোগপ্রতিরোধ সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
একজিমা, হাঁপানি বা অ্যালার্জির মতো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যাধির ক্ষেত্রে এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে গবেষক মিরা গ্রোনরুস বলেন, “আমরা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে কারও হাঁপানি হবে না। তবে এমনটা নিশ্চিত যে, এ ধরনের অভ্যাস দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যাধিগুলো অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।”
