১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিগত সরকারের ফাঁকা বুলি ছিল নোবেলের আশায়’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Oct 2026, 09:07 PM

Updated : 15 Oct 2026, 09:07 PM

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী।

তার অভিযোগ, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা তৎপরতা দেখা গেলেও প্রকৃত ভুক্তভোগীদের জীবনমান উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল।

বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, “বিগত সরকারের আমলে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেক কর্মকাণ্ড হয়েছে। পত্রপত্রিকায় এসব তৎপরতার খবর এসেছে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, এর মধ্য দিয়ে হয়তো নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া যাবে।”

কিন্তু যাদের ঘিরে এসব তৎপরতা, সেই রোহিঙ্গাদের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিকল্পনা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, “কিন্তু আসলে যারা প্রকৃত ভিকটিম- এই রোহিঙ্গা, উনাদের আসলে কতটুকু দিয়ে জীবনমান উন্নত হয়েছে, উনাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী চিন্তা ছিল, সবই মনে হচ্ছিল ফাঁকা বুলি।”

বৃহস্পতিবার দিনভর উখিয়ার একাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন সংসদীয় কমিটির পাঁচ সদস্য। তারা স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য বিতরণ, নিবন্ধন ও যাচাই কার্যক্রম সম্পর্কে জানার পাশাপাশি রোহিঙ্গা তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন।

পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১০ বছর ধরে অবস্থান করলেও রোহিঙ্গারা জানেন না তাদের ভবিষ্যৎ কী।

তিনি বলেন, ক্যাম্পে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি। তরুণদের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক।

রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তাদের নিজ দেশে ফিরতে হলে একটি শিক্ষিত ও সক্ষম সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, সবাই যত দ্রুত সম্ভব সংকটের সমাধান চান। কিন্তু জোর করে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

তার ভাষায়, “আপনি ফেরত পাঠালেন, আবার দুই দিন পর চলে এল—এটা কোনো সমাধান নয়।”

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়ন কমে আসাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, প্রচলিত আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর যাকাত তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হলেও সনদের স্বীকৃতি নিয়ে জটিলতা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ক্যাম্পে নিরাপত্তা, ডিজিটাল সেবা ও সিমকার্ড ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ তৈরির কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার কথা বলেন।

রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ রয়েছে বলে জানান জহরত আদিব চৌধুরী। পানি, স্যানিটেশন ও ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তারা।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, ক্যাম্প পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ দেওয়া হবে। সংসদেও বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।

বৃহস্পতিবারের সফরে কমিটির সদস্যরা উখিয়ার ক্যাম্প-৬-এর রোহাং হেরিটেজ সেন্টার, ক্যাম্প-৯-এর তুর্কি হাসপাতাল, ক্যাম্প-৪-এর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির খাদ্য বিতরণকেন্দ্র এবং ইউএনএইচসিআর-আরআরআরসির যৌথ যাচাই কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী, সৈয়দ আল নোমান, সানজিদা ইসলাম ও মীর আহমাদ বিন কাসেম।