গোপালগঞ্জ-১: কারাবন্দি প্রার্থী শিমুলকে মুক্ত করতে ভোটের মাঠে কিশোর ছেলে
“এটি কেবল ভোটযুদ্ধ নয়, এটি একজন পিতার সম্মানের জন্য সন্তানের আত্মত্যাগের সংগ্রাম”, বলেন এক ভোটার।
সহপাঠীরা যখন এসএসসি পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। তখন বই-খাতা টেবিলে রেখে বাবার নির্বাচনি ‘হ্যান্ডবিল’ নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে যাচ্ছে কিশোর ছেলে।
মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কারাবন্দি আশ্রাফুল আলম শিমুলের কিশোর ছেলে খাইরুল আলম সায়াদকে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার চোখে-মুখে এখন একটাই আকুতি কারাবন্দি বাবার সম্মান আর মুক্তি।
আগামী ২১ এপ্রিল সায়াদের এসএসসি পরীক্ষা। জীবনের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় সে বেছে নিয়েছে অসম এক লড়াই। তার বাবা শিমুল (ফুটবল প্রতীক) বর্তমানে রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে। বাবার অনুপস্থিতিতে ভোটের প্রচারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে কিশোর ছেলে।
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভোটারদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে সে শুধু একটি ভোট নয়, তার বাবার ওপর হওয়া ‘অন্যায়ের’ বিচার চাইছে। এ দৃশ্যটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; হয়ে দাঁড়িয়েছে এক চরম মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
নাম গোপন রাখা শর্তে মুকসুদপুর এলাকার এক জ্যেষ্ঠ নাগরিক বলেন, “শিমুল আজ কারাগারে থাকতে পারেন, কিন্তু তার আদর্শ তার ছেলের মধ্য দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি কেবল ভোটযুদ্ধ নয়, এটি একজন পিতার সম্মানের জন্য সন্তানের আত্মত্যাগের সংগ্রাম।”
বাবার সংগ্রামের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে সায়াদ বলে, “আমার বাবা রাজনীতির নামে কখনো ক্ষমতার দাপট দেখাননি। তিনি শিখিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
“আমার দাদা খায়রুল বাকী মিয়াও সারাজীবন মানুষের সেবা করেছেন। সেই আদর্শের টানেই আমি আজ রাজপথে। আমার বিশ্বাস, এই নির্বাচনে প্রতিটি ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি নীরব প্রতিবাদ।”
সায়াদের ভাষ্য, তার বাবাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে নির্বাচনি মাঠ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষের ভালোবাসাই তার বাবার একমাত্র মুক্তির পথ।
সায়াদের এ লড়াকু মানসিকতা ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। ফেইসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তাকে নিয়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার।
হাসান ফরাজী ফেইসবুকে লিখেছেন, “সায়াদের সাহসের মাঝে আমরা একটি সংগ্রামী পরিবারের গর্বিত উত্তরাধিকার দেখতে পাচ্ছি।”
সৌরভ মিয়া ও নাইমুল কবির পনির তাদের পোস্টে লিখেছেন, “আপনার একটি ভোটই হতে পারে একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাসের অবসান এবং একজন নিরপরাধ পিতার মুক্তির চাবিকাঠি।”
গোপালগঞ্জ-১ আসনে এখন একটাই আলোচনা বাবার জন্য ছেলের এ লড়াই। মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার সাধারণ ভোটারদের কাছে সায়াদ এখন এক কিশোর যোদ্ধার নাম। ভোটের ফলাফল যাই হোক, বাবার প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সাহসের গল্প গোপালগঞ্জের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।
আশ্রাফুল আলম শিমুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ২০০৯ সালে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ২০২২ সালে মুকসুদপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত তিনি যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, কোনোটিতেই পরাজিত হননি।
শিমুলের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে তার পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বাবা খায়রুল বাকী মিয়া ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ভার এসে পড়েছে এক কিশোরের কাঁধে।
গত ৮ জানুয়ারি আশরাফুল আলম শিমুলকে শাহবাগ থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে রিয়াজ মোর্শেদ অপু হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই হুমায়ুন কবীর।
