Published : 30 Apr 2026, 08:53 PM
যেন পা দুটো টেনে এনে চেয়ারে বসলেন মামুনুল ইসলাম। ফর্টিস এফসির কর্মকর্তা, সতীর্থদের সঙ্গে ছবি তুললেন। এরপর একা বসে অঞ্জলিতে মুখ লুকিয়ে মুছলেন ভিজে ওঠা চোখ। কখনও হাত দিয়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকলেন। দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারের বিদায়বেলায় তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিষন্ন হাসির লুকোচুরি।
বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় শুক্রবার রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটির বিপক্ষে লিগ ম্যাচে খেলবে ফর্টিস এফসি। এই ম্যাচের পর বুটজোড়া তুলে রাখবেন মামুনুল, দীর্ঘ সময় যিনি জাতীয় দল, ক্লাবের মাঝমাঠের জোয়াল টেনেছেন ক্লান্তিহীনভাবে। ৩৭ বছর বয়সের ভারে এখন তিনিও যেন ক্লান্ত।
জাতীয় দলের পাঠ মামুনুল চুকিয়েছেন ২০২০ সালে। তবে ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার। এই পর্বেরও ইতি টেনে দিচ্ছেন এবার। ফেলে এসেছেন কত-শত ঘটনা। পিছু ফিরে কখনও তার কণ্ঠে ভর করল প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস, কখনও আবার না পাওয়ার বেদনা। তবে মোটাদাগে, মামুনুলের কণ্ঠে তৃপ্তির রেশই বেশি।
পরিবার চেয়েছিল ছেলে হাফেজ হোক, কিন্তু মামুনুলের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। তিনি হলেন ফুটবলার। জাতীয় দলেরও অধিনায়ক ছিলেন। সাফ গেমসের শিরোপা জিতেছেন। ক্লাব ফুটবলে পেয়েছেন অনেক শিরোপার স্বাদ। বর্ণিল এই পথচলায় পাশে থাকে বাবা-মা, পরিবার, বন্ধু সবাইকে কৃতজ্ঞতায় বাঁধলেন মামুনুল। তিন মাস আগে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া বাবার কথা বিদায়বেলায় বললেন বিশেষভাবে।
“৩০ বছরের একটা অধ্যায় শেষ করতে যাচ্ছি। আসলে এটা বলা বা তুলে ধরা আমার জন্য খুবই কঠিন। সর্বপ্রথম স্মরণ করি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা... আজকে আমি ফুটবলার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে কষ্ট আমার বাবা করেছেন। আপনারা সবাই জানেন, গত তিন মাস আগে আমি বাবাকে হারিয়েছি। সবারই খেলা ছাড়তে হবে, কিন্তু আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে, আমার ৩০ বছর সময় খেলাধুলার, এই ফুটবলের পেছনে দেওয়া। বাবা চেয়েছেন আমি ফুটবলার হই, জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করি। করলাম, উনার সব ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছি, কিন্তু আজকের বিদায়বেলায় উনি আমাদের মাঝে নাই।”
“আপনারা সবাই জানেন, ১৯৯৭ সালে আমি বিকেএসপিতে ভর্তি হই জিমনাস্টিকে। আমার জিমনাস্টিকসের যে শিক্ষক ছিলেন, উনারা দুইজনও এখন আমাদের মাঝে নাই। কিন্তু উনাদের সমর্থন আমাকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কারণ, উনারা না ছাড়লে নিশ্চয়ই আমি এখন ফুটবলেও যেতাম না, ফুটবল প্লেয়ারও হতে পারতাম না। প্রত্যেকটা জায়গায় প্রত্যেকটা মানুষের সাপোর্ট ছিল আমার পেছনে। যেমন আপনাদেরও (গণমাধ্যমকর্মীদের) সমর্থন... আমি মামুনুল হওয়ার পেছনে বা মামুনুলের যে অর্জন, সব আপনাদের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের মানুষ জানতে পেরেছে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।”
২০০৫ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে ক্লাব ক্যারিয়ারের সিনিয়র পর্ব শুরু। এরপর ঢাকা আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, চট্টগ্রাম আবাহনী, রহমতগঞ্জ হয়ে সবশেষ মামুনুল যোগ দেন ফর্টিসে। লাল-সবুজের জার্সি তিনি গায়ে তোলেন ২০০৮ সালে। পেশাদার ক্যারিয়ারের এই লম্বা পথচলার স্মৃতিও মেলেও ধরলেন মামুনুল। সেখানে তুষ্টি-অতুষ্টি দুটোই আছে তার।
“জানি না দেশকে কতটুকু দিতে পেরেছি, কিন্তু চেষ্টা করেছি সততার সঙ্গে দেশকে দেওয়ার জন্য। ফুটবল থেকে অনেক কিছু পেয়েছি। নাম বলেন, খ্যাতি বলেন, অর্থ বলেন, ট্রফি বলেন, অর্জন বলেন, ব্যক্তিগত অর্জন বলেন- অনেক কিছু পেয়েছি। শেষের দিকের সংগ্রামের সময়ে ফর্টিস এফসি ক্লাব যে পরিমাণ সমর্থন বিগত চার বছর ধরে আমাকে দিয়েছে, সেটা আমার জন্য অনেক। কিন্তু আমি যে ক্লাবগুলোতে খেলেছি, প্রত্যেকটা ক্লাবকে ট্রফি দিয়েছি, চ্যাম্পিয়ন হোক আর রানার্সআপ হোক। খালি একটাই মিসিং, আমার সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গা- ফর্টিস এফসিকে আমি এখনও কিছু দিতে পারিনি। আমাদের এ বছর একটা আশা ছিল, এখনো আছি, শেষ চার ম্যাচ যদি জিততে পারি আমার মনে হয় আমরা রানার্সআপ বা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করব।”
“দেশের হয়ে ১৫ বছর খেলা আপনারা ভালো জানেন এটা সহজ নয়, ৬ বছর অধিনায়কত্ব করা। দেশের থেকে যে সম্মানটুকু আশা করেছিলাম, সে সম্মানটুকু বিদায়ের সময় পাইনি, কিন্তু ক্লাব দিচ্ছে। এটা যে একজন প্লেয়ারের জন্য কতটুকু চাওয়া বা পাওয়া, এটা আসলে বলে বোঝাতে পারব না। যত বছর খেলি ক্লাব বলেন ন্যাশনাল টিম বলেন, একটা পর্যায়ে এসে যখন বিদায় বলবেন ওই বিদায়টুকু যদি সুন্দরভাবে না হয়, তাহলে আমার সারাজীবনের অর্জন থাকে না।”
২০১০ সালে সাফ গেমসের সোনা জিতলেও সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার আফসোসের কথা আগেও বলেছেন মামুনুল। বললেন আবারও। ২০১৪ সালে কলকাতার দল আথলেতিকো দি কলকাতাতে যোগ দিয়েও খেলার সুযোগ না পাওয়ার হতাশা এখনও পোড়ায়, বললেন তিনি।
“সবসময় তো বলে আসছি আক্ষেপ একটা আছে- সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন না হওয়া। এডিকে’তে (আথলেতিকো দি কলকাতা) চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হয়েও মাঠে খেলার সময় না পাওয়া আরেকটা আক্ষেপের জায়গা। এই দুইটা আক্ষেপ যতদিন বেঁচে থাকব, নিঃশ্বাস বন্ধ হবে না, ততদিন থেকে যাবে। কারণ এই দুইটা আক্ষেপ যদি পূরণ হতো, তবে আমার মনে হয় আমার ক্যারিয়ারে সবকিছুই… একজন সাকসেসফুল প্লেয়ার হিসেবে যতটুকু দরকার ছিল, তার সবটুকু অর্জন থাকত।”
“সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ক্লাব পর্যায়ে ৬টা লিগ শিরোপা, ৬টা ফেডারেশন কাপ শিরোপা, স্বাধীনতা কাপ শিরোপা এবং সুপার কাপে রানার্সআপ—সব মিলিয়ে সবই অর্জন ছিল। বাইরের ক্লাবেও চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন আছে, কিন্তু কলকাতার হয়ে গেম টাইম না পাওয়াটা আসলে এটা অনেক বড় আক্ষেপ। আর সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন না হওয়াটা- এই দুইটা আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে।”
এই আক্ষেপ বাংলাদেশেরও। ২০০৩ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জেতা হয়নি। আসছে সাফে হামজা চৌধুরী, শোমিত সোমদের হাত ধরে এই আক্ষেপের অবসান হবে বলে বিশ্বাস মামুনুলের।
“আশা রাখি, আমরা পরের সাফে চ্যাম্পিয়ন হব। তার কারণ হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম, হামজা, শোমিত, ফাহিমদুল (ইসলাম), জায়ান (আহমেদ)- এরা আসায় বাংলাদেশের ফুটবল, বিশেষ করে হামজা আসায় আমাদের যে শক্তি বেড়েছে, আমি মনে করি, আমরা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করার মতো দল।”
