০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রীপুরে বনের ভেতরে ‘জোরপূর্বক’ পাকা রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও শর্ত ভেঙে বনের কাঁচা রাস্তায় জোরপূর্বক আরসিসি ঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ শ্রীপুর পৌরসভার বিরুদ্ধে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Sep 2026, 10:31 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ভাওয়াল গড়ের সংরক্ষিত বনে ময়লার ভাগাড় নির্মাণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সেই রেশ না কাটতেই এবার শ্রীপুরের সুরক্ষিত বনে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। 

সেখানে যাতায়াতের জন্য বনের ভেতরে ‘আইন ভেঙে’ কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে শ্রীপুর পৌরসভার বিরুদ্ধে।

পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বনের কাঁচা রাস্তা সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে সেখানে স্থায়ী পাকা রাস্তা নির্মাণ করেছে বলে বনবিভাগের অভিযোগ।

শ্রীপুর পৌরসভার সার্ভেয়ার মো. মোস্তফা কামাল বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টের জন্য ২০২০ সালের নভেম্বরে পাঁচলটিয়া মৌজায় বনের ভেতরে এক একর ১০ শতাংশ জমি কেনে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। তবে সেখানে যাতায়াতের নিজস্ব কোনো পথ ছিল না। পরে বনবিভাগের জায়গা সাময়িকভাবে ব্যবহারের আবেদন করা হয়।

বনবিভাগের শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, তৎকালীন পৌর মেয়র আনিসুর রহমান ২০২৩ সালে ডিমারকেশন বা সীমানা নির্ধারণের সময় স্ট্যাম্পে সই দিয়ে অঙ্গীকার করেন যে, তারা বনের জমি ব্যবহার করবেন না।

“কিন্তু পরবর্তীতে সেই চুক্তি ভঙ্গ করে সেখানে ইট বিছিয়ে রাস্তা করা হয়। তখন বনবিভাগ বাধা দেয় এবং নিরাপত্তার জন্য সীমানা পিলার বসায়। কিন্তু রাতের আঁধারে তা সরিয়ে ফেলা হয়। ২০২৪ সালে অভিযান চালিয়ে রাস্তায় বিছানো ইট উচ্ছেদ করাও হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাস্তাটির ব্যবহার চালিয়ে যায় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।”

বনবিভাগের কর্মকর্তা বলেন, পরবর্তীতে বনের জমি ছাড়তে ও বিকল্প পথ তৈরি করতে একাধিক চিঠি দেওয়া হলেও পৌরসভা তা তোয়াক্কা করেনি।

তিনি বরং অভিযোগ করেন, এসব নিয়ে কথা বলার কারণে বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানাভাবে হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। 

ঘটনাস্থলে গিয়ে যা দেখা গেল

শ্রীপুর পৌরসভা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বদিকে পাঁচলটিয়া এলাকায় ওই প্ল্যান্টটি অবস্থিত। শ্রীপুর রেলক্রসিং এলাকা থেকে ইজিবাইকে যেতে ১০-১৫ মিনিটের মত লাগে। 

রোববার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, শ্রীপুর-গোসিংগা আঞ্চলিক সড়ক থেকে ১০ ফুট চওড়া একটি আরসিসি (ঢালাই) রাস্তা প্ল্যান্টের দিকে চলে গেছে। এর পাশেই বনবিভাগের সবুজ বৃক্ষরাজি। কনক্রিটের রাস্তা ধরে প্ল্যান্টের দিকে যেতেই দেখা গেল, একটি সুরক্ষিত ফটকে ভেতর থেকে তালা ঝুলছে।  

একজন গেটম্যান ফটকের পাশের ছোট কক্ষে বসে আছেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যানটি দেখার জন্য অনুরোধ জানালে, তিনি বন্ধ ফটকটি খুলে দেন। ভেতরে ঢুকতেই বাম পাশে বর্জ্য শোধনের জন্য ছোট ছোট পাথর বিছানো ছাঁকনিযুক্ত তিনটি বড় রকমের হাউস চোখে পড়ে। সেখানে কলাবতী গাছ রোপণ করা হয়েছে। 

