০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ সালে এআই নিয়ে ‘অস্বস্তিকর’ ৬ পূর্বাভাস

চাকরি ছাঁটাই থেকে রোবট্যাক্সি, নজরদারি সফটওয়্যার আর ডেটা সেন্টার রাজনীতি। ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোন কোন পথে মোড় নিতে পারে?

২০২৬ সালে এআই নিয়ে ‘অস্বস্তিকর’ ৬ পূর্বাভাস
২০২৬ সাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ হতে যাচ্ছে বলা চলে, তবে তা স্বস্তির নাও হতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Dec 2025, 06:52 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:22 PM

২০২৬ সাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ হতে যাচ্ছে বলা চলে, তবে তা স্বস্তির নাও হতে পারে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ভেতরের চাপ, বৈশ্বিক রাজনীতি, কর্মক্ষেত্রের নজরদারি আর রোবটের বাস্তব দুনিয়ায় ঢুকে পড়া মিলিয়ে সামনে আসছে একাধিক অস্বস্তিকর দৃশ্যপট।

এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি সাময়িকী ওয়্যার্ডে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আগামী বছরের জন্য ছয়টি ‘ভয়ংকর’ পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। চলুন, সেগুলোই সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক।

এআই খাতে বড় ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা

চলতি মাসে ওপেনএআই গুগলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ফের মনোযোগ দিতে ‘কোড রেড’ ঘোষণা করেছে। এতে অনেকের মনে ফিরে এসেছে তিন বছর আগের স্মৃতি। তখন ওপেনএআইকে টক্কর দিতে গুগল হঠাৎ তৎপর হয়, আর তার পরের মাসেই প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের প্রথম বড় ছাঁটাইয়ে যায়। গুগল তখন একে ভবিষ্যতের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করেছিল।

প্রশ্ন ওঠে, ২০২৬-এর শুরুতেই কি চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইও একই পথে হাঁটতে পারে? এই ভাবনা থেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন কিছু পূর্বাভাস তৈরি হয়েছে।

ডেটা সেন্টার নিয়ে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি

বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক কর্মী ফেইসবুক গ্রুপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছেন। ওয়্যার্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চীন ও রাশিয়া আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়াতে অভ্যস্ত।

র‌্যান্ড করপোরেশনের গবেষক অস্টিন ওয়াং বলেন, “এখন পর্যন্ত নতুন অ্যান্টি ডেটা সেন্টার পেজগুলোর বেশিরভাগই প্রকৃত মার্কিন নাগরিকরা চালাচ্ছেন।” তবে আন্দোলন জোরালো হলে চীন বা রাশিয়া এতে ঢুকে পড়তে পারে। এআই দিয়ে ছবি ও ভিডিও বানানো সহজ হওয়ায় গুজব ছড়ানোও আগের চেয়ে দ্রুত হতে পারে।

রোবটের ডেমো শো দেখা যাবে সবখানে

২০২৬ সালে সিইএস থেকে শুরু করে অ্যামাজনের হার্ডওয়্যার ইভেন্ট পর্যন্ত প্রায় সব প্রযুক্তি সম্মেলনে এআইচালিত রোবট আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। গুগলসহ বড় কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরে রোবটকে ঘরের কাজ শেখানোর চেষ্টা করছে।

গত সেপ্টেম্বরে গুগল এমন একটি ভিডিও দেখিয়েছে, যেখানে রোবট মুখে বলা নির্দেশে আবর্জনা, কম্পোস্ট আর রিসাইক্লিংযোগ্য জিনিস আলাদা করছে। গুগলের পরবর্তী আইও সম্মেলনে হয়তো দেখা যাবে রোবট এমন চুলায় পিৎজা ঢুকিয়ে দিচ্ছে, যেটি সে আগে কখনও দেখেনি। রান্নার ফাঁকে ভিড় ঠাসা ফ্রিজ থেকে আধা গ্লাস ডায়েট কোকও বের করে আনবে হয়ত।

