২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

ময়মনসিংহে ডিবির অভিযানের পর যুবকের মৃত্যুতে তদন্ত কমিটি

মামলা হয় ১০ নভেম্বর গভীর রাত ১২টা ৫ মিনিটে। কিন্তু তার আগেই রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে ফয়সালের বোনের বাসায় অভিযানে যায় ডিবি।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Nov 2024, 07:36 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:56 AM

ময়মনসিংহে ডিবির অভিযানের পর যুবকের মৃত্যুতে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। 

১০ নভেম্বর রাতে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফয়সাল খান শুভকে (৩০) নগরীর কেওয়াটখালী পাওয়ার হাউজ রোডের বোনের পাঁচতলা বাসার নিচ থেকে গুরুতর অবস্থায় অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। 

ঘটনার পর থেকে পরিবার অভিযোগ করে আসছিল, ফয়সালকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। অপরদিকে ডিবি পুলিশের দাবি, সেদিন অভিযানে ফয়সালকে বাসায় না পেয়ে তারা ফিরে আসেন। 

ঘটনাটি নিয়ে নগরীতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। 

এর মধ্যেই সোমবার জেলা পুলিশ সুপার আজিজুল ইসলাম বলেন, “ফয়সালের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি আছে কি-না সেই লক্ষ্যে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

“রোববার রাতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রামই অ্যান্ড অপস) মো. শামীম হোসেনকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” 

যে বাসার নিচ থেকে ফয়সালকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, সেই বাসার মালিক অর্থাৎ ফয়সালের ভগ্নিপতি মোহসিনুল হকের দাবি, ফয়সালের সঙ্গে একই গ্রামের এক মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়।

বিষয়টি ফয়সাল জানতে পেরে মেয়েটির হবু বরের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে তাদের চার বছরের সম্পর্কের কথা জানান ও কিছু ছবি-ভিডিও পাঠান।

এ কারণে মেয়েটির বাবা গত ১০ নভেম্বর ঈশ্বরগঞ্জ থানায় ফয়সাল খান শুভসহ চারজনকে আসামি করে পর্নোগ্রাফি আইনে অভিযোগ করেন। মামলায় শুভসহ তার চার আত্মীয়কে আসামি করা হয়।

পর্নোগ্রাফি আইনে মামলাটি হয় ১০ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে। কিন্তু তার আগেই রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে ফয়সালের বোনের বাসায় অভিযানে যায় ডিবি। ১৮ মিনিটের ওই অভিযানে ডিবির সদস্যদের সঙ্গে থাকা আরো দুই ব্যক্তি ছিলেন। ফয়সালের পরিবারের দাবি, ওই ব্যক্তি বাদীর পরিবারের লোক। ফলে এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। 

ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এইচ এম খালেকুজ্জামান বলেন, “কারো বাসায় অভিযান করলে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সঙ্গে নিতে পারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আইন অনুযায়ী, পুলিশ বাদীপক্ষের লোকজন নিয়ে অভিযানে যেতে পারে না।” 

ফয়সাল খান শুভ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা কাশিপুর এলাকার মো. সেলিম খানের ছেলে। ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে নগরীর কেওয়াটখালী পাওয়ার হাউস রোডে বড় বোনের বাসায় থেকে চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন তিনি। 

ডিবি পুলিশের অভিযানের সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, ১০ নভেম্বর রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে বাসার নিচের কলাপসিবল গেট খুলে দিচ্ছেন ফয়সালের ভগ্নিপতি মোহসিনুল হক। এ সময় ডিবি পুলিশের পোশাক পরিহিত চারজন, পোশাকবিহীন চারজন সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে যান। পোশাকবিহীন একজনের হাতের ওয়াকিটকি ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে শেষের দিকে থাকা দুজনের একজনের মুখে মাস্ক ও একজনের মাথায় ক্যাপ পরিহিত দেখা যায়। 

ফয়সালের পরিবার দাবি করেছে, অভিযানে মোট ছয়জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। অন্য দুজনের একজন ওই তরুণীর খালাতো ভাই আসিফ সাইফুল্লাহ। অন্যজনের পরিচয় মেলেনি।

ডিবির সঙ্গে থাকা আসিফ ও মুখে মাস্ক পরা ব্যক্তি সরাসরি বাসার ছাদে চলে যান বলে জানান ফয়সালের ভগ্নিপতি মোহসিনুল হক। 

তিনি বলেন, “ওই রাতে সিভিলিয়ান দুইজন প্রথমে গেইট খুলতে বলেন। এতে কিছুটা দেরি হওয়ায় তারা ফয়সাল ও তার বোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে উচ্চস্বরে দ্রুত গেইট খোলার কথা বলেন। পুলিশ দেখে দোতলার ভিন্ন দরজা দিয়ে ফয়সাল পাঁচতলায় ও আমার স্ত্রী তৃতীয় তলায় চলে যান।

‘ছাদ থেকে পড়ে’ যুবকের মৃত্যু, ফেলে দেওয়ার অভিযোগ পরিবারের

“পরে গেইট খুলে দিলে ডিবি বাসায় তল্লাশি শেষে তৃতীয় তলায় ওঠে। তখন ছাদের দিক থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামেন আসিফ ও সঙ্গে থাকা অন্যজন। তারা বলতে থাকেন, ওপরে ফয়সাল নেই। পরে বাসা ত্যাগ করেন ডিবি ও সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা। ডিবি ওই সিভিলিয়ান দুইজনকে নিয়ে না আসলে হয়তো ফয়সালের মৃত্যু হতো না।” 

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবি পুলিশের এসআই সোহরাব উদ্দিন বলেন, “অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ছয়জন পুলিশ সদস্য ওই বাসায় গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সিসিটিভি ভিডিওতে যে দুইজনকে দেখা গেছে, তাদের বিষয়ে অবগত নই। হয়তো তারা আমাদের অভিযানে কৌশলে ঢুকে যেতে পারে।”

তাদের ছাদে যাওয়ার বিষয়টিও জানেন না জানিয়ে এসআই সোহরাব বলেন, “বাসায় ঢুকে যখন শুনেছি, ফয়সাল নেই তখন আমরা চলে এসেছি। আসার পরদিন শুনি, ফয়সাল পাঁচতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। এমন হতে পারে, পুলিশের ভয়ে ছাদে গিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলে হাত ফসকে পড়ে গেছেন।” 

এ ঘটনায় ১২ নভেম্বর কোতোয়ালী মডেল থানায় ফয়সালের বাবা সেলিম খান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এতে, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাসায় ঢুকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করে ফয়সালকে বাসার নিচে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। 

মামলায় তরুণীর বাবাসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। 

এ ঘটনায় সোমবার বেলা ৫টা পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার আজিজুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, “এ ঘটনায় আসামিরা অচিরেই ধরা পড়বে। আমাদের কয়েকটি টিম মাঠে রয়েছে। তারা গ্রেপ্তার হলেই সঠিক রহস্য উন্মোচিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আসামিদের অবস্থান আশপাশ জেলায়।”

মামলার বাদী ফয়সাল খান শুভর বাবা সেলিম খান বলেন, “আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর আগেও মেয়ের পরিবারের লোকজন আমার এক ভাইয়ের ওপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল। যদি হত্যার উদ্দেশ্য না হতো তাহলে পুলিশের অভিযানে কেন অন্য কেউ যাবে? ঘটনার কয়েকদিন হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে ধরছে না।”  

এদিকে সোমবার সকালে ফয়সাল খান শুভর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাশিপুর এলাকায় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা।