ভাষা শহীদদের ভালোবাসা জানাতে শূন্যরেখায় একাকার দুই বাংলা
বেনাপোলের শূন্যরেখা থেকে ২০০ গজ ভেতরে ছিল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশে মঞ্চ’। আর ভারতের পেট্রাপোলের শূন্যরেখা থেকে ৫০০ গজ ভেতরে তৈরি করা হয় 'জয় ভারত একুশে মঞ্চ’।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালিরা; দুই বাংলার ভাষাপ্রেমী মানুষরা এদিন মিলেমিশে গেছেন যশোরের বেনাপোল চেকপোস্টের শূন্যরেখায় এসে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ভারতের পেট্রাপোল আর বাংলাদেশের বেনাপোলের শূন্যরেখা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও কয়েক ঘণ্টার জন্য উধাও হয়ে যায় সীমান্তের কাঁটাতার। দুই বাংলার মানুষ শূন্যরেখায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মুগ্ধতার চোখে; মেতে ওঠে আড্ডায়,স্মৃতিচারণে। পরে দুই বাংলার মানুষ সরকারি বিধিনিষেধ মেনে নিজ নিজ সংগঠনের পক্ষ থেকে শূন্যরেখায় নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
গান আর আবৃত্তির ফাঁকে বাংলাভাষী দুই দেশের মানুষ একে অপরের খোঁজখবর নেন। থেকে থেকে তাদের কন্ঠে ওঠে নানা গানের সুর; সে সুর যেন পরম মায়ায় বেঁধে রেখেছিল দুই বাংলার মানুষকে।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ভারত-পাকিস্তান দুই দেশ সৃষ্টি হলে ভাগ হয়ে যায় বাংলা। পাকিস্তানের অংশে থাকা পূর্ব পাকিস্তান ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়। পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে ভারতের রাজ্য হয়ে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক শার্শা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মঞ্জু বলেন, ২০০২ সাল থেকে ভাষা শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দুই বাংলার সীমান্ত এলাকার কয়েকটি সংগঠন এই মিলনমেলা শুরু করে। গত ২১ বছরে তার পরিধি কিছুটা বেড়েছে।
এবার দুই বাংলার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন কমিটি যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বলে জানান তিনি।
বেনাপোলের শূন্যরেখা থেকে ২০০ গজ ভেতরে ছিল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশে মঞ্চ’। আর ভারতের পেট্রাপোলের শূন্যরেখা থেকে ৫০০ গজ ভেতরে তৈরি করা হয় 'জয় ভারত একুশে মঞ্চ’। গত কয়েক বছর উভয় মঞ্চে বাংলাদেশ ও ভারতের অতিথিরা বক্তব্য রাখতেন, শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তবে এবার কড়াকড়ির কারণে সেটা হয়নি।
আগে থেকেই নিজ নিজ ভূখণ্ডে অপেক্ষায় ছিলেন আয়োজকরা। বেলা সোয়া ১১টায় শূন্যরেখায় প্রবেশ করে উভয় দেশের মানুষ ফুল দিয়ে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন, ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহমেদ হাসান জামিল, বেনাবোল বন্দর পরিচালক আব্দুল জলিল, শার্শার ইউএনও নারায়ণ চন্দ্র পাল ও সহকারী পুলিশ সুপার (নাভারণ সার্কেল) নিশাত আল নাহিয়ানসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধি দলে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্রীমতি বীণা মণ্ডল, বনগাঁ উত্তর বিধানসভার বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, বনগাঁ পৌর প্রধান গোপাল শেঠসহ রাজনীতিবিদ-কবি-শিল্পী-সাংবাদিক ও সাহিত্যিকরা।
যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নিজের ভাষার জন্য পৃথিবীর আর কোনো দেশ রক্ত দেয়নি। এ দেশের দামাল ছেলেরা রক্ত দিয়ে আজ সারা বিশ্বে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশকে বিভক্ত করা হলেও ভাষাকে বিভক্ত করা যায়নি।
“বাঙালির অর্জনকে দুই বাংলা একসঙ্গে পালন করছে; এটা খুবই গর্বের বিষয়। দুই দেশের সোহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মৈত্রীতে এ অনুষ্ঠান অনুপ্রেরণা যোগাবে।”
পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, একুশের গৌরবের উত্তরাধিকারী পৃথিবীর সব বাঙালি। এর ব্যাপ্তি শুধু ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অনেক বিস্তৃত। ভাষার টানে, বাঙালি জাতির নাড়ির টানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে এখানে এসেছি। ভাষার কারণে আমরা এপার বাংলা, ওপার বাংলার সঙ্গে কোনো বিভেদ করি না।"
বনগাঁ পৌর প্রধান গোপাল শেঠ বলেন, “২০০২ সাল থেকে বনগাঁর কিছু সংস্কৃতিকর্মী একুশে উদযাপন কমিটি গড়ে সীমান্তের শূন্যরেখায় মাতৃভাষা দিবস পালন শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিবছর একদিনের জন্য খুলে যায় সীমান্তের গেইট, বসছে দুই বাংলার মিলনমেলা।”
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উদীচী শিল্পীগোষ্ঠরসহ বিভিন্ন সঙ্গীত শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন।
