বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সাতক্ষীরার পৈত্রিক ভিটায় মহালয়ার আবাহন
ভোরবেলা সূর্যোদয়ের আগেই চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কালজয়ী চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র ও ভক্তিগীতি।
যে কালজয়ী কণ্ঠের জাদুতে প্রায় শতবর্ষ ধরে প্রতি শরতে বাঙালি হৃদয়ে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা পৌঁছে যায়, সেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্মৃতিবিজড়িত পৈত্রিক ভিটায় ধ্বনিত হলো মহালয়ার অমর সুর।
শনিবার ভোর থেকে সারাদিন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার উথলীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পৈত্রিক বাড়িতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শ্রদ্ধা ও অপরিসীম উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে শুভ মহালয়া।
ভোরবেলা সূর্যোদয়ের আগেই চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কালজয়ী চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র ও ভক্তিগীতি। যেন ফিরে আসে আবহমান বাংলার সেই মহালয়ার রূপময় প্রভাত।
এরপর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জলাশয়ে সমবেত হয়ে তিল, জল ও কুশের সাহায্যে পুরোহিতের বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের আত্মার পরম শান্তি কামনায় তর্পণ ও পিণ্ডদান সম্পন্ন করেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
একই দিনে মণ্ডপে বিশেষ পূজার আয়োজনের পাশাপাশি শিল্পীরা প্রতিমার চোখে তুলির শেষ ছোঁয়ায় চক্ষুদান সম্পন্ন করেন, যার মধ্য দিয়ে মৃণ্ময়ী প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রতীকী সূচনা ঘটে।
সকালে উথলীতে বের হয় এক আনন্দমুখর প্রভাতফেরি, যেখানে সুরের মূর্ছনায় প্রতিধ্বনিত হয় আগমনী গান।
পরে উথলী মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন মৃণাল কান্তি ভদ্র। তিনি বলেন, “চণ্ডীপাঠের যে মহানায়ক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কালজয়ী ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তার এই পিতৃভিটায় মহালয়ার প্রতিটি সুর আমাদের শিকড়ের টানকে নতুন করে জাগ্রত করে। এটি কেবল কোনো অনুষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানোর এক মহতী প্রয়াশ।”
অনুষ্ঠানে উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মৃণাল কান্তি রায় বলেন, “মহালয়ার সূচনালগ্নে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সুরের মধ্য দিয়ে অমঙ্গলকে পরাজিত করে শুভ শক্তিকে জাগ্রত করার যে আহ্বান, তা আজ পুরো মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে।”
তালা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, “এমন অনন্য ঐতিহাসিক স্থানটি সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও চেতনার এক প্রদীপ্ত শিখা।”
সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন বলেন, “চণ্ডীপাঠের অমর শিল্পী, বেতারের মহানায়ক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের এই ঐতিহাসিক পিতৃভিটা কেবল একটি ভিটা নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য রত্ন। এটিকে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক উদ্যোগে সংরক্ষণ করে একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।”
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক গোলাম ফারুক বলেন, “সামাজিক সম্প্রীতি ও সার্বজনীন উৎসবের যে আবহ আবহমান বাংলায় প্রবাহিত, উথলীর এই প্রাঙ্গণ তারই এক অনুপম নিদর্শন।”
নারায়ণ মজুমদারের পরিচালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, গাজী সুলতান আহমদ, ভারত থেকে আসা ভদ্র পরিবারের সন্তান অসীত ভদ্র, মহিলা ইউপি সদস্য লাকি বেগম ও ফেরদৌস আলী, বর্ণমালা একাডেমির প্রধান শিক্ষক পল্লব মজুমদার, গোবিন্দ ভদ্র, শান্তু ভদ্র, শুভ্র শশী ভদ্র, মধু ছন্দা ভদ্র, কৃষ্ণা রাণী ভদ্র, মিতা রাণী ভদ্র, বৈশাখী ভদ্র ও গীতা রাণী ভদ্র।