জেনারেল মোটর্সের সাবেক প্রধান এআই কর্মকর্তা বারাক তুরোভস্কি বলেন, বড় ভাষা মডেল এখন ডিশওয়াশারের ম্যানুয়াল বুঝতে পারে, ভিডিও দেখে কাজ শেখে, এমনকি আঁকাবাঁকা ড্রইং দেখে নির্দিষ্ট অংশ ধরতেও পারে। তার ভাষায়, “বড় ভাষা মডেলের পরের সীমান্ত হলো বাস্তব দুনিয়া।”

কর্মীদের কাজ দেখে এআই শেখানো

বছরের পর বছর ধরে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের কম্পিউটারে ‘বসওয়্যার’ বসিয়ে নজরদারি চালায়। ২০২৬ সালে সেই নজরদারি আরও এক ধাপ এগোতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মীদের ক্লিক, স্ক্রল আর টাইপিং রেকর্ড করে এআই এজেন্টকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে পারে।

কাস্টমার সাপোর্টের মতো কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে এ ধরনের এজেন্টের ব্যবহার এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। কর্মী অধিকারকর্মী উইলনেইডা নেগ্রন বলেন, “প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এটি বাস্তবে চলে আসতে পারে।” এতে চাকরি হারানোর ভয় বাড়বে, পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের সামনে চলে আসার ঝুঁকিও থাকবে।

সব সময় শোনা, সব সময় ঝুঁকি

২০২৫ সালে গলায় পরা সব সময় মাইক খোলা রাখা গ্যাজেট তেমন সাড়া পায়নি। তবে ভিডিও কল শুনে নোট বানানো সফটওয়্যার জনপ্রিয় হয়েছে। গ্রানোলা নামের একটি টুল স্থায়ী অডিও সংরক্ষণ না করেই মিটিংয়ের সারাংশ তৈরি করে।

গুগল ওয়ার্কস্পেসের সাবেক প্রধান হাভিয়ের সোলতেরো বলেন, “আউটপুট খুব গোছানো ও কাজে লাগে।” তবে সমস্যা হলো, গ্রানোলা অন্য অংশগ্রহণকারীদের না জানিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও কোম্পানি সম্মতি নেওয়ার পরামর্শ দেয়। এআই আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালিসিয়া সোলউ-নিডারম্যান মনে করেন, তৃতীয় পক্ষের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আইনি প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। ওয়্যার্ডের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে এ নিয়ে বড় কোনো ডেটা ফাঁস বা মামলাও সামনে আসতে পারে।

রোবট্যাক্সির বাড়লেও দুর্ঘটনা ঘটাবে মানুষ

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রোবট্যাক্সি সেবা দ্রুত বাড়তে পারে। ওয়েইমো সপ্তাহে ১০ লাখের বেশি রাইড দেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার তহবিল তুলতে চায় এবং পাঁচ শহর থেকে সেবা বাড়িয়ে প্রায় ২৫ শহরে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে লন্ডন আর টোকিওও আছে। টেসলা ও অ্যামাজনের মালিকানাধীন জুক্সও একই পথে হাঁটছে।

অনেকে ধারণা করছেন, এত রোবট্যাক্সি নামলে বড় কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটবে। তবে ফেডারেল তথ্য বলছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনার জন্য মানুষই দায়ী। রোবট্যাক্সির সংখ্যা এখনও সীমিত, গতি কম, আর এগুলো ঝুঁকি এড়াতে প্রোগ্রাম করা। ফলে ২০২৬ সালে ভয়াবহ দুর্ঘটনার চেয়ে মানুষের ভুলেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৬ সালে এআই কি আমাদের জীবন সহজ করবে, নাকি নতুন ভয় যোগ করবে? উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সামনে বছরটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় বিতর্ক আর সিদ্ধান্তের বছর হতে যাচ্ছে।