দুবছর বিরতির পর ফের জমজমাট 'ঘোড়ার মেলা'

বাহাদুর, বিজয়িনী, পাখি, তাজিয়া, বিজলি- কত বাহারি নাম ঘোড়াদের; এমন আরও শত শত ঘোড়া উঠেছে জয়পুরহাটের গোপীনাথপুরের মেলায়।

জয়পুরহাট প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 March 2022, 09:02 AM
Updated : 25 March 2022, 09:02 AM

গুণ ও বুদ্ধিমত্তায় অনন্য ঘোড়াগুলি। ছুটতেও পারে ক্ষীপ্রগতিতে, আবার দুলকি চলনেও চলে। এ কারণে তাদের কদরও বেশ। এদের পেতে ক্রেতাদের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি লেগে যায়।

কোভিড মহামারীতে দুই বছর মেলা বন্ধ থাকার পর ফের দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে বসেছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুরের এই মেলা। মাসব্যাপী চলার কথা থাকলেও ক্রেতার চাহিদা বুঝে চলে ১৫-২০ দিন।

দোল পূর্ণিমা মেলার প্রধান সেবাইত রণেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়া বলেন, গরু, মোষ, ভেড়া, ছাগল কেনাবেচা হলেও দেশের একমাত্র ঘোড়া কেনাবেচার মেলা হিসেবে এটি বিশেষ প্রসিদ্ধ। এবারে মেলায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েক হাজার ঘোড়া এসেছে। তবে সার্কাস বা যাত্রা আয়োজনের অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

প্রধানত ঘৌড় দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য এই ঘোড়াগুলোর কদর। দরদাম ঠিকঠাক হলে খেলার মাঠে ঘোড়া হাঁকিয়ে ক্রেতাকে দেখানো হয় তার ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা।

প্রায় সাড়ে ৫০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই মেলার ইতিহাস তুলে ধরে গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে ১৪৯২ থেকে ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দের শাসক নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ গোপীনাথপুরে বেড়াতে আসেন। তখন এখানে নন্দিনী প্রিয়া নামে এক সাধকের আতিথিয়তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব ওই সাধককে প্রায় ৬০৪ একর জমি লাখেরাজ দান করে দিয়ে যান। যার উৎস থেকে প্রতি বছর দোল যাত্রা ও মেলা উৎসব চলে আসছে।“

আয়োজকরা জানান, মেলার শুরু থেকেই ঘোড়া কেনাবেচার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। অতীতে নেপাল, ভূটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থেকে ঘোড়া আনা হলেও ইদানিং সেই চল আর নেই। এখন মেলা দখল করেছে দেশীয় ঘোড়ার বাজার। বর্তমানে ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, বগুড়া, নওগাঁ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড়া এই মেলায় তোলা হয়।

এবারে প্রতিদিন শতাধিক ঘোড়া বিক্রি করছেন বিক্রেতারা; এগুলো একেকটি ৬০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকায় কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা, তবে সর্বোচ্চ দাম উঠছে পাঁচ লাখ পর্যন্ত।  

রাজশাহীর বাঘা এলাকার আব্বাস আলী, কুড়িগ্রামের বায়েজিদ হোসেনের মতো অনেক ক্রেতাই এখানে আসেন ঘোড়া কিনতে।

রংপুরের তরুণী ঘোষ, নওগাঁর পত্নীতলার ছামেদুল আলী জানান, প্রতিবছর মেলাতে তারা শুধু ঘোড়া বিক্রিই করেন না, অল্প বয়সী ঘোড়া কিনেও নিয়ে যান।

সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দাম ওঠা ঘোড়ার মালিক মজিবর রহমান বলেন, “ঘোড়াটি ভারতীয় তাজী ঘোড়া। এর বয়স সাড়ে চার বছর। এটি দ্রুত দৌড়াতে পারে। লাল-সাদা ডোরাকাটা ঘোড়াটির যত্ন নিজেই করি।”

মেলায় আমদানি কিছুটা বেশি হওয়ায়, প্রত্যাশিত দাম না পেলেও অল্প লাভে সন্তুষ্ট ঘোড়া পালনকারী ও মালিকরা। তবে স্থান আগের তুলনায় সংকুচিত হওয়া এবং ঘোড় দৌড়ের মাঠ না থাকার কথা জানিয়েছে বিক্রেতা-মালিকরা।

মেলায় ঘোড়া ছাড়াও গরু-মহিষের বাজারও বসেছে। শিশুদের মনভুলানো বিভিন্ন খেলনা থেকে শুরু করে, 'মৃত্যুকূপ মোটরযান' খেলা, পোশাক, কাঠ ও প্লাস্টিকের আসবাবপত্র আর হরেক রকমের মিঠাই-মণ্ডার দোকানও আছে। মেলার অন্যতম আকর্ষণ দুই থেকে চার কেজির 'মাছ আকৃতির মিষ্টি’।

এসব ছাড়াও ঘর-গেরস্থালির রোজকার ব্যবহারের নানা জিনিসপত্রের পসরাও সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসাযীরা। দোলের দিন থেকে শুরু করে যে কয়দিন মেলা চলে, মানুষের উপচেপড়া ভিড় থাকে দিনরাত।

শুধু জয়পুরহাট নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দোকানিরা এই মেলায় ব্যবসা জমাতে আসেন।

ঢাকার নবাবগঞ্জের বস্ত্র ব্যবসায়ী আহসান আলী ও ঢাকার বঙ্গবাজারের মোসাদ্দেক হোসেন, দিনাজপুরের মসলা ব্যাসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, করোনাভাইরাসের কারণে তারা গত দুই বছর এই মেলায় ব্যবসা করতে পারেননি। এবার ব্যবসা ভাল হবে বলে আশা তাদের।

মেলার পরিবেশ প্রসঙ্গে গোপীনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, “যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মেলা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। এ ছাড়া মেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়ে নিয়মিত প্রচার এবং মাইকিং করা হচ্ছে।“

আক্কেলপুর থানার ওসি সাইদুর রহমান বলেন, “এই মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল চলমান আছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।”

মেলায় উপজেলা প্রশাসনের সার্বক্ষণিক টিম কাজ করছে জানিয়ে আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম হাবিবুল হাসান বলেন, “নিরাপত্তার জন্য বিনোদনমূলক যাত্রা, সার্কাসের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। মেলাটি আমরা নজরদারির মধ্যে রেখেছি।“

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক