২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

চমকে ঠাসা জয়ের চিত্রনাট্য

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপকে ২০ বছর পর হারানো ম্যাচে রোমাঞ্চের সব বাঁক পেরুল বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ জুবায়ের মোহাম্মদ জুবায়ের

বেঙ্গালুরু থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Jun 2023, 10:15 PM

Updated : 25 Jun 2023, 10:40 PM

কী ছিল না এই জয়ের চিত্রনাট্যে? শুরুতে পিছিয়ে পড়ার ধাক্কা, প্রাণান্ত চেষ্টায় সমতায় ফেরার স্বস্তি, এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ এবং সবশেষে দারুণ এক জয়ের বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার মাহেন্দ্রক্ষণ-সব রঙই ছিল মালদ্বীপকে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচের পরতে পরতে! 

এ তো গেল ম্যাচের প্রেক্ষাপট, তার আগের সময়টুকুতেও যে আশা-শঙ্কার দোলুনি কম নয় মোটেও। ২০০৩ সালের পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপকে হারাতে না পারার চোখ রাঙানি ছিল। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সবশেষ মুখোমুখি লড়াইয়েও হারের তিক্ত স্মৃতি। লেবাননের বিপক্ষে দারুণ খেলে শেষ দিকের ভুলে ২-০ গোলে হেরে যাওয়ার দুঃসহ অভিজ্ঞতাও ছিল টাটকা। হেরে গেলে বাজবে বিদায় ঘণ্টা, ছিল এই চাপও। 

সব চাপ, শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিতে মালদ্বীপের বিপক্ষে সাহসী হয়ে উঠতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। ‍মাঠে জামাল-সোহেল-রাকিবরা শুরু থেকে মেলে ধরলেন উপভোগ্য ফুটবলের পসরা। কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ মুঠোয় থাকতেই আচমকা আক্রমণে গোল করে বসলেন হামজা মোহাম্মদ। সপ্তদশ মিনিটের ওই গোলে দলের মনোবলও নড়ে গেল ক্ষণিকের জন্য। সাফে সবশেষ তিন দেখায় হারের স্মৃতিও চোখ রাঙানি দিল প্রবলভাবে। 

দ্রুতই তা সামলে নিয়ে দফায় দফায় মালদ্বীপের রক্ষণে হানা দিয়ে একের পর এক সেট পিস আদায় করে নিতে থাকল বাংলাদেশ। ৩৩তম মিনিটে সুবর্ণ সুযোগ কড়া নাড়ল দরজায়। কিন্তু সোহেল রানার কর্নারের পর তপু বর্মনের হেড গোললাইন থেকে হুসেইন নাহিয়ান ফেরানোর পর নাইজ হাসানের গায়ে লেগে বল ফের জালের দিকে ছুটছিল। তখন সেভ করলেন গোলরক্ষক। শঙ্কার দোলুনি কাটল না। 

অবশেষে ৪২তম মিনিটে কাটল রাকিব হোসেনের গোলে। লেবানন ম্যাচে বদলি নেমে ছায়া হয়ে ছিলেন এই ফরোয়ার্ড। মালদ্বীপ ম্যাচে শুরু থেকে তিনি ভীতি ছড়াতে লাগলেন প্রতিপক্ষের রক্ষণে। ক্লান্তিহীন চেষ্টার ফলও মিলে গেল। সোহেল রানার ক্রসে তপুর হেড পাস থেকে হেডেই জাল খুঁজে নিলেন রাকিব। স্বস্তি ফিরল বাংলাদেশের ডাগআউটে। কিন্তু চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলেনি তখনও; বরং আশঙ্কা বাড়ল ৬২তম মিনিটে রাকিব খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়ায়। 

গোল করার গুরুদ্বায়িত্ব এবার কাঁধে তুলে নিলেন ডিফেন্ডার তারিক! লেবানন ম্যাচে তার ভুলে দল হজম করেছিল প্রথম গোল। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ২৪ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার করলেন ৬৭তম মিনিটে। কিছুটা ভাগ্যের সহায়তাও পেলেন। তা না হলে বক্সে টানা তিন শট নেওয়ার সুযোগ কার কপালে জোটে সচরাচর! 

ইব্রাহিমের কর্নারে জটলার ভেতর থেকে তারিকের প্রথম শট আটকালেন এক ডিফেন্ডার। এরপর তার ফিরতি শট ক্লিয়ার হলো গোললাইন থেকে। তৃতীয় শটে জালের দেখা পেলেন তারিক। বাংলাদেশও খুঁজে পেল এতক্ষণ ধরে খুঁজে ফেরা জয়ের পথ। 

৭০তম মিনিটে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যেতে পারত জয়। কিন্তু বদলি নামা শেখ মোরসালিনের দূরপাল্লার জোরাল শট গোলরক্ষক হুসাইন শরীফ এক হাতে ফিস্ট করে ফেরালেন। ১২ মিনিট পর চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লেন তারিক। মাত্র এক গোলে এগিয়ে থাকায় পুরোপুরি স্বস্তি মেলেনি তখনও। 

সেটা কাটল ৯০তম মিনিটে। লাল-সবুজের জার্সিতে তৃতীয় ম্যাচে এসেই মোরসালিন ব্যক্তিগত গোলের খাতা খুললেন। ঠাণ্ডা মাথায় কোনাকুনি শট নেওয়ার কাজটুকু করলেন এই মিডফিল্ডার। নেপথ্যের নায়ক ম্যাচ জুড়ে দুর্দান্ত খেলা বিশ্বনাথ ঘোষ। প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে তিনি বাড়িয়েছিলেন মোরসালিনকে। 

এরপর কেবল শেষের বাঁশির অপেক্ষা। যখন বাজল, মালদ্বীপের খেলোয়াড়রা মাঠে শুয়ে পড়লেন হতাশায়। বাংলাদেশ ডাগআউট থেকে সবাই ছুটল মাঠে। টুর্নামেন্টে টিকে থাকার আনন্দ, উচ্ছ্বাস ঠিকরে পড়তে লাগল কোচ, খেলোয়াড়দের চোখে মুখে। 

সংবাদ সম্মেলনে চওড়া হাসি নিয়ে এলেন কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। দুই দশক পর সাফে মালদ্বীপকে হারানোকে ‘দুর্দান্ত অর্জন’ বললেন। অবশ্য আগামী বুধবার ভুটানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে নিজেদের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ নিয়ে সতর্কবার্তা দিতেও ভোলেননি এই স্প্যানিশ কোচ। 

তবে এখন যে কেবল এগিয়ে চলার পালা, তা ছোট্ট এক কাণ্ড করে বুঝিয়ে দিলেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। মাঠ ছেড়ে টিম বাসে ওঠার সময় অপেক্ষারত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন বিশ্বনাথ ঘোষ। সবে কথা বলা শুরু করবেন, ঠিক তখনই তার কানের কাছে জামাল চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ভামোস’। অধিনায়কের সুরে সুর মিলিয়ে ‘ভামোস, ভামোস’ বলে চেচিয়ে উঠলেন তপুও। বাংলায় ভামোস শব্দের অর্থ ‘চলো এগিয়ে যাই।’