সাতক্ষীরায় নানা আয়োজনে বিবেকানন্দ জয়ন্তী উদযাপন
“ঈশ্বরপ্রেম, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম এই তিনের সমন্বয়েই স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন পূর্ণতা পেয়েছে।”
‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’-এই বাণীকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যুবনায়ক স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ‘মায়েরবাড়িতে’ বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে আলোচনা সভা, শীতবস্ত্র বিতরণ ও মানবসেবামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
এর আগে রামকৃষ্ণ মন্দির ও ধ্যানঘরে বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শনভিত্তিক সংগীত পরিবেশন করেন টাউন গলার্স হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তৃপ্তিমোহন মল্লিক।
বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক তপন কুমার শীলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা মন্দির সমিতির সভাপতি সোমনাথ ব্যানার্জী।
সোমনাথ বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে কেবল উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মানবসেবাকেই ঈশ্বরসেবার সমান মর্যাদা দিয়েছেন।
“আজ সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় তার সহায়তা ও সমন্বয়ের দর্শন আমাদের জন্য পথনির্দেশক।”
অনুষ্ঠানে সারদা সংঘ সাতক্ষীরার সভাপতি শ্রীমতি কল্যাণী রায় বলেন, “মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ যে দর্শন রেখে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
“তিনি তরুণ সমাজকে আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও মানবিক শক্তিতে বলীয়ান করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।”
সংগঠনের উপদেষ্টা অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন দাশ তার বক্তব্যে বলেন, “এক সময়ের তেজস্বী ও কর্মদক্ষ নরেন্দ্রনাথ দত্ত শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
“অনাহার ও স্বল্পাহারকে সঙ্গী করে তিনি ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করেছেন।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এমন এক যুগপুরুষ, যিনি যুবসমাজকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। তার ‘ওঠো, জাগো’ আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।”
কাব্য তীর্থ কলেজের অধ্যক্ষ নির্মল কুমার দাশ বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ তরুণদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন ‘বি অ্যান্ড মেক’, অর্থাৎ নিজেকে গঠন করো এবং অন্যকে গঠনে সহায়তা করো। এই দর্শনেই একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে ওঠে।”
মাছখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক স্নিগ্ধা নাথ বলেন, “ঈশ্বরপ্রেম, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম এই তিনের সমন্বয়েই স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন পূর্ণতা পেয়েছে। তিনি ধর্মের নামে বিভেদ নয়, ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।”
বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষ বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ কেবল আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মধ্যেই এর সার্থকতা।
“শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্নসেবা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা স্বামীজীর মানবপ্রেম ও সহায়তার দর্শন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।”
আলোচনা সভা শেষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শতাধিক শীতার্ত ও অসহায় মানুষের মাঝে শীত বিতরণ করেন সাতক্ষীরার বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সেবাকর্মীরা।
