‘সমন্বয়ের অভাবেই’ কি রাবি শিক্ষার্থীদের ওপর বারবার হামলা, স্টেশন ভাঙচুর
এ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
দুই মাসে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, মারধর ও হেনস্তার অন্তত তিনটি অভিযোগ ওঠেছে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠেছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে কর্মকর্তারা মনে করছেন, ‘ভুল বোঝাবুঝি ও সমন্বয়ের অভাবে’ এসব ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু সমাধান হলে নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না।
সর্বশেষ রোববার রাতে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুর করেন। এর আগে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেললাইন অবরোধ করেন।
এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ ঘটনার পর স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
রোববার রাতে চাচাকে নিতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী। এ সময় স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে আইয়ুব ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলতে গেলে আরএনবি সদস্যদের সঙ্গে তারও তর্ক হয়। পরে তাকে মারধর করা হলে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে এর আগেই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেললাইন অবরোধ করে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষক, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এর আগে চলতি বছরের ২১ জুলাই ঢাকা থেকে পদ্মা এক্সপ্রেসে রাজশাহী ফেরার সময় আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দীন ট্রেনের ভ্রমণকালীন টিকিট পরীক্ষকের (টিটিই) অনৈতিকভাবে ঘুষ নেওয়ার প্রতিবাদ করেন।
ফোরকানের অভিযোগ, এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালনরত টিটিই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।
পরদিন সকালে ফোরকানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বিষয়টি রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি বলে অভিযোগ করেন। পরে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রেললাইন অবরোধ করেন।
প্রায় ১০ ঘণ্টার ওই অবরোধে শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে সব দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা। পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দাবি মেনে নেয় এবং সাগরদাঁড়ী এক্সপ্রেস ও তিতুমীর এক্সপ্রেস বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রজ্ঞাপন জারির পরও শিকল না টানলে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে ট্রেন থামে না। আর এভাবে শিকল টেনে ট্রেন থামাতে গিয়ে আরেকবার হামলার শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী।
১৫ সেপ্টেম্বর রাতে সাগরদাঁড়ী এক্সপ্রেস বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে না থামায় এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের শিক্ষার্থী মৃন্ময় চক্রবর্তী ট্রেনের শিকল টানেন।
মৃন্ময়ের অভিযোগ, এরপর রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে আটকে গালিগালাজ, মারধর ও হুমকি দেন। ভুল স্বীকার করে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি মেনে নেওয়ার কথা জানালেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাকে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ তার।
এদিকে রোববার রাতের ঘটনার পর রাজশাহী মহানগর যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। সোমবার দুপুরে রাজশাহী কলেজের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এতে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে হেনস্তার ঘটনা ঘটছে। অতীতের ঘটনাগুলোর সময়মতো কার্যকর সমাধান হলে পরিস্থিতি আজকের পর্যায়ে গড়াত না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা। নয়তো এই সংঘাত আরও বড় রূপ নিতে পারে।”
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “শিক্ষার্থীদের কোনো দায় থাকলে আমরা তা মেনে নেব। শিক্ষার্থীরা আইন ভঙ্গ করলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টি-শার্ট দেখলেই কাউকে মারধর বা আটকে রাখার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, “রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তখন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এ পর্যায়ে আসত না। আমাদের মনে হয়েছে, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কোথাও সমস্যা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছি। আশা করি, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা বন্ধে স্থায়ী সমাধান করা হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাপরিচালক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, “ভুল বোঝাবুঝি থেকেই বারবার এই সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে। যথাযথ আলোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়ানোর মাধ্যমে আমাদের সবাই একসঙ্গে হয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।”