পাশেই রয়েছে চারটি ছোট-বড় টিনশেড স্থাপনা। দক্ষিণ পাশে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার স্থাপন করে সেখান থেকে প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কঠিন বর্জ্যের বিভিন্ন উপাদান আলাদা আলাদা করে জমা রাখছেন। 

পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. রেজাউল করিম বলেন, ১৮ অগাস্ট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা থেকে দুই ড্রাম কঠিন বর্জ্য পরীক্ষামূলকভাবে শোধন কাজ করার জন্য প্ল্যান্টে নিয়ে আসা হয়। ১৯ অগাস্ট থেকে তারা বর্জ্যের মধ্যে থাকা উপাদান আলাদা করা শুরু করেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। আগামী ডিসেম্বরে এই প্রকল্প কাজ শেষ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পৌরসভার কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। তারপরই এ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। 

শ্রীপুর পৌরসভার পাঁচ কর্মীকে সৈয়দপুর পচনশীল বর্জ্য থেকে সার তৈরি করার উপর চার দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতেই প্রাথমিকভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পচনশীল কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী রেজাউল করিম বলেন, এসব পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সার তৈরি করা হবে। বর্জ্যের মধ্যে থাকা পলিথিন আলাদা করে শুকিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেগুলো একটি মেশিনে উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার করে পুড়িয়ে-গলিয়ে প্লাস্টিক তৈরি করা হবে। 

তিনি বলেন, যেসব কঠিন বর্জ্য পচনশীল নয় সেগুলো আলাদা করে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। পরে এই ছাই সার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে। এখনও মানববর্জ্য প্ল্যান্টে আনা হয়নি। পরবর্তীতে এগুলো নিয়েও শোধন করে সার তৈরি করা হবে; যা বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে জীবাণুমুক্ত করার পর প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হবে।

চিঠিপত্র ও শর্ত ভঙ্গের বিবরণ

২০২৫ সালের ১২ অগাস্ট শ্রীপুর পৌরসভার তৎকালীন প্রশাসক ও ইউএনও সজীব আহমেদ বর্জ্য পরিবহনের স্বার্থে বনের ৯৯০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের কাঁচা রাস্তায় ৯০ দিনের জন্য ইট বিছানোর অনুমতি চেয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১২ মে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোছা. মোহছিনা আকতার বানু স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, সংরক্ষিত বনে কোনো ইটের সলিং করা যাবে না। তবে বিদ্যমান কাঁচা রাস্তাটি শর্তসাপেক্ষে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারের সাময়িক অনুমতি দেওয়া হলো।

পরবর্তীতে ১ জুন ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল-মামুন পাঁচ শর্তে ওই কাঁচা রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে চিঠি দেন।

কিন্তু পৌরসভা সব নির্দেশনা ও শর্ত উপেক্ষা করে কাঁচা রাস্তায় ইটের সলিং করার পর কনক্রিটের ঢালাই রাস্তা বানিয়ে ফেলে।

বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান বলেন, “৩০ জুন অন্য এক উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হামলায় আমার পা ভেঙে যায়। আমি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে পৌরসভা ওই ঢালাই রাস্তাটি নির্মাণ করে। এখন বাধা দিতে গেলে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি বলেন, অনুমতিপত্রের মেয়াদ ১১ অগাস্ট শেষ হওয়ায় বনের জায়গায় বেআইনিভাবে নির্মিত ঢালাই রাস্তাটি ভেঙে ফেলার (উচ্ছেদ) ব্যবস্থা নিতে ২০ অগাস্ট শ্রীপুর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে আবেদন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বাদল বলেন, “কোনো রাস্তা ছাড়া বনের ভেতরে জমি কিনে এই প্ল্যান্ট করার সিদ্ধান্তটি তৎকালীন মেয়রের একটি ভুল ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল। এখন বনের জমি ছাড়া বিকল্প পথ করতে গেলে পাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ ছাড়া উপায় নেই।”

