ইফতারের রাজা ঘোষপট্টির ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’
“আগে আমরা দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে এটা তৈরি করতাম। এখন আমরা বিশেষ যত্ন নিয়ে রোজার মাসে মুসলমান ভাইদের জন্য তৈরি করি।”
শেরপুর শহরের মানুষের ইফতারি বুন্দিয়া, জিলাপি বা বেগুনি নয়; বরং এক বিশেষ খাবার ছাড়া পূর্ণতা আসে না, তা হলো ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’।
এক সময়কার জমিদারদের প্রিয় এবং শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ এই মিষ্টি গত দুই দশক ধরে রোজাদারদের ইফতারের টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে।
চাহিদার তুঙ্গে ঘোষপট্টি
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রোজায় এই মিষ্টির চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ সময় শহরের ঘোষপট্টি এলাকার মিষ্টির দোকানগুলোতে মাষকলাইয়ের আমিত্তি কেনার জন্য উপচে পড়া ভিড় লেগেই থাকে।
দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, প্যারী মোহন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, প্রেমানন্দ গ্র্যান্ড সন্স, লোকনাথ ভাণ্ডার ও শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন দোকানে এই আমিত্তি প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মিষ্টি বিক্রেতারা বলছেন, রোজার সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ মণ আমিত্তি বিক্রি হয়। শুধু শহর নয়, দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকেও মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কিনতে আসেন।
জমিদার আমল থেকে ইফতারের টেবিল
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দেড়শ বছর আগে ব্রিটিশ আমল থেকে শেরপুরের ঘোষপট্টিতে এই আমিত্তি তৈরি হচ্ছে। এক সময় কেবল দুর্গা পূজা ও ভাইফোঁটার মতো উৎসবে এটি বানানো হতো।
রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ৬০ বছর বয়সী মালিক ভুলু ঘোষ বলেন, “জমিদার আমলে শরৎকালে অর্থাৎ দুর্গাপূজার সময় এই আমিত্তি বানানো হতো। জমিদাররা এই আমিত্তি খুব পছন্দ করতেন।
“তবে গত ২০ বছর ধরে রোজাদারদের বিপুল চাহিদার কারণে রমজান মাসে এটি নিয়মিত তৈরি করা হচ্ছে।”
যেভাবে তৈরি হয় এই বিশেষ আমিত্তি
ঘোষপট্টির দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মঙ্গল চন্দ্র ঘোষ ও সুবোধ আলীর মতে, এই আমিত্তি তৈরির প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ।
প্রথমে কাঁচা মাষকলাইয়ের ডাল ভিজিয়ে রেখে মেশিনে পিষে গুঁড়া করা হয়। এরপর তাতে পরিমাণমতো অ্যারারুট ও বার্লি মেশানো হয়। বিশেষ এক ধরনের 'নাচনা'র (কাপড়ের ছিদ্রযুক্ত থলি) সাহায্যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গরম তেলে ভাজা হয়। সবশেষে চিনির সিরায় ডুবিয়ে তৈরি হয় মচমচে ও রসালো আমিত্তি।
ঘোষ পট্টির কানাইলাল ঘোষের ছেলে অরুণ চন্দ্র ঘোষ বলেন, “এই আমিত্তিডা আমাদের বাপ ঠাকুর দাদারা ব্রিটিশ আমল থাইকা বানাইয়া আসতাছে। এখন আমরা বানাই।”
তিনি বলেন, “এই মিষ্টি যত্ন নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাসকলাই ডালের সঙ্গে একটু এরারোড বার্লি মিশিয়ে তেলে ভেজে চিনির শিরায় ভিজিয়ে রেখে ঝাজড়া দিয়ে তুলে বিক্রি করা হয়।
“আমাদের বাপ ঠাকুর দাদারা প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকা বিক্রি করলেও এখন তা ২২০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আমিত্তি কারিগর আব্বাস আলী বলেন, “রোজার সময় এই আমিত্তিডা বেশি চলে। রোজাদাররা ইফতারের সময় এটা খায়। তাই এই সময়টা বেশি বেশি বানাই।”
প্যারীমোহন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের প্রদীপ ঘোষ বলেন, “কলাইয়ের আমিত্তিটা শেরপুরের ঐতিহ্য। আগে আমরা দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে এটা তৈরি করতাম। এখন আমরা বিশেষ যত্ন নিয়ে রমজান মাসে মুসলমান ভাইদের জন্য তৈরি করে থাকি।”
মিষ্টি কারিগর শংকর ঘোষ বলেন, এটা ঐতিহ্যগতভাবেই চলে। সকলেই খায়। এটা তৈরি করে তাই আনন্দ পাই। তৈরিতে একটু কষ্ট হলেও ক্রেতারা যখন আগ্রহভরে নিয়ে যায় তখন খুবই ভালো লাগে।
ভোক্তাদের পছন্দের শীর্ষে এই মিষ্টি
শেরপুর শহর ছাড়াও পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোজাদার এবং অন্যান্য মানুষজন তা কিনে নিয়ে যান।
আমিত্তির ক্রেতা শেরপুর জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা জান্নাত জামান জেমিনি বলেন, “সারা বছর আমরা ছানারা আমিত্তিটা খাই। রোজার সময় মাষকলাইয়ের আমিত্তিটা স্পেশালভাবে বানায়। এতে খেতে খুবই মজা; এজন্যই কিনি।”
আমিত্তির স্বাদের প্রশংসা করেন শেরপুর সদর উপজেলার চৈতনখিলা এলাকার শিক্ষক মাহবুবুর রহমানও। তিনি বলেন, “ইফতারে এটা চাই-ই চাই।”
রেহার চর গ্রামের ফিউল আলম শিহান বলেন, “রোজার সময় ছাড়া এই আমিত্তিটা পাওয়া যায় না। রোজার মধ্যে বানায়ও বেশি। তাই পুরামাস ইফতারে এই মিষ্টি প্লেটে থাকে।”
যুগনি মোরা এলাকার কৃষক মোকসেদ আলী বলছিলেন, “ইফতারির জন্য মাসকলাইয়ের আমিত্তিটা সবাই পছন্দ করে। আমিও করি। তাই নিতে এসেছি।”