“আপনারা এশিয়া কাপ কোয়ালিফায়ারের ম্যাচ দেখেন—আমরা সবসময় স্বীকার করতে বাধ্য, স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত যদি এশিয়া কাপ কোয়ালিফায়ারে ভালো রেজাল্ট দেখেন, ভালো পয়েন্ট টেবিল দেখেন, এটা হলো সেরা পয়েন্ট টেবিল। আমি মনে করি, এটা সেরা ফল। আমি আশা রাখি, আমরা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করব।”
লম্বা সময় ধরে মাঝমাঠের নির্ভরতা ছিলেন মামুনুল। বর্তমান সময়ে স্থানীয়দের মধ্যে শেখ মোরসালিনের মধ্যে নিজেকে দেখছেন তিনি। এ নিয়ে বলতে গিয়ে ইংল্যান্ড প্রবাসী হামজাকে ফের প্রশংসায় ভাসালেন মামুনুল।
“বর্তমান প্রজন্মে অনেক ভালো মিডফিল্ডার আছে, আমার থেকে অনেক অনেক ভালো। আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না, আমিও অস্বীকার করি না। হামজার মতো মিডফিল্ডার আছে, আমার সঙ্গে তার তুলনা কোনো দিক দিয়ে হয় না। সে যে লিগ খেলে, ওখানকার (ইংল্যান্ডের) স্ট্যান্ডার্ড আর আমাদের স্ট্যান্ডার্ড আকাশ আর পাতাল। তাহলে হামজার মতো যেখানে মিডফিল্ডার আছে, শোমিতের মতো অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আছে। এখানে আসলে আমার থেকে অনেক ভালো মিডফিল্ডার আছে।”
“দেশিদের মধ্যে সেরা মিডফিল্ডার হওয়ার সম্ভাবনা আছে, বাংলাদেশের হিসেবে সৃষ্টিশীল—আমি মনে করি মুরসালিন। মুরসালিনের মধ্যে ওই এক্সট্রা অর্ডিনারি স্কোরিং ক্ষমতা আছে, বল সাপ্লাই দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় সে নাম্বার নাইনে খেলে। তাকে যদি মিডফিল্ড খেলানো হয়—আবাহনীতে খেলছে ওই পজিশনে। আপনি দেখবেন তখন তার স্কোরিং ঠিক আছে। আমি মনে করি যে, স্থানীয়দের মধ্যে এক্সট্রা অর্ডিনারি এখন বর্তমান পরিস্থিতিতে মুরসালিনই।”
আগামীতে কি করবেন, সে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত করেননি মামুনুল। তবে ফুটবলের সাথেই যে বাকি সময়টা কাটাবেন, তা বললেন নিশ্চিত করেই। বিদায়ী আলাপনের শেষাংশে রাগ-ক্ষোভের বশে বলে ফেলা কথাগুলোর জন্য দুঃখ প্রকাশও করলেন তিনি।
“আসলে কাল (ভবিষ্যতে) কী করব তা এখনও চূড়ান্ত করিনি। আমার ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোর্স আছে, কোচিং করানোর সার্টিফিকেট আছে। ফর্টিস এফসি যদি মনে করে আমি এখানে কাজ করব, তাহলে করব। এখন সবকিছু নির্ভর করছে ওনাদের ওপর। কাজের ক্ষেত্র তো আমাকে দিতে হবে, সেটা দেন, কাজ করার জন্য আমি সবসময় ওকে। কারণ ফুটবল ছাড়া চলা আমার জন্য খুবই কঠিন। কারণ আমি ফুটবলকে ভালোবাসি, ফুটবল দিয়েই সবকিছু পেয়েছি।”
“আমি অনেক সময় রাগে অনেক কথা বলে ফেলি। এগুলো আপনারা মাথায় নিবেন না। আমি যেটা একান্তভাবে বিশ্বাস করি, ফুটবলের ভালো হলে আমাদের ভালো হবে। ফুটবলের খারাপ হলে আমাদের খারাপ হবে। যদি ফুটবলের ভালো ফল হয়, আমাদের নাম টিকে থাকবে। ফুটবল বেঁচে থাকলে আমাদের নামই পিছনে দেখছেন মামুনুল (পেছনে টানানো ব্যানারে তাকিয়ে) এই নামটা থাকবে সারাজীবন। আর ফুটবল না থাকলে আমাদের নাম থাকবে না।“
“আপনাদের সমর্থন সবসময় লাগবে। খেলা ছাড়ার পরও লাগবে, মরার আগ পর্যন্ত লাগবে। যেদিন নিঃশ্বাস বন্ধ হবে ওইদিনও আপনাদের নিউজ পেপারে শিরোনাম থাকবে মামুনুল ইসলাম আর নেই। সবসময় আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন, পাশে আছেন। দোয়া করবেন যেন সুস্থ থাকি। একটা ছেলে আছে, তাকে যেন ভালোভাবে মানুষ করতে পারি। সারা বাংলাদেশের মানুষ যেন আমাদের মনে রাখে-এতটুকুই চাওয়া।”