‘বনকে বনের মত থাকতে দিতে হবে’

আরসিসি ঢালাই রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক  মো. আলমগীর কবির বলেন, “বন নীতিমালা অনুযায়ী বনের মধ্যে কোনো প্রকার স্থাপনা, সরকারি বা বেসরকারি হোক কোনোভাবে এটা করতে পারবে না। এটা হলো বনায়নের সম্পূর্ণ বরখেলাপ।”

এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের অবহেলা থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। বলেন, “এটা বনবিভাগের দায়িত্বে অবহেলা। বনের এই জায়গা দখল করে কোনো সরকারি অফিস, কোন স্থাপনা করা আইন ও নীতি বিরুদ্ধ। এ বিষয়ে আমরা জোরালো প্রতিবাদ জানাই। পাশাপাশি এ ধরনের কাজে যারা সম্পৃক্ত, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানাই।”

গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ময়লার ভাগাড় নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “কোনোভাবেই এটা করতে পারে না। বনের জায়গায় কক্সবাজারে আবাসন তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। ফিফা সেন্টার করার জন্য ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বনের জায়গা অধিগ্রহণ করেছিল; আন্দোলন করে আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ আনা হয়েছে।

“শ্রীপুর পৌরসভাও এখানে কোনো স্থাপনার উদ্যোগ নিতে পারবে না, এখতিয়ার নেই।”

বাপা সাধারণ সম্পাদক বলেন, “ফলে ছোট-বড় যাই হোক, বনের ভেতরে স্থাপনা করার কোনো এখতিয়ার নেই। আরসিসি হোক, যাই হোক না কেন, কোনোভাবে ওখানে একটা ইটও ফেলা যাবে না। ওটা বন, বনের মত থাকতে হবে।”

পৌরসভার বক্তব্য 

৪২ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং আড়াই লক্ষাধিক জনসংখ্যার শ্রীপুর পৌরসভায় দৈনিক ১১০ মেট্রিক টন বর্জ উৎপাদন হয়।

আইন ভেঙে সুরক্ষিত বনে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, “আমি সরকারি কর্মকর্তা, আমি কেন আইন ভাঙতে যাব? বিষয়টা হল, আমি এখানে যোগদান করেছি চার মাস। এটা আরও আগে থেকেই প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে, যেটা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের। উনারা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি করে দিচ্ছে ৩২টা পৌরসভার। এর মধ্যে শ্রীপুরও হচ্ছে একটা।”

তিনি বলেন, “এখানে এটা করার ক্ষেত্রে যে জায়গাটা ব্যবহার করা হয়েছে, পুরোটাই পৌরসভার নিজস্ব জায়গা। আর যাওয়ার যে রাস্তাটা আছে, সেটা একসময় হাঁটার রাস্তা ছিল, কিন্তু জায়গাটা বনের।”

পৌর প্রশাসক বলেন, “বর্তমান যে রাস্তাটার কথা বলা হচ্ছে, এখানে তো এভাবেই ছিল, কোনো গাছ কাটাও হয় নাই, ছিলও না। এখন যেটা হয়েছে, আসলে বনের জায়গাতে রাস্তা তো করা যায় না। সেক্ষেত্রে পৌরসভা থেকেই চিঠি দেওয়া হয়েছে বনবিভাগ হয়ে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত।

“ওখান থেকে আমাদের একটা অনুমতি দিয়েছে, লিখিত অনুমতি। আর ওই অনুমতির বলে রাস্তাটা নির্মাণ করা হয়েছিল। ওখানে অবশ্যই কিছু শর্তাবলী দেওয়া আছে। এতটুকু পর্যন্ত আমি বলতে পারি। আর এটা কিন্তু পৌরসভা করে নাই, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের প্রজেক্ট থেকে করা হয়েছে।”

'গায়ের জোরে' ভাওয়াল বনে ময়লার ভাগাড়