সোনারগাঁয়ে কারুশিল্প মেলায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

দোকানের আয়তন ছোট হওয়ায় পণ্য সাজানোর পর ভেতরে নড়াচড়ার জায়গা থাকছে না বলে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ।

সৌরভ হোসেন সিয়াম, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Jan 2023, 06:48 PM
Updated : 22 Jan 2023, 06:48 PM

ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্পের উৎকর্ষসাধন ও প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিবছর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আয়োজিত হয় কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন মাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন করে।

এবার মেলার আয়োজকদের অব্যবস্থাপনা এবং এর ফলে মেলায় অংশগ্রহণকারী কারুশিল্পীরা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

গত ১৮ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

কারুশিল্পীরা বলছেন, প্রতিবছর একজনকে একটি দোকান বরাদ্দ দিলেও এবার দুইজন কারুশিল্পীকে একটি দোকান দেওয়া হয়েছে। দোকানের আয়তন ছোট হওয়াতে পণ্য সাজিয়ে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে তাদের। এছাড়া অন্যান্য বছর একজন কারুশিল্পীর সঙ্গে একজন সহযোগীর জন্যও সম্মানি (দৈনিক ৫০০ টাকা) বরাদ্দ রাখা হয়। এবার সহযোগীর সুবিধা পাচ্ছেন না শিল্পীরা।

পাটের তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করেন রংপুরের রাশিদা বেগম। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে চলমান মাসব্যাপী কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে এবারই প্রথম অংশ নিয়েছেন তিনি। প্রথমবার এসেই বিড়ম্বনার সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

ছোট একটি দোকান দুই কারুশিল্পীর নামে বরাদ্দ দেওয়ায় পণ্য সাজানো ও দোকানের ভেতর কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাশিদা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রংপুরে আমার একটি ছোটখাটো কারখানা আছে। আমার অধীনে সেখানে ৫০ জন কাজ করে। এবার প্রথম এসেছি সোনারগাঁয়ের কারুশিল্প মেলায়। কিন্তু এসে তো পড়েছি সমস্যায়। পাটের তৈরি অনেক জিনিসপত্র আনলেও মাত্র একটি বস্তা খুলতে পেরেছি, তাও সবগুলো দোকানে সাজাতে পারিনি। কারণ জায়গা নেই। আমার সাথে আরেকজনকেও দোকানের অর্ধেক জায়গা দিতে হচ্ছে। দু’জনেই একই সমস্যায় পড়েছি। তারপরও ম্যানেজ করে নিতে হচ্ছে।”

কেবল রাশিদা বেগমই নন একই সমস্যার কথা বললেন মেলায় অংশ নেওয়া জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল, নকশী কাঁথা তৈরির শিল্পী হোসনে আরা, পটচিত্রশিল্পী রতন কুমার পাল, কাঠখোদাই শিল্পী বীরেন্দ্র সুত্রধরও।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানান, এবার মেলায় অংশ নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত ৬৪ জন কারুশিল্পী। তবে তাদের জন্য দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩২টি। দৈর্ঘ্যে ১২ এবং প্রস্থে ১০ ফুটের একটি দোকান পেয়েছেন দুইজন কারুশিল্পী। এছাড়া উদ্যোক্তা ও সাধারণ ক্যাটাগরিতে আরও ৬৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এই মেলায়।

ছোট মোড়ায় বসে কোলের উপর পটচিত্র নিয়ে তাতে অলংকরণ করছিলেন রতন কুমার পাল। কাজ করতে করতে একঘেয়েমিতা দূর করতে পা ছড়িয়ে একটু বিশ্রাম নেবেন তার উপায় নেই। সামনে বিছিয়ে রাখা আছে বীরেন্দ্র সুত্রধরের কাঠের শিল্পকর্ম। বীরেন্দ্রও দোকানের ভেতর আটোসাটো হয়ে কাঠখোদাইয়ের কাজ করছেন।

রাজশাহীর পেশাদার পটচিত্রশিল্পী রতন পাল বলেন, “দোকানের আয়তন ছোট হওয়ায় পণ্য সাজানোর পর ভেতরে নড়াচড়ার জায়গাও পাচ্ছি না। আমরা তো নিয়মিত কাজ করা লোক। শুধু পণ্য সাজিয়ে বসলেই তো হবে না, ভেতরে কাজ করার জায়গাও তো পেতে হবে।”

“এইখানে কর্মরত শিল্পীদের উন্নয়নে কাজ করার কথা। অথচ এই ধরনের ব্যবস্থাপনায় তো কাজ করা সম্ভব না। আসলে শিল্পের মর্ম সবাই বোঝে না। কাজকে সন্তানের মতো ভালোবাসি তাই বুকে আগলে রেখেছি। সহযোগিতা না পেলে তো এই পেশার উন্নতি দেখছি না।”

দোকানের আয়তন ছোট হওয়ায় ভেতরে একটি চাকা বসানোর পর জায়গা আর সংকুলান হয় না। উপায় না পেয়ে মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া রঙ করে শুকাতে দেন মেলার পেছনে খালি জায়গায়।

সুশান্ত বলেন, “জীবন-যৌবন শেষ করেছি এই কাজ করে। অনেক অর্থকষ্টে থাকতে হয়েছে, এখনও থাকতে হয়। তারপরও প্রাপ্য সম্মানটা অন্তত চাই। একজনরে একটা দোকান দিলে শান্তিমত কাজ করা যাইত। এইটা তারা করেননি। আগামীবার যেন এই বিষয়টা তারা লক্ষ রাখেন সেই আশাই করব।”

শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাউন্ডেশনের ভেতর স্থায়ী দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন কয়েকজন পুরোনো শিল্পী। স্থায়ী দোকান থাকায় এবার মেলায় দোকান দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছিল তাদের।

নকশীকাঁথা শিল্পী হোসনে আরা বলেন, “আমরা কয়েকজন পুরোনো শিল্পী ফাউন্ডেশনের ভেতরে কারুচত্বরে স্থায়ী দোকান বরাদ্দ পেয়েছি। কারুশিল্পীদের সম্মানে আগে এই দোকানের জন্য ভাড়া নেওয়া হতো না। গত এক বছর যাবৎ প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে। দোকান থাকায় এইবার মেলাতেও অংশ নিতে পারব না বলে বলা হইছিল। পরে আবেদন করে মেলায় দোকান পাইছি।

“কখনও বইসা থাকি না। রাইত-দিন চব্বিশ ঘন্টা কাজ করি। কাজ ছাড়া থাকতে পারি না। কিন্তু আসল শিল্পীদের কোনো মূল্যায়ন নাই। খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন এইখানে অনেকে কর্মরত শিল্পী না, তারপরও সম্পর্কের খাতিরে তাদের জায়গা দেওয়া হইছে।”

কর্মরত কারুশিল্পীদের বাইরে বাণিজ্যিক কয়েকজনকেও দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, “এবার মেলায় মোট ১০০টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ৩২টি দোকান দেওয়া হয়েছে কর্মরত কারুশিল্পীদের। উদ্যোক্তা ও সাধারণ ক্যাটাগরিতে বাকি ৬৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”

কারুশিল্পীদের ছোট দোকানে দু’জনকে বরাদ্দ দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এইবার কারুশিল্পীদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ফলে জায়গা সংকুলানে সমস্যা হয়েছে। এই কারণে দু’জনকে একটি করে দোকান দেওয়া হয়েছে। একজনকে একটি করে দিতে গেলে যে জায়গার প্রয়োজন তা আমাদের চত্বরে নেই। তেমনটা করতে গেলে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের হাঁটাচলায় সমস্যা হতো।”

তবে সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা কবি ও সংস্কৃতিকর্মী শাহেদ কায়েস বলন, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই মেলা ও লোকজ উৎসব প্রতিবছরই হচ্ছে। লোক ও কারুশিল্পীদের আর্থিক উন্নয়ন ঘটানো, পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এই শিল্পে আসতে পারে সেই ধরনের কাজ তারা করছে না। এটি করছে না বলেই দু’জন শিল্পীকে একটি দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে তারা দ্বিতীয়বার ভাবেননি।

লোকশিল্প ও লোকসাহিত্য নিয়ে গবেষণা নিয়মিত করা উচিত, যেটি এই ফাউন্ডেশনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে তিনি মনে করেন।

“কিন্তু এই কাজগুলো হচ্ছে না, খুবই অবহেলিত পর্যায়ে আছে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। শুধুমাত্র ভবন হচ্ছে। আমরা মনে করি, লোকশিল্পীদের নিয়ে কাজ করা উচিত, পাশাপাশি গবেষণা করা উচিত,” বলেন তিনি।