হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারের বাস মালিকদের দ্বন্দ্ব, ভোগান্তি যাত্রীদের
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ঢাকা ও সিলেটগামী যানবাহন আটকে দেন হবিগঞ্জের শ্রমিকরা।
মুন্সিগঞ্জ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছিলেন হেলাল মাতব্বর। বৃহস্পতিবার সকালে খবর পান, তার খালা মারা গেছেন। তাই ভ্রমণ বাতিল করে বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা ফেরার চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু দুপুর পর্যন্তও শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন কাউন্টারে ঘুরেও তারা বাস পাননি।
পাশে এক কাউন্টারের পাশে বিষণ্ন হয়ে বসে থাকা এ যুবক বলেন, “আমার খালা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকে আমাকে মানুষ করেছেন। কিন্তু মালিকদের দ্বন্দ্বে বাস বন্ধ থাকায় তাকে শেষবারের মতো দেখতেও যেতে পারছি না।”
এদিকে বিকালে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসকের সিরিয়াল নেওয়া থাকায় বিপাকে পড়েছেন শিমুল খান। তার মামাকে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি ঢাকায় যেতে পারছেন না।
শুধু জরুরি কাজে থাকা যাত্রীই নন, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটকও পড়েছেন ভোগান্তিতে। কেউ হোটেল ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে বের হয়েও যানবাহন না পেয়ে আটকে আছেন। আবার কারও পূর্বনির্ধারিত হোটেল বুকিং শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে থাকার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রীমঙ্গল হয়ে হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাস চলাচল নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে হবিগঞ্জের মোটর মালিক গ্রুপ ও মৌলভীবাজারের এসএমএস বাস মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের অভিযোগ, মৌলভীবাজারের মালিক-শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজারগামী বাস আটকে দেওয়া, ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের মারধর করে আসছেন।
অন্যদিকে মৌলভীবাজারের বাস মালিকদের দাবি, হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের লোকজন শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর করেছে।
এই দ্বন্দের জের ধরে বৃহস্পতিবার অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছেন হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। তাতে সকাল হবিগঞ্জের সকল রুটেই বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরে আগে বেলা ১২টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ঢাকা ও সিলেটগামী যানবাহন আটকে দেন হবিগঞ্জের শ্রমিকরা।
এতে করে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ আটকা পড়া ঢাকাগামী যাত্রী তৌহিদ মিয়া বলেন, “সকাল ১১টার দিকে বাসযোগে সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার উদ্দশ্যে রওয়ানা দেই, শায়েস্তাগঞ্জে আসার পর বাসটি আটকে দেয়া হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা হল কোনো সমাধান নেই।”
ঢাকা থেকে আসা সাদেক খান বলেন, “দুপুর ১টার মধ্যে সিলেট যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শায়েস্তাগঞ্জ এসে আটকা পড়লাম। এখানে দেড়টা বেজে গেছে, এখন কি করবো বুঝতে পারছি না।
হবিগঞ্জ পৌর বাম টার্মিনালে অবস্থানরত শফিকুল বারী নামে এক যাত্রী বলেন, “জরুরি কাজে সিলেট যাওয়ার জন্য এখানে আসি, এসে দেখি বাস চলাচল বন্ধ। এখন কিভাবে যাব বুঝতে পারছি না। প্রশাসনকে দ্রুত এর সমাধান করা উচিত’।
সকাল থেকে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে গিয়ে বাস না পেয়ে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কেউ জরুরি কাজে বাড়ি ফিরতে পারছেন না, আবার কেউ চিকিৎসা, কিংবা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন।
যাত্রীরা বলছেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরোধের মধ্যে ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। দ্রুত বিরোধের সমাধান করে বাস চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা শেরপুর এলাকায় হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাসের চালক ও শ্রমিকদের আটকে রেখে মারধর এবং একটি বাসে ভাঙচুর করেছেন।
তিনি বলেন, “বর্তমানে হবিগঞ্জের তিনটি বাস এসএমএস পরিবহনের লোকজন তাদের কার্যালয়ের সামনে আটকে রেখেছে।” এরই প্রতিবাদে তাদের ধর্মঘট।
সোহেলের ভাষ্য, এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবিগঞ্জের বাসগুলো নির্বিঘ্নে চলাচলের দাবিতে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।
হবিগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক নেতা ছায়েদ আলী বলেন, “বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা গিয়েছি। কিন্তু কার্যকর সমাধান না হওয়ায় আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বাধ্য হয়েই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন।
তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের আলোচনা চলছিল এবং পরিস্থিতিও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। শ্রীমঙ্গলে যাত্রাবিরতি না দিয়ে, মৌলভীবাজার ও শেরপুরে যাত্রাবিরতি রেখে হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাস চলাচল অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এর মধ্যেই হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের লোকজন শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রিপনের দাবি, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি প্রশাসন দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে, এ বিষয়ে তারা মটর মালিক গ্রুপের সঙ্গে সভা আহ্বান করেছেন বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস.এম মনসুর মুসা।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, “প্রশাসন থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, এ বিষয়ে তারা আমাদের সঙ্গে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে আমরা এখনো আমাদের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছি। ”
আমাদের দাবি, পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবিগঞ্জের বাসগুলো যেন নির্বিঘেœ হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার-সিলেট রুটে চলাচল করতে পারে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।
