অবহেলায় জৌলুস হারাচ্ছে শরীয়তপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘রুদ্রকর মঠ’
নবাব আলীবর্দী খানের আমলের জমিদার নীলমনি চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর ১৬৭০ সালের দিকে তার সমাধির ওপর মঠটি নির্মাণ করা হয়।
শরীয়তপুর সদর উপজেলায় ১৫০ ফুট উঁচু ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘রুদ্রকর মঠ’। প্রায় ৩৫৫ বছরের পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর এই নিদর্শনটি বর্তমানে অযত্ন ও অবহেলায় জৌলুস হারাতে বসেছে।
জেলা শহর থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে শরীয়তপুর-চাঁদপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মঠটি সংস্কারের অভাবে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ধরেছে। এ ছাড়া মঠের কাছে যাওয়ার কোনও রাস্তা না থাকায় পর্যটকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এমতাবস্থায় মঠে যাওয়ার রাস্তা নির্মাণ এবং কয়েকশ বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যশৈলীটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়াহিদ হোসেন মঠে যাওয়া রাস্তাটি নির্মাণের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে জানা গেছে, নবাব আলীবর্দী খানের আমলে শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকর এলাকায় বাস করতেন জমিদার নীলমনি চক্রবর্তী। নীলমনির মৃত্যুর পর ১৬৭০ সালের দিকে তার তিন সস্তান বানিলাল চক্রবর্তী, ক্ষিতিলাল চক্রবর্তী ও বসন্তলাল চক্রবর্তী বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সমাধির ওপর একটি মঠ নির্মাণ করেন।
মঠটি ইট ও পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন সময় পালং এলাকার রাজমিস্ত্রি তিলক ভূঁইয়া ও গুরুচরণ ভূঁইয়া এটি নির্মাণ করেন।
প্রাচীন এই মঠের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেলে ১৮৮৯ সালে চক্রবর্তী পরিবারের সন্তান গুরুচরণ চক্রবর্তী, চন্দ্রচরণ চক্রবর্তী এটি পুনর্র্নিমাণ করেন। পরে মঠটিতে কালীমন্দির স্থাপন করে সাড়ম্বরে পূজা ও কীর্তনসহ পূজা-অর্চনা করা হত।
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মঠটির কালীমন্দিরে জাঁকজমকভাবে কালীপূজা হত। ওই মঠের পাশের তিন একর ৭৩ শতাংশ জমির ওপর চক্রবর্তী পরিবার থেকে ১৯১৫ সালে জমিদার নীলমনির নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠটি ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। এতে মঠটির কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
পরে ১৯৭৫ সালে নীলমনি চক্রবর্তীর বংশধরদের সবশেষ সদস্য প্রমথ লাল চক্রবর্তী ভারত চলে যান। এর পর থেকে সেখানে আর পূজা হয় না। সংরক্ষণের অভাবে মঠটি এখন প্রায় ধ্বংস হতে চলেছে। তবে সেই থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মঠটি দেখতে রুদ্রকরে যান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার রুদ্রকর গ্রামের ভেতরে মঠটির অবস্থান। জেলার একমাত্র মঠ রুদ্রকর মূলত একটি মন্দির। মঠে একটি বড় শ্মশান মন্দির রয়েছে; যার মূল উপাসনালয় কক্ষের সঙ্গে বারান্দার চারকোণে চারটি ছোট মন্দির রয়েছে।
রুদ্রকর মঠের গায়ে চারটি দেবী মূর্তির অলংকরণ রয়েছে। রুদ্রকর মঠের সামনে একটি প্রাচীন পুকুর রয়েছে। ধারণা করা হয়, মঠ এবং পুকুর একই সময় তৈরি।
পরিচর্যা না থাকাতে মঠটি এখন প্রায় জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে মঠের উপরিভাগে গর্তের মধ্যে টিয়া, চড়ইসহ বিভিন্ন পাখির বসবাস। যাদের কিচিরমিচিরে নিস্তব্ধ এই জায়গাটির প্রাণ আছে বলে মনে হয়।
মঠের কাছে যেতে কোনো রাস্তা নেই। মানুষের বাড়ির ওপর দিয়ে মঠের কাছে যেতে হয়। প্রাচীন এই স্থাপনা দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ রুদ্রকর এলাকায় আসেন; যা আজও মানুষের দৃষ্টি কাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন দে বলেন, রুদ্রকর মঠটি মূলত একটি মন্দির; যা রুদ্রকর জমিদার বাড়ি মঠ নামেও পরিচিত। এটি প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এবং আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। তবে এর একদিকে রাস্তা নেই, তার ওপরে সংস্কারের অভাবে মঠটি নষ্ট হচ্ছে।
মঠটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে কবি শ্যাম সুন্দর দেবনাথ বলেন, “প্রতিদিন এই মঠ দেখতে অনেক লোকজন আসেন। মঠের কাছে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। তাই যাতায়াতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয় পর্যটকদের।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুদল জলিল বলেন, সংস্কারের অভাবে স্থাপত্যশিল্পের এই নিদর্শনটির সৌন্দর্য ও জৌলুস হারিয়ে যেতে বসেছে। এটি দ্রুত সংস্কার করা হোক।
রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, “রুদ্রকর মঠটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। সংরক্ষণের অভাবে এটি ধ্বংস হওয়ার পথে। এটি সংস্কারে আমি জেলা প্রশাসনকে একাধিকবার অনুরোধ করেছিলাম। শুনেছি তারা এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন কিন্তু কোনো উত্তর পাননি।”
রুদ্রকর নীলমনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, “জমিদার নীলমনি চক্রবর্তীর পরিবার তার নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। আশেপাশের জমি প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। সরকারি কোনো তত্ত্বাবধায়ন নেই।
“এখন মঠটি ভেতরে লাকড়ি রাখা হয়। আমি মনে করি সরকারের পক্ষ থেকে মঠটি সংস্কার করা উচিত।”
রুদ্রকর মঠটির সংস্কার নিয়ে জানতে চাওয়া হলে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) ওয়াহিদ হোসেন বলেন, “এ বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি আপনার কাছে শুনলাম। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে খোঁজ খবর নিতে বলব। যাতে মঠের কাছে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।”
